দুদকের ইকবাল মাহমুদ কি সরে যাচ্ছেন ?

আপডেট: অক্টোবর ২০, ২০১৯
0

এজি-এমপি’র মন্তব্যই সরকারি বক্তব্য: বিশ্লেষকদের অভিমত

বিশেষ সংবাদাদাতা
দুর্নীতি দমনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সরে যাওয়ার আওয়াজ জোরদার হচ্ছে। জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় এমপি তার সরে যাওয়া উচিৎ বলে মন্তব্য করেন। পরপরই তার এ মন্তব্যকে সমর্থন করেনে সরকারের প্রধান আইনজীবীও। তিনি একধাপ এগিয়ে বললেন, দুদক কর্মকর্তারা সবাই সাধু নন। বেসিক ব্যাংক কলেংকারির হোতা শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে আইনের আওতায় আনতে না পারায় দুদকের ভূমিকাকে কটাক্ষ করেন তিনি। মাহবুবে আলম বলেন, র‌্যাব,পুলিশ,এনবিআরসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোও তাকে আইনের আওতায় আনতে পারে। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন- অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেই যদি দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হয় তাহলে দুর্নীতি বিরোধী বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ (দুদক)র যৌক্তিকতা কোথায় ? এটির শীর্ষ কর্মকর্তাদেরই বা ওই পদে বসে থাকার প্রয়োজন কি ?
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরও যুবলীগ নেতা সম্রাট গ্রেফতার হচ্ছে না কেন- ৫ অক্টোবর এ প্রশ্ন তোলেন বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এমপি। তিনি বলেন, তাকে ( সম্রাট ) গ্রেফতার নিয়ে কেন ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাকে বাঁচানোর জন্য কারা পাঁয়তারা করছে,এগুলো আমাদের দেখতে হবে। দুদক প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার তাপস বলেন, যিনি বেসিক ব্যাংককে ডুবিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন তাকে কেন ধরছে না ? এ কথা বলার পরদিনই কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে স¤্রাটকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। বেসিক ব্যাংক কেলেংকারিতে সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে গ্রেফতার না করার সমালোচনা করে তাপস ১৪ অক্টোবর বলেন, দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের চলে যাওয়া উচিৎ। এ মন্তব্যের পরই জনমনে এই ধারণা সৃষ্টি হয় যে, পরদিনই হয়তো দুদক চেয়ারম্যানও হয়তো পদত্যাগ করবেন। তিনি তা করেননি। তিনদিন পর এটর্নিজেনারেল (এজি) মাহবুবে আলমও তাপসের বক্তব্যকে সমর্থন দেন। তারপরও সপদে বহাল রয়েছেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। এ প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা ইনকিলাবের সঙ্গে তার পদত্যাগের বিষয়ে অভিন্ন মত প্রকাশ করেন। সরকারদলীয় এমপি এবং এটর্নি জেনারেলের বক্তব্যকে ‘সরকারের বক্তব্য’ হিসেবেই মনে করছেন বিশ্লেকরা।
দুদক সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ স্বশাসিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব ইকবাল মাহমুদ। ওইদিন দুদক কর্মকর্তা-কর্মচারিদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে বলেন, কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে তার কমিশনের মূল কাজ। দুদককে পরিণত করা হবে জনগণের ‘ট্রাস্টি’ হিসেবে। দুর্নীতিগ্রস্তদের জন্য দুদক হবে আতংকের। নিরীহ মানুষের জন্য হবে ভরসাস্থল। ইকবাল মাহমুদের এ প্রত্যয়ে মানুষ তখন আশ্বস্ত হয়। সেটির কিছু নমুনাও তিনি প্রদর্শন করেন। কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ তুলে শত শত কারণদর্শানোর নোটিস দেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারিদের। কোথাও কোনো চাহিদা না থাকা সত্তে¡ও দুদক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শাস্তিমূলকভাবে প্রেষণে পাঠিয়ে দেন। ছোটখাটো কিছু মামলাও দায়ের করেন। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো নয়-এমন কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানও শুরু করেন। দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ মাধ্যমকর্মীদের প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। তথ্যপ্রাপ্তিতে নানামুখি অন্তরায় সৃষ্টি করেন। কখনো বা ব্যক্তিগত প্রচারণামূলক একমুখি তথ্য প্রচারে সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহারও করেন। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’র প্রধান এজেন্ডা থেকে সরে এসে দুর্নীতি প্রতিরোধের দিকে মনোনিবেশ করেন। প্রতিরোধ কার্যক্রমের নামে (এটি আইনের ৬ নম্বর এজেন্ডা) সভাসেমিনার, বক্তৃতা-বিবৃতি, বৈঠক, সাক্ষাত, চুক্তি স্বাক্ষর, মানববন্ধন, র‌্যালি, সততা স্টোর উদ্বোধন, কর্মকর্তাদের দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ, কখনো বা নিজেই ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকায় নিজেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি নিয়ে সুপারিশ পেশ ইত্যাদি করে কাটিয়ে দেন সাড়ে ৩ বছর। বিভিন্ন ছুতোয় ঘন ঘন বিদেশ সফরের নজিরও স্থাপন করেন তিনি। গণমাধ্যমের হেডলাইন হওয়ার জন্য ফাঁদ মামলায় গ্রেফতার, সেবাদানকারী কিছু প্রতিষ্ঠানে ‘অভিযান’র নামে আকস্মিক পরিদর্শন, কোটি টাকা খরচে ‘১০৬’ নামে হাস্যকর ‘হটলাইন’ চালু, টিভিতে বিজ্ঞাপন, বানোয়াট অভিযোগ দায়ের এবং যাকে খুশি তাকে ধরপাকড়ের মতো স্বেচ্ছাচারমূলক নানা কর্মকান্ডে ব্যস্ত রাখেন কমিশনকে। পক্ষান্তরে বেসিক ব্যাংক কেলেংকারির ৫৬ মামলার তদন্ত পাঠিয়ে দেন হিমাগারে। যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্তে¡ও পানামা পেপার্স কেলেংকারি, জনতা ব্যাংকে ৬ হাজার কোটি টাকার ক্রিসেন্ট গ্রæপ কেলেংকারি, একই ব্যাংকের ‘এম আর গ্রæপ’র আতœসাৎ, পাসপোর্টের ‘ডি-লারু’ কেলেংকারি, স্বাস্থ্য বিভাগে কেনাকাটার নামে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার মূল হোতা মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়া, ডাক বিভাগের সাড়ে ৫শ’ কোটি টাকা প্রকল্পের দুর্নীতির অভিযোগ চেপে যাওয়া, এনআইডি প্রকল্পের দুর্নীতির সঙ্গে যুক্তদের দায়মুক্তি, বড়পুকুরিয়ায় কয়লাখনি দুর্নীতি মামলার আসামিদের গ্রেফতারের প্রশ্নে নির্লিপ্ত রয়েছে কমিশন। দুর্নীতির রাঘববোয়ালদের আড়াল করতেই চুনোপুটিদের পাকড়াও করে সস্তা বাহবা নেয়ার চেষ্টা করেন। এর ফাঁকে দুর্নীতি বিরোধী একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন ‘জাহালম-কান্ড’র অবতারণা করে। ডিআইজি মিজানের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের ঘটনাও ঘটে এই কমিশনের সময়ই।
১০/২০ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণের ঘটনা হাতেনাতে ধরে ‘ফাঁদ মামলা’ দিয়ে দুদকের ‘অর্জন’র ফর্দ দীর্ঘ করে কমিশন। অথচ অবৈধভাবে অর্জিত কোটি কোটি ভারত ও মালয়েশিয়ায় সেকেন্ডহোমে চলে গেলেও কমিশন কিছুই করে না। ক্যাসিনোতে টাকা ওড়ে। সিন্দুকভর্তি হয় কোটি কোটি টাকায়। সেগুলো হাতেনাতে ধরার অভিযানে নামতে দুদক কুণ্ঠিত। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তুলে ক্ষদ্র ব্যবসায়ীকে দুদক হাতকড়া পরালেও বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তোলে না। বর্তমান কমিশনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ থেকেই সম্প্রতি সরকারদলীয় এমপি এমনকি এটর্নি জেনারেলও প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ ব্যক্তির সরে যাওয়া উচিৎ বলে মন্তব্য করেন। তবে ‘ইনকিলাব’র সঙ্গে আলাপচারিতায় অভিন্ন মত দিলেন সুশীল সমাজও।
বেসিক ব্যাংকের বাচ্চুকে আইনের আওতায় না আনা প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড.ইফতেখারুজ্জামান গতকাল শনিবার ‘ইনকিলাব’কে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, সংসদীয় কমিটির রিপোর্টেও বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে। অথচ দুদক বিচারার্থে কোনো প্রকার প্রতিবেদন দাখিল না করেই বলে দিলো বেসিক কেলেংকারিতে বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা নেই। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত না পাঠিয়ে দুদক অগ্রিম সিদ্ধান্ত কি করে নিলো ? কে অপরাধী কে নয়-এটি ঠিক করবেন আদালত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে দুদক নিজেই বিচারের ভারটি নিয়ে নিলো। আদালতেই পাঠালো না।
দুদককে অকার্যকর করে রাখার পেছনে সরকারের সদিচ্ছা এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে দায়ী করা হয়। কিন্তু এখন খোদ সরকারই দুদকের সমালোচনা করছেন। এটর্নিজেনারেল নিজেই (সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা) তাকে চলে যেতে বলছেন। এছাড়া রাজনৈতিক মহল থেকেই তার (ইকবাল মাহমুদ) সরে যাওয়ার দাবি উঠেছে। দুদকের টপমেনেজমেন্টের সদিচ্ছার কারণেই যে বাচ্চুকে ধরা হয়নি-এমনটি বলার ও যৌক্তিক কারণ আছে। বলা হচ্ছিল সরকারি হস্তক্ষেপের কারণেই দুদক তাকে ধরছে না। এখনতো সরকারের পক্ষ থেকেই দুদকের ব্যর্থতার কথা বলা হচ্ছে। এসবের প্রেক্ষাপটে দুদক চেয়ারম্যান কি করবেন এটি তার ব্যাপার। না হলে তাকে অপসারণে সুপ্রিমকোর্টের মতোই কাউন্সিল হতে পারে।
তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম. হাফিজউদ্দিন খান ‘ইনকিলাব’কে বলেন, ইতিপূর্বের কমিশনগুলোও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে অকার্যকর ছিলো। তারাও দুর্নীতির রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পার্থক্য হচ্ছে, বিগত কমিশন বাচ্চুর বিরুদ্ধে অন্তত: ৫৬টি মামলা করেছে। বর্তমান কমিশন সেটির ভিত্তিতে কোনো অ্যাকশনই নেয়নি। তিনি (ইকবাল মাহমুদ) যে ভালো কিছু করেছেন এ কথা বলা যাবে না। মামলা হলেও বেসিক ব্যাংক কেলেংকারির তদন্ত এগোলো না কেন ? কমিশনকে উচিৎ আরো তৎপর হওয়া। না হলে উচিৎ অবিলম্বে পদ থেকে তার সরে যাওয়া।
প্রসঙ্গত: দুদককে পাশকাটিয়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান শুরু করে র‌্যাব-পুলিশসহ সরকারের কয়েকটি সংস্থা। এ ঘটনার তিন সপ্তাহ পর দুদকও ৪৩ জনের তালিকা করে অভিযানে নামার ঘোষণা দেয়।
###

LEAVE A REPLY