আইনের শাসন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

আপডেট: এপ্রিল ২৫, ২০১৯
0

এ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার:

বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার (জঁষব ড়ভ খধ)ি দাবী দীর্ঘ দিনের, কিন্তু এর প্রতিষ্ঠার চেয়ে ব্যক্তি শাসন প্রতিষ্ঠার কলাকৌশল অনেক বেশী। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ব্যক্তি শাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে, কারণ ব্যক্তি শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকলে কর্মচারীরা অর্থাৎ আমলারা সমুদয় সুযোগ সুবিধা “ভোগ করে এবং তাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের রাস্তা অনেক প্রশস্ত থাকে, কেননা ব্যক্তি শাসনে জবাব দিহিতার পথ দিনে দিনে সরু হতে থাকে বিধায় রাজকর্মচারীরা নিজেকে ধরাকে সড়া জ্ঞান মনে করে যা খুশী তাই করতে পারে, শুধুমাত্র উপরস্ত কর্মকর্তাকে সন্তোষ্ট রাখতে পারলেই তাদের পথে অন্য কোন কাটা থাকে না। ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত থানার সর্বোচ্চ বড় কর্তার নিকট নালিশ করে উপহাসের পাত্র হয়েছে। থানায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন নিজেকে জবাবদিহিতার আওতায় রাখার দায়িত্বের পরিবর্তে ভিডিও চিত্র ভাইরাল করে নূসরাতকে পুড়িয়ে হত্যাকে ত্বরান্বিত করেছে।

বিচার প্রক্রিয়া, বিচারকের স্বাধীনতা প্রভৃতি নিয়ে প্রতিনিয়তই অনেক কথা আওড়ানো হচ্ছে। বিচারকগণ সরকারের মূখের দিকে তাকিয়ে মামলার রায় প্রদান করে একথাও বিচারপ্রার্থীগণ বিশ্বাস করে। বিচার বিভাগের ভাবমুর্তি নিয়ে কথা বলার পূর্বে বিচারপতি এস.কে. সিনহার বিদায় বেলাটি পর্যালোচনা করলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আজ কোথায় তা সহজেই উপলব্দি করা যাবে।

ফেনী জেলাধীন সোনাগাজীর উপজেলার ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির প্রতি ওসি কর্তৃক যে উপহাস করা হয়েছে তা বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় একটি চিত্র মাত্র। নির্যাতিত বিচার প্রার্থীদের প্রতি এমনি ধরনের উপহাস প্রতি নিয়ত করা হচ্ছে। মিডিয়ার কারণে কোনটি প্রকাশ পায়, কোনটি প্রকাশ পায় না। মাদক ব্যবসায়ীদের সরকার পুলিশ দ্বারা ক্রসফায়ার করে। পুলিশের একটি অংশ মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকায় অভিযোগে গ্রেফতার হচ্ছে, কিন্তু তাদের (পুলিশ) ক্রস ফায়ার করা হচ্ছে না (মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতি কোন কারণেই বিন্দুমাত্র সমর্থন তো দূরের কথা নুন্যতম সহানুভুতি থাকাও পাপ হবে। শুধুমাত্র দেশে প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি চিত্র প্রকাশের জন্য এ উপমা দেয়া হলো)।

সরকারী দল অর্থাৎ ছাত্রলীগ/যুবলীগ পুলিশ পিটানোর অনেক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশ পাচ্ছে। সরকারী দল পুলিশকে পিটালে তারা (পুলিশ) ব্যবস্থা নেয় না বরং খুশী হয় বলে মনে হচ্ছে। এমনি একটি সংবাদ ১৮/৪/২০১৯ ইং তারিখে পত্রিকান্তরে প্রকাশ পেয়েছে, যার শিরোনাম “ওরা আ.লীগের, বিএনপি হইলে ব্যবস্থা নিতে পারতাম: আড়াইহাজার ওসি”। পাঠকের সুবিদার্থে সংবাদটি নি¤েœ তুলে ধরা হলো :

“পুলিশ পিটিয়েছে আড়াইহাজার গোপালদী ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সুজয় কুমার সাহা ও তার কর্মীরা। ১৭/৪/২০১৯ দুপুরের দিকে গোপালদী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে ঢুকে তিনি পুলিশকে পিটিয়ে আহত করে তারা। তবে, এ ঘটনায় পুলিশ বেধড়ক মার খেলেও আড়াইহাজার থানা পুলিশের অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) মোঃ আক্তার হোসেন মোটেও ব্যথিত নন বরং তিনি পক্ষ অবলম্বন করেছেন হামলাকারী ছাত্রলীগের পক্ষে। একই সাথে তিনি পুলিশ পেটানো ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিজের লোক বলেই মন্তব্য করেন। একই সাথে এ সক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন তিনি।”

পুলিশ একটি দীর্ঘ দিনের পুরাতন এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সকল আইন তাদের দ্বারা কার্যকর হচ্ছে। দূর্নীতি দমন কমিশন পুলিশ বিভাগ থেকে ডেপুটেশনে অনেক জনবল এনেছে দূর্নীতির মামলা তদন্ত করার জন্য। অথচ পুলিশের বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগই সবচেয়ে বেশী। সব সরকারই পুলিশকে লাঠিয়াল হিসাবে ব্যবহ্নত করেছে। তবে বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার একেবারেই পুলিশ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কারণ একতরফা নির্বাচনী বৈতরনী পাড় হওয়ার জন্য পুলিশই ছিল সবচেয়ে বড় নিয়ামক শক্তি। একথাগুলির পরিসম্পত্তি করতে চাইলে করা যায় না, কারণ রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তি সকলই এখন আমলা নির্ভর। জনপ্রতিনিধিদেরও পুলিশ এখন বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর খবর বিভিন্ন জেলায় চাওড় হচ্ছে। তবে এ জন্য যুক্তি সংগত কারণ রয়েছে। পুলিশ জানে জনপ্রতিনিধি পুলিশ বানিয়েছে এবং এ কথাটি অস্বীকার করার উপায় জনপ্রতিনিধিদের হেকমতে কুলাবে না। ফলে জনগণের স্বার্থে যারা সোচ্চার হওয়ার কথা তারাও আমলা ও পুলিশের নিকট জিম্মি। ফলে আমলা ও পুলিশের শক্তি এমনিভাবে প্রকাশ পেয়েছে যার নিকট গোটা সমাজ ব্যবস্থা জিম্মি হয়ে পড়েছে। আমলা ও পুলিশের পোষ্টিং প্রমোশন এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় হয় যার প্রকোপ এখন বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে। চাকুরী মেয়াদ শেষ হলেও অতি অনুগত আমলাদের চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে নিয়মিত প্রমোশনের দরজা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। যাদের আতœীয় স্বজন সরকারী দল করে না যোগ্যতা থাকা স্বত্বেও প্রমোশনের ফিট লিষ্টে তাদের নাম উঠে না।

দীর্ঘ দিন পরে হলেও ১৫/৪/২০১৯ ইং তারিখে বি.জি.এম.ই.এ ভবন ভাঙ্গার সংবাদ জাতির জন্য একটি সুখবর। সর্বোচ্চ বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ না হলে সম্পদশালীদের স্বার্থরক্ষার এ ভবনটি ভাঙ্গা সম্ভব হতো না। অর্থশালীরা মনে করে অর্থের নিকট সকলকেই জিম্মি করা যায়। কিন্তুবি.জি.এম.ই.এ ভবন ভাঙ্গার সংবাদ ঐ ধরনের মাসকিতার উপর একটি চপোটাঘাত। বিশাল দ্বৈত্যকার বি.জি.এম.ই.এ ভবনটি অবৈধ পন্থায় কি ভাবে হাতিরঝিল সৌন্দর্য্য বর্ধিত করন এলাকায় গড়ে উঠলো তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি স্বেতপত্র প্রকাশ করা আবশ্যক। তবেই জনগণ জানতে পারতো উপর তলার লোকদের হাত কতটুকু লম্বা। উপর তলার লোকদের খাঁই খাঁই স্বভাবের কারণে গোটা দেশের ৬৫%-৭০% সম্পদ তাদের হাতে এককভাবে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। অন্য দিকে গরীব দিন দিন আরো নিঃস্ব হচ্ছে। ব্যাংক লুটেরা ও ভূমিদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে গোটা অর্থনীতি। ব্যাংকের অর্থ তারাই ভিন্ন ভিন্ন নামে আতœসাৎ করছে যারা পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্য। কৃষকদের নিকট থেকে জমি ক্রয় না করেই ড্রেজার দিয়ে ভরাট করে ফেলছে ফসলী জমি। অথচ ফসলী জমি যত্রতত্র ব্যবহার না করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনা রয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১৮ক মোতাবেক পরিবেশকে সুরক্ষা করার জন্য রাষ্ট্র বদ্ধ পরিকর। অথচ সরকার বা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন প্রকার অনুমতি ব্যতিত ভূমিদস্যুরা ঢাকার আশে পাশে বিশেষ করে রাজউকের পূর্বাচল এলাকায় (রূপগঞ্জ উপজেলা) সংলগ্ন খাল, বিল, পুকুর, ঈদগাহ মাঠ, কবরস্থান প্রভৃতি ড্রেজার পাইপ সংযোগ করে বালু দ্বারা ভরাট করে ফেলছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বা প্রশাসন এগুলি দেখেও দেখছে না। কারণ আবাসন প্রকল্প করার জন্য ন্যায্যমূল্য দিয়ে কৃষকের জমি ক্রয় প্রয়োজন হয় না, পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনকে ক্রয় করলেই হয়।

বিচার বিভাগের সংস্কার বিচার প্রার্থী গণমানুষের দীর্ঘ দিনের দাবী। দেশের সর্বোচ্চ আদালত অনেক অবিচার তথা প্রশাসন/আমলাদের অযাচিত কার্যকলাপ অনুভব করেও প্রতিকার করে না বা করতে পারে না, কারণ তারাও মনমানসিকতার দিক কোথায় অবস্থান করার কথা তাহাও উপলব্দি করা দরকার। কারণ বিচারপতি এস.কে সিনহার উত্তান ও পতনের বিষয়টি পর্যালোচনা করলেও সব কিছু বুঝে নেয়া যায়। সম্প্রতি শিশু ও মহিলাদের জবানবন্দী মহিলা ম্যাজিষ্ট্রেট দ্বারা লিপিবদ্ধ করায় সুপ্রীমকোর্টের আদেশ প্রদান নিশ্চয় বিচার বিভাগের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ, এ ধরনের পদক্ষেপ সাদুবাদ পাওয়ার যোগ্য। পাশাপাশি বিচারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রসিকিউশন তথা পুলিশ, র‌্যাব, দূদক প্রভৃতির উপর একক নির্ভরশীলতা ন্যায় বিচারের অন্তরায় বিধায় এ নির্ভরশীলতা থেকে বের হওয়ার উদ্দেগে বিচার বিভাগ থেকে নেয়া জনগণের প্রত্যাশা।

লেখক

কলামিষ্ট ও আইনজীবি (এ্যাপিলেট ডিভিশন)

মোবাঃ ০১৭১১-৫৬১৪৫৬

ঊ-সধরষ: ঃধরসঁৎধষধসশযধহফধশবৎ@মসধরষ.পড়স

LEAVE A REPLY