ইউএনও’র গণশুনানী ঃ ডুমুরিয়ায় যেন আধাঁর কেটে জেগেছে আলোর মিছিল

আপডেট: নভেম্বর ১৯, ২০১৯
0

খুলনা ব্যুরোঃ
ভিতরে চলছে গণশুনানী। উৎসুক মানুষের ভিড় বারান্দার রেলিং ঘেঁষে। বাদী বিবাদী একই কক্ষে নানা প্রশ্নের প্রতিউত্তরে বিচারের হাকিমের সাথে। স্বল্প সময়ে সমাধান দিয়ে দুই পক্ষকে একসাথে মিল করে দিচ্ছেন। আধুনিক জন প্রশাসনকে আরও গতিশীল ও জনমুখী করতে নানা সমস্যা সম্ভবনা নিয়ে উপজেলা প্রশাসন দপ্তরে সপ্তাহে ৪দিন অনুষ্ঠিত হচ্ছে জনগণের উৎসবমুখর সাক্ষাৎকার। সরাসরি উপজেলা প্রশাসন জনগণের অভাব, অভিযোগ, আবেদন, নিবেদন গ্রহণ করছেন। তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয়সমূহ মীমাংশা করে নিশ্চিত করছেন জনগণের সেবা। যেন আধাঁর কেটে আলোর মিছিলে জেগেছে অবহেলিত সমাজ। এমনকি জেগেছে জনতা, ফিরে পেয়েছে আঁধার থেকে আলোর বার্তা। যে আলোয় আজ ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে সরকারের নানামুখী প্রশাসন সেবা। গত ১৮ মাসে উপজেলায় নিষ্পত্তি হয়েছে প্রায় ৩ হাজার অভিযোগ। এটা কোনো উপন্যাসের গল্প নয়, খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার নির্বাহী অফিসারের পাবলিক হেয়ারিং সেবা কাহিনী।

ডুমুরিয়া উপজেলার ভান্ডারপাড়া ইউনিয়নের পেড়িখালি গ্রামের গৃহবধু ডালিয়া হালদার। একযুগ ধরে সাংসারিক জীবনে স্বামীর যৌতুক দাবি ও অত্যাচারে দিশেহারা হয়ে পড়ে। দুই সন্তানের জননী ডালিয়াকে মারপিট করে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে ডালিয়া তার বাবার বাড়ি চলে যায়। অবশেষে ডালিয়া বিচার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট বিচার চেয়ে একটি অভিযোগ দেয়। ১ সপ্তাহের মাথায় গণশুনানীর মাধ্যমে ডালিয়া অভিযোগের নিষ্পত্তি পেয়ে স্বামীর সংসারে ফিরে যায়। বর্তমানে ডালিয়া স্বামীর সংসারে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে।

জমি নিয়ে অবৈধ দখলদারদের অপতৎপরতার শিকার হয়েছিলেন শাহপুর গ্রামের হাবিবুলালাহ খান। এক’শ বছরের দখলীয় ৫ একর মাছের ঘের ও জমি কতিপয় ব্যক্তি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা চালা্িছল। তারা ঘেরের মাছ ধরাসহ ভেঁড়ির উপরের গাছ পালা কেটে নিত। একপর্যায়ে তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট লিখিত অভিযোগ দেন। মাত্র ১দিনের শুনানীতে হাবিবুল্লাহ খান সুষ্ঠু বিচার পেয়ে দুষ্কৃতিকারীদের কবল থেকে মুক্তি পান।

এভাবে বিনা খরচে বিনা উকিলে বাদি বিবাদির উপস্থিতিতে অভিযোগের নিষ্পত্তি করছেন ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার। স্বল্প সময়ে দীর্ঘদিনের পুরোনো বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে গণশুনানীতে ঝুঁকছে এলাকার দরিদ্র ও অধিকার বঞ্চিত মানুষ। গ্রামীণ জনকল্যাণে সরকারের এমন উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়তে শুরু করেছে। গত ১৮ মাসে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তরে প্রায় ৩ হাজার অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার দপ্তর সূত্রে জানা যায়; গত ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে। পারিবারিক কলহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, যৌতুক নারী নির্যাতন, জমি দখল, গ্রামীণ সড়ক নিয়ে বিরোধ, টাকা পয়সা লেন দেন, শত্রুতার জের ধরে মারামারির মত ঘটনা।
ভান্ডারপাড়া আশ্রয়ন প্রকল্প (আবাসন) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পিপলু রাণীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন নাটক সাজিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট একটি অভিযোগ দেন। বদলী ও শাস্তির দাবিতে কতিপয় অভিভাবক ও এলাকাবাসি মানববন্ধন করে শিক্ষা অফিসারের নিকট স্মারকলিপি দেয়। বিষয়টি তদন্ত করে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে অভিযোগকারিরা লিখিত অংগীকার করেন যে এ ধরনের ষড়যন্ত্র থেকে তারা বিরত থাকবেন এবং আদালতে দাযেরকৃত মামলা প্রত্যাহার করবেন।

শুধু ডালিয়া, হাবিবুল্লাহ আর পিপলু রানী নয় এরকম নির্যাতিত হাজার হাজার সাধারণ মানুষ বিনা খরচে বিনা উকিলে বিচার পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন। ডালিয়া হালদার বলেন; খুব অল্প সময়ে ইউএনও স্যার আমার অভিযোগের বিচার করে আমাদের পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। কোন টাকা পয়সা বা কোন উকিল ছাড়া আমার বিচার করে দিয়েছেন। উনার মত ইউএনও থাকলে সমাজে কেউ অবহেলিত থাকতো না। আল্লাহ উনাকে অনেক বড় করবেন।

সাবেক ইউপি সদস্য ও রাজনীতিক এস এম মেসবাহুল আলম টুটুল বলেন; বিনা টাকায় বিনা উকিলে জনগণ হয়রানী ছাড়া বিচার পাচ্ছে। গরিব অসহায় মানুষের উচ্চ আদালতে যেতে হচ্ছে না। এতে জনগণ ও প্রশাসনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি হচ্ছে।

উপজেলার শোভনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত কুমার বৈদ্য জানান, ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাহসী পদক্ষেপ ও নির্যাতিত মানুষের অভিযোগ গণশুনানীর ফলে জনগণের অধিকার ও আস্থা ফিরে পেয়েছে। বিনা খরচে স্বল্প সময়ে দ্বন্ধ মীমাংশা হচ্ছে। এতে এলাকার মানুষ সুফল পাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষ নানামুখি হয়রানী আর্থীকভাবে উপকৃত হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা. শাহনাজ বেগম বলেন; গত ১৮ মাসে এ উপজেলায় গণ শুনানীর মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বৃহৎ উপজেলা হিসেবে বুধবারসহ সপ্তাহে বর্তমানে ৪ দিন অভিযোগের গণ শুনানী করা হয়ে থাকে। উচ্চ আদালতে যাওয়ার মত অসংখ্যা ঘটনা অসহায় গরিব নির্যাতিত ব্যক্তিদের স্বল্প সময়ে বিনা খরচে মীমাংসা করা হচ্ছে। জনগণ যে কোন ধরনের সমস্যার জন্য এ কার্যালয়ে আসে এবং ইউএনও এর রুমে যে কোন প্রয়োজনে আসার জন্য কোন অনুমতি লাগে না। বিশেষ করে নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের যেকোন ধরনের সমস্যা আমার সামনে উপস্থাপন করতে পারে এবং আমি আমার অবস্থান থেকে তা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।

সাবেক মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এমপি বলেন; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে জনবান্ধব প্রশাসন তৈরি করেছিলেন। একজন জনপ্রতিনিধি যেমন জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করেন তেমনি একজন সরকারী কর্মকর্তা তার উর্ধে নন। ডুমুরিয়াসহ সারা দেশে গণশুনানী এবং জনগণের সেবার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে। ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার একজন নারী হয়েও সরকারী দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জনগণের যেভাবে সেবা করে যাচ্ছেন এটা অনন্য দৃষ্টান্ত। আগের তুলনায় বর্তমান ইউএনও তৃণমূল পর্যয়ে ব্যাপক জনবান্ধব কাজ করছেন।
–মোঃ আনোয়ার হোসেন আকুঞ্জী

LEAVE A REPLY