আওয়ামী লীগে কমিউনিস্টরা অনুপ্রবেশকারী নয় ??

আপডেট: নভেম্বর ১৪, ২০১৯
0

সোহেল সানি:

আওয়ামী লীগে বা সরকারের মন্ত্রিসভায় এমন একটি লোক কি খুঁজে পাওয়া যাবে, যিনি নিজের অক্ষমতা কিংবা দুর্বলতা স্বীকার করবেন? নিজেদের দুর্বল ভাবতে রাজী নন মূলত, কমিউনিষ্টরা।

“নিয়মানুবর্তী কর্মীপন্থা” গ্রহণের মধ্যে দলের এবং ব্যক্তির সাফল্যের স্বপ্ন দেখেন। কমিউনিস্টদের সাধারণত সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানের সার্বভৌম কর্তৃত্বকে স্বীকার করেই ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তারা হিমশীতল যন্ত্রবৎ হিসাবে করেন। আওয়ামী লীগের শ্রেণিচেতনা ও শ্রেণিচরিত্র বিশ্লেষণ করা হলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের মধ্যে কমিউনিষ্ট প্রেতাত্মা ভর করেছে


কমিউনিস্টরা নিয়মের বই-পুস্তুকের মধ্যে জাতির মুক্তি খুঁজে খুঁজে নিজেরাই দিকবিদিকশুন্য হয়ে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতালাভ বা দখলের ‘উদ্দেশ্য’ থাকলেও ‘উপায়’ না থাকায় তাদের একাংশ বিএনপি গঠনে বিশিষ্ট ভুমিকাপালন করেন।

জাতীয়তাবাদের ছদ্মবরণে সংঘবদ্ধ হওয়া গ্রুপটি কার্যত চরম প্রতিক্রিয়াশীল,অথচ এঁরা ন্যাপ ভাসানী হতে আগত। মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পরপরই জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর টোপ গিলে। জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (বিএনপি) গোষ্ঠীবদ্ধ হওয়া মশিউর রহমান যাদুমিয়া, ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরী, এস এ বারী এটি, কাজী জাফর আহমেদ, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, এনায়েত উল্লাহ খান প্রমুখ ভাসানীপন্থীরা জেনারেল জিয়ার মৃত্যুর পর রাতারাতি ভোল পাল্টান।

তাদের অধিকাংশই আরও একটি সামরিক শাসনকে পাকাপোক্ত করতে জেনারেল এরশাদের হাতিয়ার হয়ে ওঠেন। ফলে ন্যাপ ভাসানী খন্ডবিখন্ড হয়ে যায়। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের ন্যাপও দিকভ্রান্ত হবার পর আওয়ামী লীগের আশ্রয় প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠে। কমিউনিস্টরা টিকে থাকার জন্যই স্বাধীনতাত্তোর তিনটি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয়পার্টিতে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে।
আওয়ামী লীগে ভিড়া এসব ন্যাপ-কমিউনিস্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে পরেছে। প্রশ্ন “অনুপ্রবেশকারী” বলতে কাদের বোঝায়? বিএনপি জামাত শিবির আওয়ামী লীগে ঢুকে পরলে নিশ্চয়ই অনুপ্রবেশকারী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু আদর্শগত বৈপরীত্যের দ্বন্দ্বে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ছাত্রইউনিয়ন হয়ে ওঠা ন্যাপ কমিউনিস্টদের মধ্যে যারা অতি আওয়ামীলীগার হয়ে উঠেছেন তারা কি অনুপ্রবেশকারী নন?

আশঙ্কার কথা হচ্ছে, প্রকত অর্থে জাতীয়তাবাদী ও নিয়মাতান্ত্রিক রাজনীতির পথিকৃৎ বলতে আওয়ামী লীগকেই বোঝায়। ক্ষমতার রাজনীতির যোগবিয়োগে কমিউনিস্টরা বিচ্ছিন্নভাবে অর্থাৎ ব্যক্তি স্বার্থে আওয়ামী লীগে প্রবেশ করলেও ধীরে ধীরে তারা এখন সংঘবদ্ধ। সরকারে এবং দলের নেতৃত্বে আধিপত্য বিস্তার করতেও সক্ষমতা দেখিয়েছেন। ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিটকে পরেছেন এক সময় ছাত্রইউনিয়ন করা নেতাদের কূটকৌশলের মারপ্যাঁচে। ক্ষমতার দৌড়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে নেতারা অসম্ভব ব্যস্ত হলেও ততটা সক্রিয় নন দল

সংঘটিতকরণে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দেশপ্রেমসুলভ দুরদর্শিতা, দক্ষতা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতার কারণেই সরকারে ভিত শক্তিশালী। এ শক্তিমত্তায় সরকারের কোনো মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীর বিশেষ দক্ষতা বা ইমেজ কাজ করেছে বলে প্রতীয়মান হয় না। দল হিসাবে আওয়ামী লীগও টিকে আছে শেখ হাসিনার সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে। সাংগঠনিক নৈপুণ্যের ক্ষেত্রে কোনো নেতারই বলিষ্ঠ ভুমিকা নেই। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচ এইম কামরুজ্জামানের সাংগঠনিক নৈপুণ্যে “বিকল্প নেতৃত্ব” কল্পনা করা যেতো, তেমনি উত্তরাধিকার বাদ রেখে বর্তমান আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার বিকল্প কল্পনা করা যায় না। এতেই প্রমাণিত হয় আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক নেতৃত্বে কতটা দুর্বল!
নেতৃত্বের ঔজ্জ্বল্য শেখ হাসিনা কেন্দ্রিক। নেতৃত্বের পরিসরের ব্যাপ্তি বিস্তৃতি ঘটেনি।

নেতা মন্ত্রীরা এখন নিস্পৃহ পদ্ধতিতে কর্মনিপুণতার অপেক্ষা সরকার প্রধানের সার্বভৌম কর্তৃত্বকে জাহির করছেন বেশী। দলীয় প্রধানের কর্তৃত্বের জাহিরসুলভ প্রশংসা বেশি হচ্ছে নেতৃত্বের প্রশংসা অপেক্ষা। নেতৃত্বের সাফল্যকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দিতে নেতারা সক্রিয় নন। অথচ, তা করা ছিল অপরিহার্য। বহিরাগত মন্ত্রীরাও একই তোষামোদি নীতিগ্রহণ করলেও তাতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তিকে সুদৃঢ় করেনি।
কখনো কখনো অবস্থাদৃষ্টে মনে উঁকি দেয় যে, সরকার প্রধানকে দিয়ে যেন অদৃশ্য একটি শক্তি
সাপলুডু খেলাচ্ছেন।
সাপলুডু একটা ভয়ঙ্কর খেলা। চাল লেজে গড়ালে আর রক্ষা নেই। সাধারণ লুডু খেলায় একটা প্রতিযোগিতা থাকে। সরকার প্রধান হিসাবে টানা ১১ বছরের শাসনকাল “শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সাফল্যকাল” বলা যেতে পারে। প্রকারান্তরে যা দেশের সাফল্য হলেও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সাফল্য নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সময়ে সময়ে সাপলুডুও খেলেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ ওই খেলার চালে ভুল করেননি বলেই নিজামী, মোজাহিদ, সাকা চৌধুরী, কাদের মোল্লা, মীর কাশেমের মতো বিষধর সাপের কবর রচনা করতে পেরেছেন। ফাঁসিতে ঝুলাতে পেরেছেন বঙ্গবন্ধুর অনেক খুনীকেও। মরবার আগে ঘাতকরা ফোঁস ফোঁস আওয়াজে ফেনা তুলে দংশন করতে চাইলেও শেখ হাসিনা সঠিক চালে অপ্রতিরোধ্য গতিতেই এগিয়ে চলছেন। চাল ভুল হলে মানে গুটি সাপের লেজে পড়ে যাওয়াই তো মুখে চলে যাওয়া। জর্জ ওয়াশিংটন ও আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছেন, রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে নেতাদের অন্ধ, কপট আনুগত্যের ফল কখনোই ভালো হয় না।” মহাত্মা গান্ধীরও অনুরূপ বিশ্বাস ছিল। সে কারণে দেশ বিভাগকালে নিখিল ভারত কংগ্রেসের কোন পদে না থেকেও ভারতীয় জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী। পৃথিবীর কোথাও অন্ধ আনুগত্যের ফল শুভ না হলেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে “একচ্ছত্রবাদ” প্রতিষ্ঠার ইন্ধন যুগিয়ে যারা দল ও সরকারের মন্ত্রীর বড় বড় পদ হাসিল করে নিয়েছিলেন, সেই তারাই বঙ্গবন্ধুর লাশ ফেলে রেখে খুনী মোশতাকের মন্ত্রী হয়েছিলেন। কে কোন দফতর নেবেন সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। মনে হচ্ছে ‘যন্ত্রবৎ’ হিসাবে কাজ করছেন শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য। মদদ ও তোষামোদিতে লিপ্ত বামপন্থী কমিউনিষ্টরা। নেতৃত্বের প্রণালীই যাদের হীমশীতল যন্ত্রবৎ। অর্থাৎ নিয়মানুবর্তী কর্মীপন্থাই যাদের মূলনীতি। যারা কপট আনুগত্য দেখায়, এবং তারাই আবার দলের মধ্যে বিদ্রোহ করে খন্ডবিখন্ড হয়ে পড়ে। মানুষকে তারা যন্ত্র মনে করে, আর মানুষ যা অপছন্দ করে তার মধ্যে একটা হলো যন্ত্রের মতো ব্যবহার হওয়া।
১৯৭৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকে নিয়মাতান্ত্রিক রাজনীতির পথ থেকে বিচ্যুত করার মূলে কমিউনিষ্টরাই জাতির জনককে প্রভাবিত করেছিলেন।
“নিম্নস্থদের মতামতের কোন মূল্যই নেই সার্বভৌম নেতৃত্বের কাছে” নিম্নস্থদের ন্যায্য কথা নেতার সার্বভৌম ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে, যা নেতার জন্য মানহানীকর। এসব তন্ত্রমন্ত্র দিয়ে নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে প্রকান্তরে নেতার সামনেই তারা বিপদগামী পথ বাতলে দেয়। বিপদ হলে নেতাকে ফেলে কেটে পড়ে। “৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা তার মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত। বঙ্গবন্ধুকে বিপথে নেয়ার মূলে যারা অগ্রণী ভুমিকায় ছিলেন তারাই বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কি করেছিলেন তা ইতিহাসের ন্যাক্কারজনক অধ্যায়। খুনী মোশতাক কতটা তোষামোদি চরিত্রের ছিলেন, তার একটা ছোট্ট ঘটনায় উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৪ আগস্ট মানে বঙ্গবন্ধু নিহত হবার ১৩/১৪ ঘন্টা আগে বানিজ্য মন্ত্রী ও বাকশালের চার নম্বর সদস্য খন্দকার মোশতাক ছুটে যান ধানমন্ডিস্থ বত্রিশ নম্বর সড়কের বাসভবনে। বঙ্গবন্ধু ও মোশতাক কথাবার্তা বলছেন, এমন সময় শেখ রাসেল কামরায় ঢুকে পড়লো। মোশতাক আদর সোহাগের পরশে সিক্ত করতে নিজের মাথায় পরিহিত টুপিটি বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র রাসেলের মাথায় পরিয়ে দিলো। বঙ্গবন্ধুকে খুশী করতে মোশতাক বললো, “দেখো রাষ্ট্রপতি তোমার ছেলেকে কি দারুণ মানিয়েছে।” “লিগ্যাসি অব ব্লাড” নামক বিখ্যাত গ্রন্থে এন্থনি ঘটনার বর্ণনা করে বলেছেন,এই চাটুকারিতা উপস্থাপনের কারণ ছিল, মোশতাক ভেবেছিলেন, হত্যাকাণ্ড পরিচালনা বার্থতায় পর্যবসিত হলে বঙ্গবন্ধুর মনে কোনপ্রকার যেন সন্দেহের উদ্রেক না করে। রাসেলের দৃশ্য বঙ্গবন্ধুর মনে প্রভাব ফেলবে কেউ যদি সন্দেহের অঙ্গলী তার দিকে প্রদর্শনের চেষ্টা করে। না, মোনাফেকি মোশতাকের স্বপ্নভঙ্গ হয়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরই নীলনকশা অনুযায়ী সে রাষ্ট্রপতি পদ দখল করেছিল। মোশতাক তার মাথায় পরিহিত ওই টুপির ডিজাইনেই “রাষ্ট্রীয়ভাবে” জাতীয় টুপি ঘোষণা করেন। মোশতাক মন্ত্রিসভায় জাতীয় টুপির পক্ষে একটি প্রস্তাব করলে সর্বসম্মতিক্রমে তা অনুমোদিত হয়। রাজনীতির কী বিচিত্র পরিণতি। মোশতাকের সব মন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভারই সদস্য ছিলেন। আর ওই মন্ত্রিসভাই “ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ” অনুমোদন করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকে বৈধতা দেয়।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার জীবনও যে নিরাপদ নয় তা তাকে হত্যার জন্য পরিচালিত গ্রেনেড হামলা থেকে শুরু করে ২১ টি হামলা প্রমাণ করে। প্রধানমন্ত্রী জাতির শেষ আশ্রয়স্থ। মানুষের প্রকৃত ঠিকানা। প্রকৃতির মতোই সত্য তিনি। তাই বড় ভয়ও তাকে নিয়ে। কারণ শকুনের হুংকার শুনা যায় এখনও। ২০ ও ২২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল।
নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস ও আনুগত্যপোষণকারী মেধাবী, প্রতিভাবান, সুদক্ষ ত্যাগীরাই যেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে উঠে আসুক। তবেই এ কাউন্সিল সফল ও স্বার্থকতালাভ করবে।
লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

LEAVE A REPLY