`এই শিক্ষাব্যবস্থায় মানসিক চাপে মাথার চুলকেও বোঝা মনে করছে শিক্ষার্থীরা ‘

আপডেট: ডিসেম্বর ১, ২০১৯
0

খান মেহেদী :

আমরা প্রাইমারিতে ইংরেজি গ্রামার এ পড়তাম আর্টিকেল, জেন্ডার এসব। এইট নাইন এসে হয়ত টেনস, ভয়েস চেন্জ ন্যারেশন বা কারেকশন, এপ্রোপ্রিয়েট প্রিপোজিশন এসব পড়তে হতো। এনটোনিম সিনোনিমের ধারে কাছেও আমরা যাইনি বিসিএস এর আগ পর্যন্ত, তাতে ইংরেজি শিক্ষায় খুব বেশী ঘাটতি হয়েছে এমনটা মনে হয় না।

আমার গিন্নীর ছোট ভাইয়ের ছেলে এবার ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ এ ৩য় শ্রেনীতে ভর্তি পরীক্ষা দিবে। কি পড়তে হচ্ছে না তাকে? এন্টোনিম সিনোনিম, জেনারেল নলেজ থেকে শুরু করে যোগ বিয়োগের সংজ্ঞা পর্যন্ত ( জীবনে অনেক যোগ বিয়োগ করেছেন কিন্তু এর সংজ্ঞা কি কখনো পড়েছেন?)।

বেচারার জীবন অতিস্ঠ। সকালে পড়ে বিকালে ভোলে, বিকালে পড়ে রাতে ভোলে।খেলাধূলা আনন্দ সব হারাম।
তার মা দিনের মাঝে সাতবার বলে এই ছেলে জীবনে করে খেতে পারবে না। আমরা যারা একটু বয়সি তারা একটু নিজের শৈশবটা এর সাথে তুলনা করুন।

আমার পুরোনো এক ছাত্রির বাচ্চা মেয়ে ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ি স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিবে। পিচ্চিটা দারুন, গল্পের বই এর পোকা ( আমার যা খুব পছন্দ), ছড়া গল্প লেখে ওর বয়সের তুলনায় যা খারাপ নয় মোটেই। কিন্তু এখানে আবার উল্টা। বই থেকে দাড়ি কমা শুদ্ধ সব লিখতে হবে। কেউ যদি পানির জায়গায় জল লেখে তাহলে সেটা ভুল। এক মার্কস কমা মানে আউট।আমি বলি এখন সৃজনশীল সিস্টেম কিন্তু এখানে তো গোড়াতেই সৃজনশীলতার বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে।

ওর সমস্ত কিছু বন্ধ এমনকি দুপুরের ঘুমও। সেই সময়টা মাঝে মাঝে ওর মা আমাকে ডেকে নিয়ে যায়, বলে স্যার আপনি থাকলে ও একটু এই সময় বই নিয়ে বসে ( যদিও ওর বাসায় আমি যেতে চাইনা, কারন পিচ্চিটাকে দেখলে আমি নিজের মেয়ে না থাকার অভাবটা বেশী করে উপলব্ধি করি)। পুরো বই দাড়ি কমা শুদ্ধ ঠোটস্হ থাকার পরও এইটুকু বাচ্চা আর তার মা সবসময় শংকায় থাকে যদি বাই চান্স একটা দাড়ি বা একটা কমা ভুল হয়ে যায় তাহলে কি হবে?

ভাবি কি হবে যদি ঐ স্কুলে চান্স না হয়? স্কুল একটা ফ্যাক্টর একমাত্র নয়। আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করি স্কুল বা টিচারের ভূমিকা ২০%, ছাত্র আর অভিভাবকের বাকি ৮০। মুমিনুন্নিসায় এসে আমার এ ধারনা এখন আরো পোক্ত হয়েছে।

যত উপরে যায় চাপ তত বাড়ে। সকালে হাটতে যাই দেখি আমার কলেজের মেয়েরা ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছে পড়তে,ড্রেস পড়া। বলি কিরে বাবা নাস্তা হয়েছে? বলে না স্যার। সেই বের হয়, তারপর কলেজ, আবার প্রাইভেট। আসর মাগরিব নামাজে যাই, দেখা হয় আবার। বলি এই শেষ না আরো আছে? বলে স্যার আরো দুটো আছে।

একটানা তিনটা প্রাইভেট পড়লে মাথায় কি ঢুকবে আল্লাহ জানেন। কিছু করার নেই, বস টিচার রা সময় দিতে পারেনা। কেউ কেউ ক্লাশ রুমেই টিফিন বক্স খুলে বসে, কোন কোন টিচার বকে, আমি বলি আগে খেয়ে নে, পেটে খেলে তো পিঠে ( মাথায়) সইবে।

সারাদিন দৌড়ানোর পর বাড়িতে গিয়ে বেশীরভাগেরই পড়ার ইচ্ছা বা এনার্জি কোনটাই থাকেনা। ফলাফল যখন আশানুরুপ হয়না তখন শুরু হয় হতাশার পালা। এর উপর থাকে গার্ডিয়ানের চাপ। আমার এক ছাত্রির বাবা ইন্জিনীয়ার। তাদের কথা মেয়েকে বুয়েটে চান্স পেতেই হবে। বুয়েটে চান্স হবে কি হবেনা তার চেয়ে চান্স না পেলে বাবা মা ওর সাথে কথা বলবে না এই ভয়টাই এখন ওকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলছে। আমাদের কলেজে যে মেয়েটা ফার্স্ট হয় একদিন পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখি ও চুল কেটে একদম কদম ছাট দিয়ে এসেছে। ও মাঝখানে অসুখের জন্য ইন্ডিয়া গিয়েছিলো। বললাম তোমার কি অপারেশন হয়েছে, চুল কেটেছো কেন? বললো না স্যার, অপারেশন না এমনিতেই। পাশের মেয়েটা বললো স্যার চুল খুব ডিস্টার্ব করে। মানসিক চাপটা এখন এমন যে চুলকেও বোঝা মনে হয়।

এর উপর আরো সমস্যা সৃস্টি করেছে জিপিএ সিস্টেম। দুটো একটা বিষয়ে আশির জায়গায় আটাত্তর পেলেই তার জিপিএ কমে দাড়াবে হয়ত ফোর পয়েন্ট এইট। মেডিকেল এডমিশনে যখন এটাকে পচিশ দিয়ে বা ঢা বি তে বারো দিয়ে গুন দিবে তখন সে পিছিয়ে যাবে অনেক যা আর রিকভারি করা সম্ভব হবে না অথচ টোটাল মার্কসকে গুন দিলে সে এতটা পিছিয়ে যেত না। কিন্তু এসব কে ভাবে? অথচ সামান্য ০.০১ এর জন্য কেউ যখন তার প্রার্থিত জায়গায় চান্স পায়না তখন সে যে মানসিক বিপর্যয় বা সামাজিক নিগ্রহের সন্মুখিন হয় সেটা শুধু জানে ভুক্তভোগী ছাত্র বা ছাত্রি আর আমার মত তাদের দু একজন সমব্যাথিরা।

এদের জন্য কস্ট হয়। জানিনা আমরা কোথায় কোনদিকে যাচ্ছি। সমস্ত সুকুমারবৃত্তি বাদ দিয়ে শুধু পড়ো পড়ো বলে এদের আমরা কোন পরিনতির দিকে ঠেলে দিচ্ছি। থ্রি ইডিয়টের আমির খানের মত বলতে ইচ্ছে হয়

Give them some rain
Give them some sunshine
Give them some time to live their own life

( আরো অনেককিছুই ছিলো বলার কিন্তু লেখাটা বড় হয়ে গেলো, এমনিতেই কেউ পড়বে না) ।
প্রথমত পিইসি জেএসসি উঠিয়ে দেন। সৃজনশীল বিশেষ করে এম সি কিউ উঠিয়ে দেন। যত্র তত্র অনার্স খোলা বন্ধ করে কারিগরী শিক্ষার উপর জোর দেন। একটা দুটো ক্যাডারকে প্রাধান্য দেয়া বন্ধ করে সরকারী চাকুরী তে সবার সমমূল্যায়ন নিশ্চিত করুন। সর্বোপরি জাতীয় জীবনের সর্বত্র মেধার প্রাধান্য নিশ্চিত করুন। ভর্তি পরীক্ষায় কোচিং সিস্টেম উঠিয়ে দেন। শিক্ষা প্রতিস্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যাক শিক্ষক দেন। শিক্ষা প্রতিস্ঠানগুলোতে অবকাঠামো অনুযায়ি ছাত্র ভর্তি নিশ্চিত করুন। এক ক্লাশে দেড়শত ছাত্র থাকলে সে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য। উইচ হান্টিং না করে ক্লাশটাইমে প্রাইভেট পড়ানোটা বন্ধ করেন।তবে সমাজে লোভের যে লেলিহান শিখা জ্বলছে, আর শর্টকাটে পাওয়ার প্রবনতা বাড়ছে এসব করেও হয়ত এমন অসম কম্পিটিশন বন্ধ হবে না তবে কিছুটা উন্নতি হতে পারে।

খান মেহেদী
লেখক : শিক্ষক

LEAVE A REPLY