ইরানি মরমি কবি মৌলানা জালালউদ্দিন রুমির জীবন ও অবদান

আপডেট: অক্টোবর ২৯, ২০১৮
0

জালালউদ্দিন মুহাম্মাদ মৌলানা রুমি সম্ভবত মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় মরমি কবি। তাকে চেনেন না এমন কোনো মুসলিম শিক্ষিত ব্যক্তির অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না।
অতীন্দ্রিয়বাদী ও সুফী ধারার এই কবি কেবল মুসলিম জ্ঞান-গুণী ও মনীষীদের ওপরই ব্যাপক প্রভাব ফেলেননি, অনেক অমুসলিম চিন্তাবিদও যুগে যুগে তার চিন্তাধারায় হয়েছেন গভীরভাবে প্রভাবিত।

খ্রিস্টিয় ত্রয়োদশ শতকের এই কবির অমর কবিতার স্পর্শে ফার্সি ভাষা হয়েছে সমৃদ্ধ ও বিশ্বব্যাপী নন্দিত।
ইরান-পরিচিতি বিষয়ের প্রখ্যাত ফরাসি বিশেষজ্ঞ হেনরি ম’সে সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেয়া উপলক্ষ্যে এক উৎসব অনুষ্ঠানে বলেছিলেন,

‘আমি আমার পুরো জীবনকে উৎসর্গ করেছি ফার্সি সাহিত্যের জন্য। বিশ্বের অধ্যাপক ও উচ্চ-শিক্তিত সমাজের কাছে অনন্য বিস্ময়ে-ভরা ফার্সি সাহিত্যের পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে আমি এটা বলতে বাধ্য যে ফার্সি সাহিত্যের রয়েছে মূল চারটি স্তম্ভ: ফেরদৌসি, সা’দি, হাফিজ ও মৌলাভি তথা মৌলানা রুমি। গ্রিক মহাকবি হোমারকে বলা যায় ফেরদৌসির কাছাকাছি পর্যায়ের কবি। আর সা’দি স্মরণ করিয়ে দেন প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক আনাতলি ফ্রাঁসের কথা।

হাফিজকে জার্মান মহাকবি গ্যাটের সঙ্গে তুলনা করা যায় যদিও গ্যাটে নিজেকে হাফিজের শাগরেদ বলে উল্লেখ করেছেন এবং হাফিজের বিশ্ব থেকে যে মলয়-সমীরণ বা মৃদুমন্দ হাওয়া বয়ে আসে তা থেকেই তার জন্ম হয়েছে বলে বিনয় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু মাওলানা রুমি হচ্ছেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যার সঙ্গে তুলনা করার মতো কোনো ব্যক্তিত্ব বা চেহারা আমি খুঁজে পাইনি। রুমির তুলনা রুমি নিজেই এবং তিনি এভাবেই চির-অনন্য হয়ে থাকবেন। রুমি কেবল কবিই ছিলেন না, বরং এর চেয়েও তার বড় পরিচয় হল তিনি ছিলেন সমাজতাত্ত্বিক ও বিশেষ করে এমন এক পূর্ণাঙ্গ মনোস্তাত্ত্বিক যিনি মানুষের মূল সত্ত্বা ও আল্লাহর পরিচয় যথাযথভাবে তুলে ধরেছিলেন। তাই রুমির গুরুত্ব বোঝা উচিত এবং তার মাধ্যমে নিজেকে ও আল্লাহকে চিনে নিন।’

ব্রিটেনের দৈনিক গার্ডিয়ান কয়েক বছর আগে এক নিবন্ধে লিখেছে, ‘এটা একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার যে,১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর সভ্যতাগুলোর মধ্যে সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে সর্বোচ্চ বিক্রীত বইয়ের তালিকায় যাঁর বই স্থান পেয়েছে, তিনি মার্কিন কালজয়ী সাহিত্যিক রবার্ট ফ্রস্ট,রবার্ট সউল, … কিংবা সিলভিয়া প্লাথ এমনকি শেক্সপিয়র,হোমার,দান্তে বা ইউরোপীয় অন্য কোনো কবির বই ছিল না। বরং সর্বোচ্চ বিক্রীত কবিতার বই ছিল মৌলাভি নামের এমন একজন বিখ্যাত ইরানী মরমী কবির ধ্রুপদী কবিতার বই,যিনি কয়েক শতাব্দী আগে ইসলামী শরিয়তের বিধি-বিধান শেখানোর কাজে নিয়োজিত ছিলেন।’

ইউনেস্কো ২০০৭ সালকে মৌলাভি বর্ষ নামকরণ করা সংক্রান্ত ইশতেহারে লিখেছে-” ইউনেস্কো মনে করে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ববর্গ কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ, জাতি, সংস্কৃতি বা গোত্রের লোক নন বরং তাঁরা সমগ্র মানব জাতির সম্পদ। অর্থাৎ দেশ-কাল-সমাজ-সংস্কৃতির উর্ধ্বে তাঁদের অবস্থান। এইসব কর্মসূচির লক্ষ্য হলো সেইসব মহান ব্যক্তিত্বের সাথে পরিচয় করানো যাঁরা মানবজাতির জন্যে মৌলিক অবদান রেখেছেন এবং বিশ্বসভ্যতা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন।”

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে মৌলাভি এবং তাঁর কবিতার ওপর। কেনো তাঁর জনপ্রিয়তা দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে? লন্ডন ভিত্তিক দৈনিক গার্ডিয়ান পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী কোলম্যান বার্কস মৌলাভির কবিতার বইয়ের যে অনুবাদ করেছেন বিশ্বব্যাপী তার অন্তত ৫ লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়েছে এবং তা বিশ্বের প্রধান ভাষাগুলোতে অনূবাদ করা হয়েছে। এসব দেশে কোনো বইয়ের বিক্রির পরিমাণ সাধারণত দশ হাজার অতিক্রম করে না।

বিশ্ববিশ্রুত কবি ও আরেফ রুমির জন্ম হয়েছিল হিজরি ৬০৪ সালের ৬ রবিউল আউয়াল তথা ১২০৭ সনের ৩০ ডিসেম্বর। তার জন্মস্থান ছিল প্রাচীন ও বৃহত্তর বালখ্ প্রদেশের বালখ্‌স নদী-সংলগ্ন একটি গ্রাম যেটি বর্তমানে তাজিকিস্তান, অথবা বর্তমান আফগানিস্তানের অংশ। রুমির পিতা বাহা উদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন বালখ্‌ এর একজন ধর্মতাত্ত্বিক, আইনজ্ঞ, এবং একজন অতীন্দ্রিয়বাদী বা সুফি সাধক। তিনি ছিলেন এই প্রদেশের সবচেয়ে বড় খতিব বা বক্তা যিনি রুমি এর অনুসারীদের কাছে “সুলতান আল-উলামা” নামে পরিচিত।
বৃহত্তর বালখ্‌ তখন ছিল ফার্সি সংস্কৃতি ও ইরফান বা সূফী ধারার আধ্যত্মিক সাধনা এবং জ্ঞান চর্চার প্রধান কেন্দ্র যা বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রুমির বাবা ছাড়াও তার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছেন সে সময়কার ফার্সি মরমি কবি ফরিদউদ্দিন আত্তার নিশাপুরি এবং হাকিম সানাই। মাওলানা রুমি আত্তার ও সানায়ির প্রশংসা করে লিখেছেন: ‘আত্তার হচ্ছেন প্রাণ আর সানায়ি আমার দুই চোখ। আমি এসেছি সানায়ি ও আত্তারের পরে।’

মৌলানা রুমি তার আরেকটি কবিতায় আত্তারের প্রশংসা করে বলেছেন “আত্তার ভালবাসার সাতটি নগরই ভ্রমণ করেছেন আর আমি এখনও একটি গলির মুখে অবস্থান করছি”।

রুমি তাঁর পৈতৃক দিক থেকে প্রখ্যাত সুফি সাধক নাজিম উদ্দিন কুবরা’র বংশধর ছিলেন বলে অনেকেই মনে করেন। তিনি তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় রুম সালাতানাতে কাটিয়েছেন। রুমি ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেছেন। তাঁকে কোনিয়ায় সমাহিত করা হয় এবং সেটি একটি তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে।

রুমির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সুলতান ওয়ালাদ এবং তাঁর অনুসারীরা “মৌলভী ঘরানা বা তরিকা” চালু করে। তাদেরকে ঘূর্ণায়মান বা নৃত্যরত দরবেশও বলা হয়,যেটি সুফী নৃত্যে “সামা” এর জন্য বিখ্যাত। রুমিকে তাঁর পিতার কাছে দাফন করা হয় এবং তাঁর কবরের ওপর একটি সুরম্য দরগাহ নির্মাণ করা হয়।

রুমি ৫ বছর বয়সে তার বাবা ও মায়ের সঙ্গে হজ্বব্রত পালন করেন বলে বর্ণনা রয়েছে। এ সময় তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ ও অঞ্চল ভ্রমণ করেন।
রুমির বয়স যখন ১২ বছর তখন তার বাবা বাহাউদ্দিন তাকে বিশিষ্ট সুফি সাধক শেখ ফরিদউদ্দিন আত্তারের কাছে নিয়ে যান। সুফি-কবি ও দার্শনিক আত্তার শিশু রুমির কথাবার্তায় মুগ্ধ হন এবং মন্তব্য করেন যে, এই বালক একদিন তাঁর প্রেমের আগুন দিয়ে এই পৃথিবীর প্রেমিকদের পোড়াবে।

আত্তারের বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছিল। কারণ, রুমি আধ্যাত্মিক প্রেমের জগতে এমন আগুনের আবির্ভাব ঘটিয়েছেন যে সে আগুনে প্রেমিকরা পুড়ে গিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে সক্ষম হন। #

LEAVE A REPLY