চিরনতুন শেষ ২২ শ্রাবণ : কোনও বিচ্ছেদের দিন নয়

আপডেট: আগস্ট ৮, ২০১৯
0

‘বাইশে শ্রাবণ’ আসলে কোনও বিচ্ছেদ, কোনও চলে যাওয়া নয়, শত শ্রাবণের বৃষ্টিও নেভাতে পারে না, এমন এক স্থির অকম্পমান অনন্ত চিরাগশিখার নির্মাণ, যাকে কেউ ‘মৃত্যু’ বলে ভুল নামে ডাকে!

এ পথ দেখিয়ে ছিন্নপত্রাবলীতে তাঁর লেখা, ‘ব্যক্তি হিসেবে দেখতে গেলে মৃত্যু কত উৎকট, যার মধ্যে কোনো সান্ত্বনা নেই কিন্তু বিশ্বজগতের হিসেবে দেখতে গেলে মৃত্যুটা অতি সুন্দর ও মানবাত্মার সান্ত্বনাস্থল’। আশৈশব উপনিষদে দীক্ষিত কবি এই বিশ্বাসে শান্তি পেতে চেয়েছেন যে, মৃত্যু শুধু স্থূল শরীরের পরিত্যাগ, আমিত্বের চেতনাবিলোপ, আত্মা অখণ্ড মহাবিশ্বে বিলীন হয়। কিন্তু সংশয় সদা তাড়া করে ফিরেছে।

সারা জীবন ধরে একের পর এক প্রিয়জনের মৃত্যু তাঁর পিছু ছাড়েনি তিনিও মৃত্যুর সঙ্গে বোঝাপড়া ছাড়েননি। কুড়ি বছরের টগবগে যৌবনেও তিনি মৃত্যু নিয়ে ভাবছেন, মৃত্যুর বাঁধা ছক ভেঙে ফেলছেন, ‘মরণ রে তুঁহু মম শ্যামসমান’।

৩১-এর ভরা জীবনে নিরালা রাতেও সেই পরানসখার সঙ্গে তাঁর দে দোল দোল খেলা, ‘আমি পরানের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা নিশীথবেলা’। ‘ঝুলন’ কবিতায় ‘আমি’ আর ‘সে’, জীবন আর মরণের দ্বন্দ্বকে পাশাপাশি বসিয়ে বুঝিবা এক সমঝোতার চেষ্টা, ‘মরণদোলায় ধরি রশিগাছি/ বসিব দুজনে বড়ো কাছাকাছি,/ ঝঞ্ঝা আসিয়া অট্ট হাসিয়া মারিবে ঠেলা,/ প্রাণেতে আমাতে খেলিব দুজনে ঝুলন-খেলা/ নিশীথ বেলা’।

রাধাভাবে শ্যামরূপে মৃত্যুকে কামনা করেও সংশয় একটু থেকেই যায় আর সেই শঙ্কাকে জয় করার আকুতি সবখানে, ‘…জীবন আমার/ এত ভালোবাসি বলে হয়েছে প্রত্যয়,/ মৃত্যুরে এমনি ভালো বাসিব নিশ্চয়’। কখনো বা ধৈর্যচ্যুতি, ‘…নূতন ঊষার স্বর্ণদ্বার খুলিতে বিলম্ব কত আর’। আবার তার পরেই সম্পূর্ণ বীপ্রতীপ ঘোষণা, ‘…মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’! এই দ্বন্দ্বে দীর্ণ হতে হতে ‘মৃত্যুঞ্জয়’ কবিতায় সেই দুর্জয় নির্দয় মৃত্যু, পৃথিবী কাঁপে যার শাসনে তাকে শেষ পর্যন্ত জয় করেই ফেললেন, ‘আমি মৃত্যু চেয়ে বড়ো এই শেষ কথা ব’লে/ যাব আমি চলে’। এর পরেও মৃত্যুদর্শন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনের ভিতরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভবের প্রকাশ সমগ্র রবীন্দ্রনাথ রচনাবলী জুড়ে। কেমন হবে রবিহীন পৃথিবী, কল্পনায় তা বারবার আসে কবির মনে, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’ অথবা ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে/ কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি/ কৌতূহলভরে’। মৃত্যুকে অস্বীকার করার কোনও পথ নেই। অনন্ত সময়ের কাছে নগণ্য একটি বিন্দুও নয় জীবনের অবস্থান। ‘হায় রে নির্বোধ নর,/ কোথা তোর আছে ঘর,/ কোথা তোর স্থান’। এই সত্যবীক্ষণ হলে তাকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ‘যেতে যদি হয় হবে—/ যাব, যাব, যাব তবে’। এ বার নিঃশর্ত সমর্পণ। অমোঘ সত্যকে যতখানি নান্দনিক ভাবে নির্মাণ করা যায়, পূজা পর্যায়ের সব গানেই তারই প্রকাশ।

ধূসর নরম আলো বিছানো চরাচর। না রাত না দিন। ছায়া ছায়া অচেনা গাছ। অচেনা ফুলের গন্ধ। আকাশ জল ঝরায় কিন্তু কেউ ভেজে না। অস্পষ্ট দিগন্তরেখার দিকে এক আলোকিত প্রাণ ধীরে হেঁটে চলেছেন, সাদা কালো ওয়াশে আঁকা, কোনও রং নেই তবু কী বর্ণময় দ্যুতি। আবহসঙ্গীত বাজে, ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।/ তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে’। কোনও উচ্চকিত শব্দ নেই। কেউ আঁচলে চোখ মুছলে কানে বাজে, ‘নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ,/ সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে’

আকাশগঙ্গায় ঢেউ ওঠে পড়ে, পায়ের কাছের ঝরাফুল কুড়িয়ে প্রিয়জন যখন দীর্ঘশ্বাস গোপন করতে পারেন না, তখন তার কর্ণকুহরে কেউ গেয়ে চলেন, ‘তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূরে আমি ধাই/ কোথাও দুঃখ কোথাও মৃত্যু কোথা বিচ্ছেদ নাই’।

তার পরেও কখনও কেউ ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘আর কি গো দেখা হবে,/ আর কি সে কথা কবে,/ কেহ নাহি জানে’। ঠিক তখনি ফুটে ওঠে, ‘ফুরায় যা, তা/ ফুরায় শুধু চোখে,/ অন্ধকারের পেরিয়ে দুয়ার/ যায় চলে আলোকে।/ পুরাতনের হৃদয় টুটে/ আপনি নূতন উঠবে ফুটে,/ জীবনে ফুল ফোটা হলে/ মরণে ফল ফলবে’।

সারা জীবন ধরে জন্ম ও মৃত্যুর জটিল অঙ্ক মেলানোর সাধক রবীন্দ্রনাথ। জীবনস্মৃতিতে তাঁর নিজের কথায়, ‘আমার তো মনে হয় আমার কাব্যরচনার এই একটি মাত্র পালা। সে পালার নাম দেওয়া যাইতে পারে, সীমার মধ্যেই অসীমের সহিত মিলনসাধনের পালা’।

####অমিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি রবীন্দ্রজীবনকে নতুন করে দেখায়। মৈত্রেয়ী দেবীর ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’, নির্মলকুমারী মহলানবিশের ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর মতো বইয়েও সেই পরিচয় সুবিখ্যাত। লিখছেন আশিস পাঠক

সেই স্মৃতি থেকেই পড়া যায় আর এক রবীন্দ্রনাথকে, যিনি আসন্ন মৃত্যুকে দেখছেন। শেষ রোগশয্যায় দু’-এক জন কাছের মানুষের কাছে তিনি বললেন, ‘‘আমি এ বার বুঝতে পারছি, আমার এ পৃথিবীর দিন ফুরিয়ে এসেছে, এ বার যাবার সময় হয়েছে।’’ সেবাব্রতীরা বললেন, ‘‘কেন এ কথা বলছেন! আপনি ভাল হয়ে উঠবেন।’’ মৃদু হেসে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘‘না রে, বুঝতে পারছি আর দিন নেই।’’

তার পরে মৃদুস্বরে বলতে লাগলেন, ‘‘আমি যেমন কোনও অশোভন কাজ পছন্দ করতাম না, তেমনই নিজেও কখনও করিনি। এ আমার মনের গোপন অভিমানের কথা। অভিমান-অহংকার বিন্দুমাত্র থাকলেও তো তাঁর নিকট যাওয়া যায় না—তাই তিনি নিজের কাছে নেওয়ার আগে আমার জ্ঞাত কি অজ্ঞাত সব অভিমান, সব অহংকার ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছেন।

নিজের দেহকে আমি সর্বক্ষণ যথাসাধ্য আচ্ছাদিত করে রেখেছি। এমন-কি অসুখের ভিতরেও দেহের পরিচ্ছন্নতার তাগাদায় অন্যের স্পর্শে সর্বদেহ সংকুচিত হয়ে উঠেছে।

দুদিন আগেও দেহটা আমার নিজের ভেবে অত্যন্ত সংকোচ বোধ করেছি—কিন্তু কাল থেকে সে কথা মোটেই মনে হচ্ছে না, কাজেই সংকোচবোধও দূর হয়ে গিয়েছে। এর থেকেই মনে হচ্ছে—দিন ফুরিয়ে এল।’’ এর পরের দিনই হয় রবীন্দ্রনাথের অপারেশন। তার অল্প দিন পরেই আসে সেই বাইশে শ্রাবণ।

আনন্দবাজার থেকে নেয়া কিছু অংশ….

LEAVE A REPLY