আওয়ামী লীগ সেক্রেটারিদের নিঃশব্দ কান্না ও যত ট্রাজেডি!

আপডেট: মার্চ ৫, ২০১৯

সোহেল সানি:

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার সৌভাগ্য ক’জনেরই হয়! হতে চেয়েছেন অনেকেই, কিন্তু প্রার্থিতার দৌড় থেকেই ছিটকে পড়তে হয়েছে অনেক বাঘা বাঘা নেতাকে।
সাধারণ সম্পাদক হওয়ার জন্য যোগ্যতার মাপকাঠি শুধু সুদর্শন কিংবা সততা, নিষ্ঠা বা সুশিক্ষার অধিকারী হলেই যে চলে না, তা বার বার প্রমাণিত হয়েছে। সাংগঠনিক প্রতিভাবান অনেক ‘কর্মীবান্ধব’ নেতাও সাধারণ সম্পাদক হতে পারেননি।
প্রাচীনতম এ রাজনৈতিক দলটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপালনকারীরা হলেন, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমেদ, জিল্লুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আব্দুল জলিল, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও ওবায়দুল কাদের।
আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপালন করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমেদ, মিজানুর রহমান চৌধুরী, আমেনা বেগম, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, আব্দুল জলিল, ওবায়দুল কাদের, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও মুকুল বোস।
১৯৯২ সালের কাউন্সিলে ত্রিমুখী লড়াই হয় সাধারণ সম্পাদক পদে। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন আমু, সাংগঠনিক সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ ও বাকশাল বিলীন করে আওয়ামী লীগে ফেরা সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক। এই তিন নেতাকে অবস্থান দেয়া হয় দলীয় প্রেসিডিয়ামে। কোন্দল ঠেকাতে সাধারণ সম্পাদক পদে নিয়ে আসা হয় তৎকালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য জিল্লুর রহমানকে। এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক করা হয় আব্দুল জলিলকে।
১৯৯৭ সালের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক পদে এককভাবে আলোচনায় উঠে আসলেও শেষ পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক হবার স্বপ্নপূরণ হয়নি আমির হোসেন আমু’র। জিল্লুর রহমানকেই আবার নির্বাচিত করা হয়।
তবে আমির হোসেন আমুকে বিরল সম্মান দেয়া হয়। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাসব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে আমির হোসেন আমুকে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করে। দলের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব ও মুক্তিযুদ্ধের রজত জয়ন্তী উৎসব দুটিতেই সভাপতির আসন গ্রহণ করে আমির হোসেন আমু দলের ভেতরে ব্যাপক প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
১৯৫৩ সালের প্রথম কাউন্সিলে নির্বাচিত হওয়া সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানকেও পদে টিকে থাকা নিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৯৫৫ সালে দলের সভাপতি ভাসানীর আধিপাত্য দ্রুত খর্ব হতে থাকায় শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক অলি আহাদকে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে দাঁড় করানো হয়েছিলো। শেখ মুজিব যখন দ্বিতীয়দফা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপালন করছিলেন।
গঠনতন্ত্রে বিধান করা হয়েছিলো, একই সঙ্গে সরকারের মন্ত্রীত্ব ও দলের নেতৃত্ব করতে পারবেন না। ওয়ার্কিং কমিটির সভায় এ নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হলে উপস্থিত সবার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে মন্ত্রীত্ব থেকেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন শেখ মুজিব।
ঠিক এই সময়ে কেন্দ্রীয় পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মধ্যে আধিপাত্য বিস্তার নিয়ে তুমুল অন্তর্দাহ শুরু হয়। ভাসানী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর মার্কিনঘেঁষা বৈদেশিক নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যরূপ নেয়।
ভাসানীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পাঞ্জাবের মাহমুদুল হক ওসমানী পদত্যাগ করেন। কাউন্সিলের ভোটাভুটিতে সোহরাওয়ার্দীর পররাষ্ট্রনীতির বিজয় হলেও সংকট দূরভীত হচ্ছিল না। মওলানা ভাসানী সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবের উদ্দেশ্য সভাপতির পদ ত্যাগ করে একটা পদত্যাগপত্র প্রেরণ করেন।
বাহক হিসাবে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক অলি আহাদ পদত্যাগপত্রটি শেখ মুজিবের কাছে পৌঁছে না দিয়ে তা সংবাদপত্রে সরবরাহ করেন। শৃঙ্খলাভঙ্গকারী হিসাবে অলি আহাদ বহিস্কার হন সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে। প্রতিবাদে দলের প্রথম শ্রম সম্পাদক আব্দুস সামাদ আজাদ এমএলএ, প্রথম মহিলা সম্পাদিকা সেলিনা বানু এমএলএ, পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রথম সভাপতি দবিরুল ইসলাম এমএলএ সহ ১১ নেতা পদত্যাগ করেন। ১৯৫৭ সালে এর জের ধরেই আহবান করা হয় কাগমারী সম্মেলন। ভাঙ্গণ ঘটে আওয়ামী লীগে। আওয়ামী লীগের একাংশ নিয়ে
মওলানা ভাসানী ও খান আব্দুল ওয়ালী খান, মাহমুদুল হক ওসমানী ও মাহমুদ আলী মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। আওয়ামী লীগের পাল্টা কাউন্সিলে ভাসানীকে সভাপতি করা হলেও নতুন দল গঠনের প্রেক্ষিতে মওলানা আব্দুল রশীদ তর্কবাগীশকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। পরবর্তীতে মওলানা তর্কবাগীশ দলের সভাপতি এবং শেখ মুজিব সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্বপালন করেন। উল্লেখ্য, ১৯৫৪ সালের মার্চের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে আওয়ামী লীগ ১৪৩টি আসন লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলেও ১৯৫৫ সালে বিশ্বাসঘাতকতা করে ১৯ জন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য শেরেবাংলার সংখ্যালঘু দল কৃষকশ্রমিক পার্টিতে যোগ দেয়।
১৯৫৭ সালে ন্যাপ আত্মপ্রকাশ করলে তাতে যোগ দেন আওয়ামী লীগের আরো ৩১জন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য।
এই ভাঙ্গাগড়ার মধ্যেও প্রায় দেড়বছর আওয়ামী লীগ সোহরাওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রীত্বে সারা পাকিস্তানে এবং আতাউর রহমান খানের মুখ্যমন্ত্রীতত্বে পূর্বপাকিস্তান শাসন করে।
এই সংকটকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের, সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপালন করে শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক চিন্তাচেতনায় প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠেন।
ব্যক্তি সমালোচনার উর্দ্ধে উঠতে হলে নিজেকে সমষ্টিকরণ করতে হবে- এই চিন্তাধারাই কর্মীকূলের মাঝে শেখ মুজিবকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
শেখ মুজিবের অসাধারণ ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটতে থাকে যা সহকর্মীদের জন্য যথারীতি অনুসরণীয় হতে থাকে। কর্মীরা তাঁর সান্নিধ্যসুলভপরশে মুগ্ধ হয়ে ওঠে দিনে দিনে। কর্মীদের কাছে পেলে শেখ মুজিব নিজেই অনুরক্ত হতেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাঁর পদবী বটে, কিন্তু তাঁর অপেক্ষা এক আদর্শ মহান নেতা তিনি। বহুগুণের অধিকারী। সহমর্মিতা ও উদার মানসিকতার উজ্জ্বল উপমা। তাই শেখ মুজিব জাতির কাছে হয়ে উঠেছেন ‘শেখ সাহেব’, ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘জাতির পিতা।’

“শামসুল হক থেকে
ওবায়দুল কাদের”

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সহাস্যমুখে উচ্চারণ কবলেন, “আমি মূলস্রোতের বাইরে কখনও কোন স্বপ্ন লালন করিনা। বাড়তি স্বপ্ন দেখতেও আমি অভ্যস্ত নই। মাননীয় নেত্রী শেখ হাসিনা যখন যা, নির্দেশ দিয়েছেন, তা সাধ্যমত পালনের চেষ্টা করেছি।
ওবায়দুল কাদের অতীতে ফিরে বললেন,২০০২ সালের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হয়েছিলাম, মাননীয় নেত্রীর নির্দেশেই। আবার সে প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়াই। সেটাও তাঁরই নির্দেশে।
ওই কাউন্সিলে দু’বারের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকও সাধারণ সম্পাদক পদে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
মাননীয় নেত্রী সার্বিক দিক বিবেচনা করে মনে করেছিলেন, আব্দুল জলিল ভালো করবেন। তাঁর নির্দেশেই আব্দুল জলিলের নাম সাধারণ সম্পাদক পদে প্রস্তাব করেছিলেন আব্দুর রাজ্জাক এবং আমি তা সমর্থন করেছিলাম। এবার আমি সাধারণ সম্পাদক হয়েছি। এখন আমার দলকে দেয়ার পালা।

“কর্মী থেকে নেতা”

ওবায়দুল কাদের। কর্মী থেকে নেতা’ হয়ে উঠেছেন যিনি। এটাই তাঁর জীবনসংগ্রামেরর বড় অর্জন এবং অহিংস অহঙ্কার। নিজেই এটা বলে আত্মতুষ্টিবোধ করেন। ওবায়দুল কাদেরের মাধুর্যমাখা কথাবার্তায় এরকম অহংবোধের প্রকাশ ফুটে ওঠে তাঁর কর্মীকূলের মাঝে থাকেন যখন খোলামেলা আলাপচারিতায়।
চিরদিন তিনি হেঁটেছেন ইতিবাচক সঙ্কল্পের পথে। অসত্যের দূরে দাঁড়িয়ে সত্যের সন্ধান করে চলছেন। তাঁর প্রাপ্তির ভান্ডারে যা কিছু যোগ হয়েছে, তা অক্লান্ত শ্রম, জেল, জুলুম,নিপীড়ন ও নির্যাতনের অসহনীয় গ্লানী বয়ে বেড়ানোর ভেতর দিয়ে। মোকাবেলা করেছেন, দলীয় নানা উপদলীয় ‘প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি।’
একজন প্রধান শিক্ষকের আদর্শ সন্তান হিসাবে তিনি ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠেন। অসচ্ছল পরিবারের সন্তান হলেও কখনো হতাশা তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি। মেধাবী ছাত্রত্বের সুবাদে বৃত্তিলাভ করেন বারবার। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্বজীবন। এর আগেই হাতেখড়ি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। সেই যে শুরু থেকে বর্তমানের সুবিশাল অর্জন।
তুখোড় ছাত্রনেতা ছাত্রলীগ কেবল নয়, আওয়ামী ঘরণায়ও ছিলেন অনেকের চোখের দিপ্তী। বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন অতি কাছ থেকে। বঙ্গবন্ধু তাঁর আদর্শ। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গুণী দপ্তর সম্পাদক হিসাবে সকলের নজর কাড়েন। যখন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের অস্তিত্ব গভীর সংকটাপন্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হয় ‘সেভেন মার্ডার,’ ছাত্রলীগের অন্তর্ঘাতমূলক বিবাদ, সংঘর্ষে।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান হত্যার নির্দেশদাতা হিসাবে অভিযুক্ত হয়ে বহিস্কৃত হন। কারাগারে অন্তরীণ শফিউল আলম প্রধানের হয়েছিলো যাবজ্জীবন কারাদন্ড।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর ওবায়দুল কাদেরকেও নিক্ষেপ করা হয় কারাগারে।
স্বপ্ন যেন হয়ে গেলো সুদূরপরাহত।
সুদূরপ্রসারী স্বপ্নের ফল নিয়ে চললো, এক নতুন দিগন্তে।

“আওয়ামী লীগ সেক্রেটারিদের উত্থান পতন”

জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদ যাঁরাই হয়েছেন, প্রত্যেকে টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। তাঁদের পক্ষে জুলুম,নির্যাতন এক অনিবার্য পরিণতি।
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা বাংলার সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রীয়ভাবে পাকিস্তান আওয়ামী লীগের আত্মপ্রকাশের বছর খানেক আগেই আসাম ফেরত মওলানা ভাসানীকে সভাপতি, শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক ও শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনার আলোকেই
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার কে এম দাশ লেনের বশীর হুমায়ুনের ‘ঐতিহাসিক রোজগার্ডেন’-এ সোহরাওয়ার্দীপন্থী মুসলিম লীগ কর্মীরা প্রতিষ্ঠা করে আওয়ামী লীগ।

“শামসুল হকের রাজনীতির অপমৃত্যু যে কারণে”

আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মের তিন মাসের ব্যবধানে সভাপতি আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে কারাগারে নিক্ষেপ করলেও টার্গেট করা হয় প্রথম সাধারণ সম্পাদক শামসুল হককে। সরকারী অপশক্তির চক্রান্তে অঙ্কুরেই এ প্রতিভান কারারুদ্ধ শামসুল হকের স্মৃতিশক্তি বিনষ্ট করে দেয়া হয়।
কারাগার থেকে মুক্তি মেলে যখন শামসুল হক পাগল প্রায়। সুশিক্ষিত স্ত্রী অধ্যাপিকা আফিয়া খাতুন প্রেমে পড়ে বিয়ে করলেও তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান বিদেশে। বিদেশী এক নাগরিককে বিয়ে করেন তিনি। এ খবর কানে আসে কারামুক্ত শামসুল হকের। মস্তিস্কে আরো বিকৃতি ঘটায় এ খবর। পাকিস্তান কায়েমের পরপরই
টাঙ্গাইল দক্ষিণ আসন শূন্য হয়। উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ প্রার্থী জমিদার খুররম খান পন্নীকে হারিয়ে দেন যুবক শামসুল হক। যদিও বিজয় বাতিল করা হয়। ফলে পূর্ববাংলায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেন শামসুল হক।
ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলে সভাপতির বক্তব্যে শামসুল হক নিজেকে সারা দুনিয়ার খলিফা ঘোষণা করে আজেবাজে কথা বলতে থাকলে সকলে আঁচ করে নেন যে তিনি সম্পূর্ণভাবে পাগল হয়ে গেছেন।
একটা সময় সবার অলক্ষ্যে হারিয়ে যান তিনি।

“শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীন”

১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ‘ছয়দফা’ ঘোষণা করে সরকার কর্তৃক পাকিস্তানের ‘দুশমন’ ঘোষিত হন।
১৯৬৬ সালে কাউন্সিল ডেকে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতির পদগ্রহণ করেন এবং দলের প্রথম সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক করেন।
অচিরেই ‘ছয়দফা’ জাতির মুক্তির সনদে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগ গণসংগঠন রূপে প্রতিষ্ঠালাভ করে। পাকিস্তানী জেনারেল আইয়ুব খান শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলানোর চক্রান্ত করলে, সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ তা রুখে দিতে জীবনবাজী রাখেন।
কারারুদ্ধ তাজউদ্দীন ১৯৭২ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ছবি সামনে রেখে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উপরাষ্ট্রপতি প্রকারান্তরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী হয়ে ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে অর্থমন্ত্রী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করে মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন।
যুদ্ধজয় যখন হাতের নাগালে এসে পরে তখনই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন খন্দকার মোশতাক আহমেদকে বরখাস্ত করে আব্দুস সামাদ আজাদকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী পদে আসীন করে চক্রান্তের শেষ দুর্গে আঘাত হানেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আগেই প্রণীত দিকনির্দেশনার আলোকে আওয়ামী লীগের ব্যনারে নয় মাস ব্যাপী সশস্র মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদান করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এর অভ্যুদয় ঘটান।
অন্য তিন সহকর্মীর ন্যায় তাজউদ্দীন আহমেদও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট নিহত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম আস্থা ও ভক্তির এক বিরল দৃষ্টান্ত উপাখ্যান রচনা করেন জীবন বিলিয়ে দিয়ে।
প্রথম সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের জীবন বিপন্ন হয়েছিল পাকিস্তানের নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান, খাজা নাজিমুদ্দিন ও নূরুল আমীনদের শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে।
আর দ্বিতীয় সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধুর ওপর জেলজুলুম নির্যাতন এমনকি ফাঁসিতে ঝুলানোর চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের তৃতীয় সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ নেতৃত্বের পরীক্ষায় সফল হলেও দেশীয় নরঘাতকদের হাত থেকে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে পারেননি।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে বঙ্গবন্ধু মোশতাক গংদের কারণে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমেদকে। আর বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সেই খন্দকার মোশতাকই আসীন হন রাষ্ট্রপতি পদে। বাকশালের কমিটিতে অবস্থান না পাওয়া তাজউদ্দীন তারপরও নিহত বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নেও যে জীবন বিলিয়ে দিতে পারেন, তা প্রমাণ করে দেন মোশতাকের খুনীক্রের হাতে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাপ্রকষ্টে জীবন দিয়ে।

“জিল্লুর রহমান”

১৯৭২ ও ১৯৭৪ সালের কাউন্সিলে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের চতুর্থতম সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান। তাঁর ওপরও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জেল-জুলুম,অত্যাচার চালানো হয়।
২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট বিএনপি-জামাত জোটের দুঃশাসনামলে তৎকালীণ সংসদের বিরোধী দলের নেতা ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাসহ শীর্ষনেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে চালিত ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় সহধর্মিণী আইভি রহমানকে হারাতে হয় জিল্লুর রহমানকে।
ওয়ান-ইলেভেনত্তোর শেখ হাসিনাকে কারারুদ্ধ করে রাজনীতি থেকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র হলে সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান দলের হাল ধরেন। যেমনটি বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে হাল ধরেছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমেদ।

“আব্দুর রাজ্জাক”

বঙ্গবন্ধু হত্যাত্তোর সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক ১৯৭৯ ও ১৯৮১ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আব্দুর রাজ্জাক পঞ্চমতম সাধারণ সম্পাদক হিসাবে অসাধারণ সাংগঠনিক প্রতিভা দেখাতে সক্ষম হলেও অচিরেই অভ্যন্তরীণ কলহের জের ধরে আওয়ামী লীগের বিপরীতে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত আব্দুর রাজ্জাক যে সময়টা বাকশালের পেছনে অপব্যয় করেন, সেই সময়টা যদি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে ব্যয় করলে আওয়ামী লীগে থেকে ব্যয় করলে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে হতো না।

“সাজেদা চৌধুরী”

১৯৮৩ সালে সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বহিস্কৃত হলে তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন। অপর যুগ্ম সম্পাদক আমির হোসেন আমু ও সাংগঠনিক সম্পাদক তোফায়েল আহমেদকে মোকাবেলা করে ১৯৮৭ সালের কাউন্সিলে সাজেদা চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কিন্তু শেখ হাসিনার প্রশ্নে যতটা আস্থাশীল ছিলেন, ততটা সাংগঠনিক দক্ষতা দেখাতে পারেননি তিনি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সাড়ে তিনবছরের শাসনামলে দু’বার সাধারণ সম্পাদক হওয়া জিল্লুর রহমানও সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেননি।
বঙ্গবন্ধু সভাপতির পদ ত্যাগ করে তাতে এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে বসালে আওয়ামী লীগ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালের শুরুতেই এমন পরিস্থিতিতে সাংবিধানিকভাবে একদল ব্যবস্থায় বাকশাল কায়েম করে সরকার এবং দলের সর্বময় ক্ষমতা বঙ্গবন্ধু নিজের হাতে নেন। কিন্তু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অনুকূলে আসার আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।

“আবারও জিল্লুর রহমান”

১৯৯২ সালের কাউন্সিলে আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতার মুখে কাউন্সিলরদের পরামর্শে সাধারণ সম্পাদক পদে জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করেন শেখ হাসিনা।
১৯৯৭ সালের কাউন্সিলে তৎকালীন সভাপতিমন্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু হয়ে হয়েও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন। সাধারণ সম্পাদক পদে জিল্লুর রহমানই আবার নির্বাচিত হন।
প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দলের ভরাডুবির দায় নিজের কাঁধে চাপিয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন শেখ হাসিনা।
কবি বেগম সুফিয়া কামালের অনুরোধ এবং নেতাকর্মীদের আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে নেন তিনি।
১৯৯২ সালে কাউন্সিলেই প্রথম বারের মতো উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিধান চালু করা হয়। ডঃ কামাল হোসেন, শেখ আব্দুল আজিজ, মতিয়ুর রহমানের মতো বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচরমন্ত্রীরা উপদলীয় কোন্দলের মুখে সভাপতিমন্ডলী থেকে ছিটকে পড়ে উপদেষ্টা পরিষদে স্থান পান। কিন্তু এতে করে আওয়ামী লীগ আবারও হোঁচোট খায়।
ডঃ কামাল হোসেন গণফোরাম গঠন করেন এবং অন্যরা রাজনীতি থেকেই অবসর নেন। সে সময় জিল্লুর রহমান কোন্দল থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সমর্থ হন।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমেদ, জিল্লুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এবং আব্দুল জলিল প্রত্যেকেই কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলেও ব্যতিক্রম শুধু সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
ওবায়দুল কাদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে কারাগারে গেলেও নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে কেবল তাঁর যাত্রা হয় শুরু।

“আব্দুল জলিল”

ওয়ান ইলেভেনের সময় আব্দুল জলিলের ন্যায় ওবায়দুল কাদেরও কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলে সুদর্শন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম রাজনীতিতে লাইম লাইটে ওঠেন। তাঁর পিতা মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাঙালি জাতির জাতীয় নেতা। জাতির পিতার আদর্শের সন্তান হিসাবে খুনী মোশতাকের কাছে নতিস্বীকার না করে মহাবীরের মতো সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঘাতকদের হাতে অন্য তিন নেতার মতো জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি।

“সৈয়দ আশরাফ”

সৈয়দ আশরাফ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হবার পর তাঁকে নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনে আমার অনেকগুলো রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। নেতাকর্মীরা তাঁর সান্নিধ্য পায় না বলে জেলার নেতাদের অভিযোগের অন্ত ছিল না। ক্ষোভ হতাশামূলক প্রতিক্রিয়াও ছিল। এটা ঠিক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সততায় উজ্জ্বল নক্ষত্র। পিতার ন্যায় সুশিক্ষিত ও সুশীল। শেখ হাসিনার প্রশ্নেও নিবেদিত প্রাণ। সুদর্শনও বটে। ইউরোপে বেড়ে ওঠা তাঁর ‘ব্যক্তিত্ব’ আলোকিত মানুষদের ‘আলঙ্কারিকভাবে’ মুগ্ধও করে। কিন্তু মাঠের ধুলো গায়ে চাপানো আওয়ামী লীগের লাখ লাখ নেতাকর্মী তাঁর ব্যক্তিত্বের মর্ম বোঝে না। মানুষ শহরমুখী হলেও গ্রামের সাদামাটা জীবনযাপনের ছাপ রয়ে গেছে আচার-আচরণে। তারা এতেই অভ্যস্ত।
মনেপ্রাণ তারা এমন একজন সাধারণ সম্পাদক আশা করে, যাঁর স্পর্শে কর্মীপ্রাণ ছুঁয়ে যাবে। সাংবাদিকতার পঁচিশ বছরে জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার শুধু নয়, একাধিকবার তাঁর সাক্ষাৎকারগ্রহণেরও বিরল প্রাপ্তি রয়েছে। যা আমার সাংবাদিকতাজীবনকে সমৃদ্ধ করেছে।
আওয়ামী লীগের তিন সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক এবং আব্দুল জলিলেরও একাধিকবার সাক্ষাতকারগ্রহণ করতে গিয়ে বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু মনে ব্যতিক্রম প্রতিক্রিয়া অনুভূত হয়েছে, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে ঘিরে। ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক সাধারণ শুরুতে দলীয় অফিসে ও বাসভবনের ভেতরে-বাইরে উপচে’পড়া হাজার-হাজার নেতাকর্মীর ভিড়ের মধ্যেও যে প্রাণসঞ্চার করে চলছেন, তা প্রতিপক্ষকে সত্যিই ঈর্ষান্বিত করবে।
যাহোক, অকল্যাণকর পরিস্থিতির মুখে অশুভের অনৈতিক হস্তক্ষেপ দেখেছে দেশের মানুষ। দেখেছে সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকারের দুঃসহ আমল।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের অনেককেই বাধ্যতামূলকভাবে রাজনীতির ময়দান ছেড়ে চলে যান কারান্তরালে। যে স্মৃতি মুছে যাবার মতো নয়।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে কর্মীবান্ধব ছিলেন আব্দুল জলিল। সুদক্ষ সংগঠক ওবায়দুল কাদের কর্মীবান্ধব নেতা হিসাবে পরিচিত সব সময়ই। ওয়ান ইলিভেনের শিকারে পরিণত হয়ে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সাবেক মন্ত্রী আব্দুল জলিলকে রাজনীতির ময়দান ছেড়ে যেতে হয়েছিল। তখন এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বগ্রহণ করেছিলেন।
ফখরুদ্দীন সরকারের আড়চোখা নীতির কারণে ওবায়দুল কাদেরকেও কারান্তরালে পাঠিয়ে দেয়া হয় একটা পর্যায়ে। ফলে দ্বিতীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু তিনি কয়েক দিনের মাথায় লন্ডনে চলে যান। তৃতীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুকুল বোসের ভাগ্য খুলে। তিনি ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হয়েই লাগামহীন কথাবার্তা বলে একাধিক শীর্ষ নেতাকে ডুবিয়ে দেন, আবার নিজে অতলে হারিয়ে যান।
শেখ হাসিনা কারারুদ্ধ হবার ঘটনা এবং সংস্কার পন্থীদের নানা অভিসন্ধির গুজব ছড়ানো হলে নেতাকর্মীদের কাছে বিতর্কিত হয়ে ওঠেন শীর্ষ নেতারাও। বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা ওই সঙ্কটকালে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে দেশে ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। এবং বিশিষ্ট ভুমিকা রাখেন।
দলের ভেতরে বাইরে নানা চক্রান্তের অভিযোগ সামাল দিয়ে আওয়ামী লীগ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান হাল ধরেন। শেখ হাসিনার মুক্তির আন্দোলন তরান্বিত করার ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বর্ষীয়ান নেতা জিল্লুর রহমানের সঙ্গে জুটি বাঁধেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
সরকার গণরোষের মুখে শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিয়ে লন্ডনে প্রেরণ করতে বাধ্য হয়। এর মধ্যেই আব্দুল জলিলও মুক্তি পান।
২০০৮ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর তাগিদ অনুভব করে সর্বস্তরের নেতাকর্মী। কিন্তু শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কর্মসূচির নেপথ্যে সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলের ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে নবীন নেতাদের পক্ষ থেকে। তাঁর ভুমিকা দায়সাড়ামূলক বলেও অভিযোগ ওঠে। প্রত্যাবর্তনের দিন বিমানবন্দরের সম্বর্ধনার লোকসমাগম প্রশ্নেও আব্দুল জলিলের ভুমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

ওবায়দুল কাদের

জলিলের শূন্যস্থানপূরণ প্রথানুযায়ী এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। কিন্তু শেখ হাসিনার স্নেহভাজন কারামুক্ত ওবায়দুল কাদের হলেও ‘লন্ডন প্যাকেজ’ এর কারণে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন হন সৈয়দ আশরাফ।
২০০৮ সালের ২৯ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশেরও অধিক আসন পাবার মূলে শেখ হাসিনার একক কৃতিত্ব বলে বিবেচিত হয় সর্বমহলে। তাঁর মন্ত্রিসভায় নতুনমুখের ছড়াছড়িতে বাদ পড়েন শীর্ষ প্রভাবশালী নেতারা। তার পরেও তাদের মধ্যে এমন আশঙ্কা ছিলনা, যে তারা দলের পদ থেকেও ছিটকে পড়বেন। যে কারণে শীর্ষ নেতারাই কাউন্সিল করার পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেন।
২০০৯ সালের ওই কাউন্সিল উদ্বোধনের কয়েক মিনিট আগে দলপ্রধানের নির্দেশে আব্দুল জলিলের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হলেও সাধারণ সম্পাদকের সাংগঠনিক রিপোর্ট পাঠ করেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। কাউন্সিলের পর আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৎকালীন হেয়ার রোডের বাসভবন থেকে নতুন কমিটি ঘোষণা করেছিলেন। নতুন কমিটিতে দেখা যায় সংস্কারপন্থী বলে বিতর্কিত শীর্ষ নেতারা সভাপতি মন্ডলীর পদ হারিয়েছেন।
আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও আব্দুল জলিল পদবীহীন হয়ে যান। তাদের সঙ্গে বাদ পড়েন কেন্দ্রের নেতা অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, মুকুল বোস, ডক্টর মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন,আখম জাহাঙ্গীর হোসাইন, আব্দুল মান্নান, সুলতান মোহাম্মাদ মনসুর আহমেদ, সাবের হোসেন চৌধুরী মাহমুদুর রহমান মান্না, মীর্জা সুলতান রাজাসহ আগের কমিটির অর্ধেকের বেশী পুরানো মুখ।
এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে সভাপতি মন্ডলীর সদস্য করে দুই নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
২০১৪ সালে আবারও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলেও শীর্ষ নেতাদের নেতৃত্বে ফেরার সকল সম্ভাবনা গুজবে পরিণত হয়। অর্থাৎ আগের কমিটিই প্রায় বহাল থাকে। সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনের আগে আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মন্ত্রীত্ব লাভ করেছিলেন।
এর আগেই আব্দুর রাজ্জাক ও আব্দুল জলিল প্রয়াত হন। আওয়ামী লীগের এবারের কাউন্সিলের মাধ্যমে সভাপতিমন্ডলীতে আবারও ফিরে আসছেন শীর্ষ নেতারা ,এমন সম্ভাবনার কথা গণমাধ্যমে প্রচার প্রকাশ হয়। কাউন্সিলরদের মাঝে আলোচনা হয় এ নিয়ে।
মন্ত্রিসভা থেকে এর আগেই ছিটকে পড়েন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কথিত এপিএস এর দুনীর্তি ধরা পড়ে গেলে। তারপরও সুরঞ্জিতের নাম সভাপতিমন্ডলীর সম্ভাব্য সদস্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
১৯ সদস্যের সভাপতিমন্ডলী তিনটি সদস্য পদ খালি রেখে এখনও আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সম্ভাবনাকে জিইয়ে রাখা হচ্ছে বলে মনে করেন নেতাকর্মীরা। এবারের কাউন্সিলের আলোকসজ্জা অভিজাত্যের রূপবরণ করে। কাউন্সিলে বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাব করে ‘চমক’ দেখিয়েছেন।
নাকি’ব্যর্থতার চমক’ দেখালেন, সেনিয়েও নেতাকর্মীদের মাঝে এখনও চলছে সরব আলোচনা।
সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সভাপতিমন্ডলীর সদস্য হয়েছেন। গুঞ্জন শুরু হয় ওবায়দুল কাদেরের সাধারণ সম্পাদক হবার পর থেকেই , সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। যদি তাই হন, তবে পিতার যোগ্যপুত্র হবেন তিনি। ১৯৭৫ সালে তিন নভেম্বর রাতে জাতীয় চারনেতাকে হত্যা করা হয়।
বিশ্বাসঘাতক রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সেই হত্যার শিকার হন, মুজিব নগর সরকারের চতুর্থ স্তম্ভ বলে বিবেচিত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পিতা উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তাঁর সহকর্মী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামানও নৃশংসভাবে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের হাতে নিহত হন একই সময়ে।
পরবর্তীতে লন্ডনে চলে যান সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
দীর্ঘদিনের ইউরোপিয়ান কালচারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন সৈয়দ আশরাফ। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায়ই মনিরুল হক চৌধুরী ও শফিউল আলম প্রধানের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের সহ প্রচার সম্পাদক ছিলেন তিনি। ছাত্রলীগের ওই কমিটির দপ্তর সম্পাদক ছিলেন আজকের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
১৯৭৬ সালে কারাগারে থাকাকালীন অবস্থায় ছাত্রলীগের সম্মেলনে সভাপতি হন তিনি।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদকে হারিয়ে নির্বাচিত হবার পর প্রতিমন্ত্রী হন। ওবায়দুল কাদের ক্রিকেটসহ ক্রীড়া ক্ষেত্রেও তিনি সাফল্য দেখান। অপরদিকে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে দেশে ফিরে পিতার আসন থেকে সংসদ সদস্য হন।
১৯৯৯ সালে শেখ হাসিনা সরকারের প্রতিমন্ত্রী হওয়া সৈয়দ আশরাফ ২০০২ সালে আওয়ামীলীগের দুই নম্বর যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। সরাসরি তিনি কেন্দ্রে উঠে আসলেও ওবায়দুল কাদের ধাপে ধাপে নেতৃত্বে উচ্চসারিতে অবতীর্ণ হন।
২০০২ সালের কাউন্সিলে দলের সাধারণ সম্পাদক পদে আব্দুল জলিলের সঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের নামও জোরেশোরে আলোচনায় উঠে এসেছিল। কাউন্সিলে শেখ হাসিনার নির্দেশনার আলোকে দুই বারের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক পদে আব্দুল জলিলের নাম প্রস্তাব করলে ওবায়দুল কাদের তাঁকে সমর্থন করে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। তাঁকে দলের এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক করা হয়। শীর্ষ নেতাদের কাউন্সিল নিয়ে অনীহা থাকলেও প্রবীণ নেতা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম এবং শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ কাউন্সিল অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ভুমিকাপালন করেছিলেন।
পাশাপাশি সে সময়ের অপেক্ষাকৃত নবীননেতা দলের তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক এবং শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম মেয়াদের যুব ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় উঠে আসেন। শেখ হাসিনার সবুজ সঙ্কেত ও ছিল ওবায়দুল কাদেরের প্রতি। কাউন্সিলে প্রার্থী হতে নির্দেশ দিলেও শেষ পর্যন্ত আব্দুল জলিলকে সাধারণ সম্পাদক করেন শেখ হাসিনা। সকলের মনে আশা জাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা স্নেহভাজন কর্মীবান্ধব ওবায়দুল কাদেরকে সাধারণ সম্পাদক করে দলকে ঢেলে সাজানোর সঙ্কেত দেন। শেখ হাসিনা ২০০২ সালের কাউন্সিলে যে পরিকল্পনার বীজ রোপন করেছিলেন তা যেন সময়ের ব্যবধানে বেড়ে উঠে আজ বাস্তবায়নযোগ্য হয়ে উঠলো।