আগে থেকেই নেতা নির্বাচিত : না’গঞ্জে আ’লীগের সম্মেলন আইওয়াশ!

আপডেট: নভেম্বর ২৫, ২০১৯
0

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ : কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নির্দেশনা মোতাবেক নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে চলছে সম্মেলন। উপজেলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ইউনিয়নগুলোতে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের এই সম্মেলন বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের তৃণমূূল নেতাকর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন আইওয়াশ ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রভাববিস্তারকারী নেতারা যেভাবে চাচ্ছেন ঠিক সেভাবেই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সবশেষ অনুুষ্ঠিত ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ওয়ার্ডগুলোর সম্মেলনে সেটাই হয়েছে। এগুলো তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কোন প্রাধান্য দেয়া হয়নি।

আওয়ামীলীগের সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের মেয়াদোত্তীর্ণ সব কমিটির সম্মেলন আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন দলটির সাধারণ সম্পাদক সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গত ১৫ সেপ্টেম্বর দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের পক্ষে পাঠানো চিঠিতে তিনি এই নির্দেশ দেন। দলের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছিল।

চিঠিতে দেশের সব জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠানো এই নির্দেশনায় বলা হয়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর ২০১৯ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। আসন্ন জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনের আগেই সংগঠনের যে সব শাখা কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে, সেসব কমিটির সম্মেলন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ওই সভায়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর সম্মেলন আগামী ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশনা হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

১৮ নভেম্বর বিকেলে বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরি পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত সভায় ১০ ডিসেম্বরের পূর্বে বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনের তারিখ ও স্থান নির্ধারনের পাশাপাশি একটি কার্যকর কমিটি গঠনের বিষয়ে সকলের মতামত নেয়া হয়।
উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, নবগঠিতব্য কমিটিতে যাতে পরিচ্ছন্ন ও ত্যাগী নেতারা স্থান পায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা এম এ রশিদকে যেভাবে আমরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছি, ঠিক তেমনিভাবে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনরায় বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করতে চাই। তাছাড়া তিনি যাকে পছন্দ করবেন, যার সাথে কাজ করে তিনি স্বাচ্ছন্দবোধ করবেন এবং যাকে পাশে রাখলে সংগঠনের জন্য ভালো হবে এমন একজনকে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার কাশিপুর ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ড কমিটি গঠন করা হয়েছে। দলের তৃনমূলের নেতৃবৃন্দদের সম্মতিক্রমে পর্যায়ক্রমে কমিটিগুলো গঠন করা হয়েছে বলে প্রচার করা হলেও কার্যতপক্ষে এর ব্যতিক্রম হয়েছে। কোন ভোটের ব্যবস্থা না করে সম্মেলনের দিন উপস্থিত থাকা নেতা কর্মীদের কণ্ঠভোটের মাধ্যমে কমিটি করা হয়েছে। যেখানে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস করেনি। শীর্ষ নেতারা যেভাবে চেয়েছেন ঠিক সেভাবেই কমিটি হয়েছে। নেতারা তাদের পছন্দের একজন দাঁড় করিয়ে বলেছেন, তিনি এই ওয়ার্ডের এই পদে রয়েছেন। আপনারা হাত উঠিয়ে সমর্থন দেন।

সম্প্রতি কাশিপুর ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ণ কর্মসূচি অনুষ্ঠানে কাশিপুর আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠান শেষে সকলের সম্মতিক্রমে প্রতিটি ওয়ার্ডের ৫১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। তারপর কাশিপুর হাটখোলা মাঠে ৪, ৫, ৬ নং ওয়ার্ডের আওয়ামীলীগের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ণ কর্মসূচি অনুষ্ঠান এবং কমিটি গঠন করা হয়। সেখানেও প্রতিটির ওয়ার্ডের ৫১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। সবশেষ দেওভোগ হাজী উজির আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ৭, ৮, ৯ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ণ কর্মসূচি এবং কমিটি গঠন করা হয়।

এখানেও প্রতিটির ওয়ার্ডের ৫১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। আর সবগুলো কমিটির বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ।
সবশেষ কয়েকদিন আগের ঘোষণা মোতাবেক গত ১৫ নভেম্বর সকাল হতেই শহরের পশ্চিম মাসদাইর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসতে থাকেন এনায়েতনগর ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের নেতারা। উদ্দেশ্য তিনটি ওয়ার্ডের সম্মেলন হবে সেখানে ঘোষণা করা হবে নতুন নেতৃত্ব। সকাল ১০টার মধ্যেই কানায় কানায় পূর্ণ ছিল পুরো আয়োজনস্থল। সকলে যখন নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় সরগরম তখনই জানিয়ে দেওয়া হলো সম্মেলন হচ্ছে না। আর দোহাই দেওয়া হলো এমপি শামীম ওসমানের।
সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানান, শামীম ওসমান জেলা আওয়ামী লীগের কোন পদে নাই। তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের প্রথম কার্যকরী সদস্য। আর শুক্রবার এনায়েতনগর ইউনিয়ন ৭,৮ও ৯ নং ওয়ার্ডের সম্মেলন হওয়ার দিন ধার্য ছিল। এটা মূলত ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগ ও জেলা আওয়ামী লীগের অধীনে। সকালে সম্মেলনস্থলে এসে এনায়েতনগর ইউনিয়ন সম্মেলন পরিচালনা কমিটির আহবায়ক ও ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, আমাদের প্রাণপ্রিয় এমপি আমাদের অভিভাবক এমপি শামীম ওসমানের বাড়ি জামতলাতে যা মাসদাইরের পাশেই

। সে কারণেই তিনি আজ নাই। তাঁর কাছ হতে সময় নেওয়া হয়নি। আমরা সকলেই চাই তিনি এখানে উপস্থিত থেকে সম্মেলনটা করবেন। তাই নতুন করে তাঁর দেওয়া তারিখ মোতাবেক সম্মেলন হবে। কারণ তিনি এখন নাই পবিত্র ওমরাতে ছিলেন যখন আজকের তারিখ নির্ধারণ করি।
এদিকে সম্মেলনস্থলে আসা বেশ কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আজ রীতিমত আমরা অপমানবোধ করলাম। এ সম্মেলনে যদি শামীম ওসমানকে প্রয়োজনই হতো তাহলে আগে কেন করা হলো না। সম্মেলন ঘোষণা দিয়ে সব কিছু চূড়ান্ত করা হলো, আমরা আসলাম কিন্তু ঘোষণা হলো সম্মেলন হলো না। এটা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রীতিমত অপমান করা হলো, খাটো করা হলো। এখন মনে হচ্ছে দলের চেয়েও ব্যক্তি বড়।

ফাইজুল ইসলাম ফতুল্লা থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হলেও ফতুল্লা ইউনিয়নের ৭ ও ৮ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের কমিটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তিনি যুবলীগ নেতা হয়ে আওয়ামীলীগের সম্মেলনের অনুষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। আর লোক দেখানো ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের আয়োজন করা হলেও দুটি ওয়ার্ড কমিটির তার নিজস্ব লোককে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। তিনি নিজে একটি ওয়ার্ডের সভাপতির সমর্থন হিসাবে ঘোষনা করেন। আর প্রস্তাকারী ও সমর্থণকারী তার নিজস্ব লোক দিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম প্রস্তাব করানো হয়। সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক প্রার্থী থাকা সত্বেও ফাইজুলের ভয়ে কেউ প্রার্থী হওয়ার সাহস করেনি বলে একাধিক নেতা এমন অভিযোগ করেন।

১৮ নভেম্বর বিকেলে ফতুল্লার কায়েমপুরস্থ একটি স্কুলে ফতুল্লা ইউনিয়নের ৭ ও ৮ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ত্রি বার্ষিকী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনে ব্যালট বাক্স রাখা হলেও ফাইজুল ইসলামের নির্দেশ মোতাবেক সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকের নাম প্রস্তাব ও সমর্থনকারীর নাম বলা হয়। ফাইজুলের ইচ্ছেমত অনুষ্ঠিত হয়েছে সম্মেলন এবং কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তবে অনুষ্ঠান চলাকালিন হাজীগঞ্জ এলাকার জনৈক এক আওয়ামীলীগ নেতা সভাস্থলে এসে অসহায়ের মত তার ওয়ার্ডের সভাপতি হওয়ার জন্য ফাইজুলের কাছে অনুমতি চাইছে। কিন্তু সেই আওয়ামীলীগ নেতাকে ফাইজুল বলে আমার প্রার্থী আছে। এ কথা বলে ফাইজুল সেখান থেকে চলে আসে এবং সেই আওয়ামীলীগ নেতা মনে কষ্ট নিয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন এবং নিজের বাড়িতে চলে যান।

এর আগে জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা অনুসারে রূপগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। গত ১৬ জুলাই সম্মেলনের মাধ্যমে রূপগঞ্জ থানা কমিটিতে সভাপতি পদে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর এমপি ও সাধারণ সম্পাদক পদে শাহজাহান ভূঁইয়া রয়েছেন। যিনি এর আগেও থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন। আর গোলাম দস্তগীর গাজী টানা তিনবারের এমপি এবং সর্বশেষ মন্ত্রীও হয়েছেন। তারপরেও তিনি রূপগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতির পর আকড়ে রেখেছেন। তারা যেভাবেই চেয়েছেন সম্মেলনে সেভাবেই কমিটি হয়েছে।

একইভাবে গত ২২ জুলাই আড়াইহাজার থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সভাপতি হিসেবে স্থানীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু নির্বাচিত হয়েছেন। রূপগঞ্জে সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা হলেও আড়াইহাজার সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়নি। সম্মেলন হলেও নজরুল ইসলাম বাবু তার মতো করেই কমিটি ঘোষণা করেছেন।

LEAVE A REPLY