ইসলাম এবং বঙ্গবন্ধু : `বাংলার মানুষকে ফেলে বেহেস্তে গেলেও শান্তি পাবো না’

আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০১৯
0

সোহেল সানি :
বঙ্গবন্ধু দৈহিকভাবে না থাকলেও তাঁর প্রতিটি কথা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আজও। দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁর অনুসৃত নীতি অনুসরণ যোগ্য।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিচালিত শুদ্ধি অভিযানের লক্ষ্য উদ্দেশ্যও যেন বঙ্গবন্ধুরই কথার প্রতিধ্বনি।
বঙ্গবন্ধু নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে নির্ভেজাল নিষ্কলুষ ছিলেন বলেই বলতে পেরেছেন যে,
“রাজনীতির অঙ্গনে “ঢাক ঢাক গুড় গুড়” নীতিতে আমরা বিশ্বাসী নই। জনগণের জন্য যা চাই তা সুস্পষ্ট ভাষায়, সরাসরি ঘোষণা করি। এ কারণে কখনও ইসলাম বিরোধী, কখনও রাষ্ট্রদ্রোহী কখনও বিচ্ছিন্নতাবাদী আবার কখনও “বিদেশী চরের অাখ্যা পেতে হয়েছে।”
বঙ্গবন্ধু. তাঁর ভাষণে বলেন,
তারপরও রক্তচক্ষুর সামনে সত্যকে বর্জন করিনি – রক্তচক্ষু দিয়েই তার জবাব দিয়েছি। ন্যায় বিচার দাবি করায় মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ আমার ওপর নেমে এসেছিল।
মহানবী(সঃ) কে করা কটুক্তিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতেও ইসলাম প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান অনুকরণীয় হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে গণপরিষদে দেয়া রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী ভাষণে
বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ ঘোষণা করে বলেন, “বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ধর্মনিরপেক্ষ মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান মুসলমানের ধর্ম পালন করবে, হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে, খৃষ্টান তার ধর্ম পালন করবে, বৌদ্ধ তার ধর্ম পালন করবে। এ মাটিতে ধর্মহীনতা নেই, ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। এর একটা মানে আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা চলবে না। ধর্মের নামে মানুষকে লুট করে খাওয়া চলবে না। ধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার, আলবদর হওয়া চলবে না এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দেয়া হবে না।
সাম্প্রতিক ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কয়েকটি স্মারক চুক্তি প্রশ্নে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত নীতি অনুসরণ করে দেশের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেনি। জাতির পিতার নীতিনির্ধারণী ভাষণে ঘোষিত রাষ্ট্রীয় চার স্তম্ভের প্রথমটি জাতীয়তাবাদের দিকে দৃষ্টি দেয়া যায়। জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “আমার বাংলার সভ্যতা, আমার বাঙালী জাতি – এ নিয়ে হলো বাঙালী জাতীয়তাবাদ।”
সমাজতন্ত্রকে দ্বিতীয় স্তম্ভ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু বলেন, “এ সমাজতন্ত্র আমি দুনিয়া থেকে ভাড়া করে আনতে চাই না, এ সমাজতন্ত্র হবে বাংলার মাটির সমাজতন্ত্র। এ সমাজতন্ত্র বাংলার মানুষের সমাজতন্ত্র, তার অর্থ হলো শোষণহীন সমাজ, সম্পদের সুষম বন্টন। বাংলাদেশে ধনীদের আর ধন সম্পদ বাড়াতে দেব না। বাংলার কৃষক, মজদুর, শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী এ দেশে সমাজতন্ত্রের সুবিধা ভোগ করবে।”
বঙ্গবন্ধু বলেন,”সমাজতন্ত্র যেখানে আছে সে দেশে গণতন্ত্র নাই। দুনিয়ায় আমি বাংলার মাটি থেকে দেখাতে চাই যে, গণতন্ত্রের মাধ্যমে আমি সমাজতন্ত্র কায়েম করবো। আমি ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আমি জনগণকে ভালোবাসি, আমি জনগণকে ভয় পাই না। দরকার হলে আবার ভোটে যাবো।,”
বঙ্গবন্ধু খাঁট জাতীয়তাবাদী ছিলেন। তিনি অপর এক ভাষণে বলেন,”আমার দেশ স্বাধীন দেশ। ভারত হোক, আমেরিকা হোক, রাশিয়া হোক, গ্রেট বৃটেন হোক, কারো এমন শক্তি নাই যে, আমি যতক্ষণ বেঁচে থাকি, ততক্ষণ আমার দেশের অাভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
একদল লোক বলছে মুজিবুর রহমান লন্ডন যাবে। কিন্তু মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও যাবে না। মুজিবুর রহমান বাংলার মানুষকে ফেলে বেহেস্তে গেলেও শান্তি পাবে না।”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলমান শুদ্ধি অভিযানে জাতির পিতারই মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “সব দলেই ভাল-মন্দ মানুষ আছে। যারা খারাপ, তারা সব সময়ই খারাপ। আমার দলের মধ্যে কেউ যদি দুর্নীতি বা চুরি করে, বিশ্বাস রাখতে পারেন, তাকে কেমন করে শায়েস্তা করতে হয়, আমি জানি। ৩৭ জন এমসিএ- কে (এমপি) বহিষ্কার করেছি। ভবিষ্যতে যদি কোনো এমসিএ বা পার্টি – সে যে পার্টিরই হোক না কেনো, কিংবা কোনো শ্রমিক নেতা বা ছাত্রনেতা চুরি করে তাহলে মাফ করবো না। মজুদদার, চোরাকারবারি আর চোরাচালানিরা হুঁশিয়ার হয়ে যাও। হুশিয়ার করে দিয়ে বলতে চাই, যারা শহরে সরকারি বাড়ী, গাড়ী দখল করে আছো, যারা দোকান বা অন্যের জমি দখল করে আছো, যারা মজুদ করছো, জিনিসের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছো, তাদের রেহাই নেই।…. আমি এক একটা এলাকায় কারফিউ দেবো আর সমস্ত পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে তল্লাশি চালাবেন। এতদিন আমি কিছু বলি নাই। এখন বলে দিলাম, হুকুম দিয়ে দিলাম। এরপরেও বড় বড় বক্তৃতা করবে আর রাত্রি বেলায় চোরা গাড়ীতে চড়বে, এটা হবে না। আমার প্রাণ থাকতে নয়। বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান। আর ঘুঘু ধান খাওয়ার চেষ্টা করো না। আমি পেটের মধ্য হতে ধান বের করে ফেলবো।
“ইসলাম ও আওয়ামী লীগ”
বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। একথার জবাবে সুস্পষ্ট বক্তব্য- লেবেল সর্বস্ব ইসলামে আমরা বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে।
বঙ্গবন্ধু বলেন, আমাদের ইসলাম হযরত রসূলে করীম (সঃ) এর ইসলাম, যে ইসলাম জগতবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র।
ইসলামের প্রবক্তা সেজে দেশের মাটিতে বরাবর যারা অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছেন, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদের বিরুদ্ধে।
যে দেশের শতকরা ৯৫ জনই মুসলমান সেই দেশে ইসলাম বিরোধী আইন পাসের সম্ভাবণার কথা ভাবতে পারেন কেবল তারাই ইসলামকে যারা ব্যবহার করেন দুনিয়াটা ফায়স্থা করে তোলার কাজে।
ছাত্রলীগের অধঃপতনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ উল্লেখযোগ। বলেছিলেন,”আমি যদি আত্ম বিশ্লেষণ করতে না পারি, আত্মসংযম করতে না পারি, তাহলে অন্যকে বলার আমার কোনো অধিকার নাই। সারাদিন কি করলে তা রাতে শোবার সময় একবার হিসাবনিকাশ করো, আজ ভালোমন্দের হিসাব রাখলে পরেরদিন কাজে লাগবে। মানুষ তোমাদের কথা শুনবে, দেখবে, শিখবে, ভালো বাসবে, শ্রদ্ধা করবে। কেউ কোনদিন বলপ্রয়োগে ভাল কিছু করতে পারে না। সোনার বাংলা গড়তে সোনার মানুষের দরকার। তা না হলে শেখ মুজিবুরকে বেটে খাওয়ালেও পারা যাবে না।

LEAVE A REPLY