নবী (সা:) কেবমুসলিম সভ্যতা ও সস্কিৃতি ৫: মুসলমানদেরই নেতা ছিলেন না রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছিলেন

আপডেট: আগস্ট ১৮, ২০১৭

নিজস্ব প্রতিবেদক:ইসলামের নবী (সা) এর মৌলিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে একটি ছিল মসজিদ নির্মাণ করা। ইসলামী হুকুমাতের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে মসিজদ প্রতিষ্ঠা করতেন তিনি। আসলে এমন একটি প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনা নির্মাণ করার প্রয়োজন পড়েছিল যা একদিকে হবে মুসলমানদের ইবাদাতের স্থান, অপরদিকে হবে রাজনৈতিক, বিচার, প্রশিক্ষণ এমনকি সামরিক দিকসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র। যাই হোক মসজিদের গুরুত্ব এবং এর ভূমিকা নিয়ে আজকের আসরে খানিকটা কথা বলার চেষ্টা করবো।

প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে মসজিদ ছিল নামায পড়া, জ্ঞানার্জন, বিচারকার্য পরিচালনা এবং হুকুমাতের কেন্দ্র।
এছাড়াও মসজিদে বায়তুল মাল, যুদ্ধে প্রাপ্ত গনিমতের মালামাল ইত্যাদি সংরক্ষণ করা হতো। এমনকি যুদ্ধবন্দী এবং কারাবন্দীদেরকেও মসজিদে রাখা হতো। অর্থাৎ সামাজিক এবং রাজনৈতিক সকল কার্য পরিচালনার কেন্দ্র ছিল মসজিদ। এদিক থেকে বিচার করলে বলতেই হবে যে মদিনায় নয়া ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে মসজিদের ভূমিকা ছিল মৌলিক এবং অপরিসীম। মসজিদের ভূমিকা এবং কর্মকাণ্ড সম্পের্ক সম্ভবত বলা যায় সে সময় ইমান এবং জ্ঞানের মধ্যকার গভীরতম যে বন্ধনগুলো গড়ে উঠেছিল তা মসজিদ থেকেই গড়ে উঠেছে। ইসলামের হুকুম-আহকাম, ইসলাম পরিচিতিমূলক বক্তব্য মসজিদে দেওয়া হতো, ইসলামী শিক্ষা এমনকি লেখা এবং পড়ার মতো বিষয়গুলোও মসজিদেই শিক্ষা দেওয়া হতো। পরবর্তীকালে যখন ইসলামী হুকুমাত এবং আদালত বা বিচার বিভাগকে মসজিদ থেকে পৃথক করা হলো তখনো সেগুলো ছিলো মসজিদের প্রতিবেশীসুলভ অর্থাৎ মসজিদ সংলগ্ন রেখেই সেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিলো। সাম্প্রতিক শতাব্দিগুলোতেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শহরের জামে মসজিদের পাশেই গড়ে তোলার প্রচলন ছিলো।

নবী আকরাম (সা) এর অন্যতম মৌলিক একটি দায়িত্ব ছিলো দ্বীনের আকিদা-বিশ্বাসের প্রচার-প্রসার।
সন্দেহাতীতভাবে তার জন্যে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং সামরিক ও বিচার বিভাগীয় কাঠামোর প্রয়োজন ছিলো। এই কাজগুলো বা গুরুদায়িত্বগুলো সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দেওয়ার জন্যে নবীজী সুযোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছিলেন। এদের অনেকেই যাকাত এবং সদকা সঞ্চয়ের কাজে নিয়োজিত ছিলেন, অনেকেই আবার সামজিক দায়িত্বগুলো পালন করতেন। মদিনার সরকারের প্রশাসনিক বিভাগ ছিল খুবই সাদামাটা তবে সামগ্রিক এবং পূর্ণাঙ্গ। অনেকেই আবার ভিন্ন ভিন্ন আরো কিছু দায়িত্বে নিয়েঅজিত ছিলেন, যেমনঃ চুক্তিপত্র সম্পাদনের কাজ, সম্মতি পত্র লেখালেখি এবং সংরক্ষণের কাজ, আয়কর হিসাব এবং আদায়ের কাজ, যুদ্ধে প্রাপ্ত গনিমতের হিসাব নিকাশের কাজ এমনকি কেউ কেউ কোরআনের আয়াত লেখালেখির কাজেও নিয়োজিত ছিলেন।

পানির উৎসগুলো এবং ভূমিগুলো যা বিভিন্ন ব্যক্তি এবং গোত্রকে দেওয়া হতো সেগুলোর তালিকা তৈরি করা এবং তাদের জন্যে ভূমির মালিকানা স্বত্ত বা দলিল লেখার দায়িত্বও কারো কারো ওপর দিয়েছিলেন। আরবদের মাঝে এটা ছিলো একেবারেই নতুন একটি রীতি। কেননা আরবদের মাঝে আবহমান মতানৈক্য ও দ্বন্দ্বের অন্যতম একটি কারণ ছিলো ভূমি, পুকুর এবং জলাশয়ের মালিকানা নিয়ে। নবীজী সেইসব প্রাচীন দ্বন্দ্ব সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিলেন তা ছিলো এক কথায় ঐতিহাসিক এক পদক্ষেপ।পয়গাম্বর (সা) ইহুদি খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন গোত্রের সাথে চুক্তি বা সন্ধিপত্র করেছিলেন। এইসব চুক্তিপত্রের কথা স্থান কাল পাত্রভেদে এবং মুসলমানদের শক্তিমত্তার অবস্থাভেদে বিভিন্ন রকম ছিলো। কখনো কখনো চুক্তিপত্রের অবস্থা বা পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন।উদাহরণস্বরূপ হুদাইবিয়ার সন্ধির কথা বলা যায়। হুদাইবিয়ার সন্ধিটি হয়েছিলো মক্কার মুশরিকদের সাথে।

ঐ চুক্তিতে মুশরিকদের দেওয়া শর্তগুলো মেনে নেওয়ায় মুসলমানদের অনেকেই অবাক হয়েছিলেন, এমনকি কেউ কেউ বিরক্তও হয়েছিলেন।

সে কারণে মুসলমানদের কেউ কেউ ঐ চুক্তির ব্যাপারে আপত্তি পর্যন্ত করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে নবীজীর জীবনকালে কূটনৈতিক দূরদর্শিতা এবং প্রজ্ঞার অন্যতম প্রধান ও সফল একটি উদাহরণ ছিলো এই হুদাইবিয়ার সন্ধি। এই চুক্তির ফলে মদিনার নয়া সরকার যেমন দৃঢ়তা ও মজবুতি পেয়েছিলো সেইসাথে নবীজীর লক্ষ্য এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়নও সহজতর হয়েছিলো।

রাষ্ট্রীয় এইসব কাজের পাশাপাশি রাসূলে খোদা (সা) বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ, প্রতিবেশী সরকারসহ বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাহদেরকে চিঠি লিখেছিলেন। তখনকার দিনে ইরানের বাদশাহ, রোমান সম্রাট, মিশরের সুলতান, ইয়েমেনের শাসক, ইথিওপিয়ার বাদশাসহ আরো অনেক বাদশাকেই চিঠি লিখেছিলেন রাসূলে খোদা (সা)। এইসব চিঠির মূল বিষয় ছিলো পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করা এবং এক আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেওয়া তথা তৌহিদের দাওয়াত প্রদান। ইতিহাসবিদ এবং লেখকদের অনেকেরই মতে এইসব চিঠি ছিলো নবীজীর পররাষ্ট্রনীতিরই অংশ। নবীজী এই দাওয়াতকে এবং কূটনীতিকে যুদ্ধ এবং সহিংসতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর সাহাবিরা যদি কাউকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার আগে আটক করতেন তাহলে নবীজী তাদেরকে মুক্ত করে দিতেন।
নবীজীর পরবর্তী পদক্ষেপ ছিলো ইসলামের পরিধি বিস্তার করা এবং মুসলমানদের সীমান্তে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আরব্য উপদ্বীপের রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরেও বিশ্বব্যাপী ইসলামের দাওয়াত পৌছেঁ গিয়েছিলো। মার্কিন ইতিহাসবিদ বিল ডুরান্ট ইসলামী শাসন ব্যবস্থার সাংগঠনিক কাঠামোয় নবীজীর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শী ভূমিকার কথা স্বীকার করে বলেছেন, সই সময় নবীজী কেবল মুসলমানদেরই নেতা ছিলেন না বরং মদীনা শহরের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ঐ শহরের বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।ইরানের বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক আব্দুল হাসান যাররিন কুব বলেছেনঃ ‘বিশেষ করে মদিনায় ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিশেষত কেবলা পরিবর্তনের পর থেকে রমযান মাসের রোযা পালন, নামায এবং যাকাতে ফেতরার মতো বিধানগুলোর ব্যাপারে কোরআনের আয়াত নাযিল হয়। এইভাবে এই বিধানগুলো বিধিবদ্ধ হয়।’

যাররিন কুবের মতে, ইসলামের আরো কিছু বিধান আরবদের জীবন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছিলো এবং তাদের মাঝে দ্বন্দ-সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলো। এসব বিধানের মধ্যে রয়েছেঃ কেসাস, দিয়া বা রক্তমূল্য, জেহাদ, গনিমত বণ্টন, উত্তরাধিকারের বিধান, মদ হারামের ঘোষণা, হজ্জ্বের বিধান ইত্যাদি। তবে সবকিছুর দায়িত্ব নবীজীর ওপর থাকলেও তিনি তাঁর সাহাবিদের সাথে সবসময় পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করতেন।

বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোর ব্যাপারে তিনি কৌশল নির্ধারণের জন্যে একটি সামরিক পরিষদ গঠন করতেন এবং সবার মতামত চাইতেন। ওহুদের যুদ্ধে তিনি ভিন্ন মত পোষণ করা সত্ত্বেও সাহাবিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতকেই গ্রহণ করেছিলেন। এভাবেব বিভিন্ন দেশ জয় করার মধ্য দিয়ে মুসলমানরা বিভিন্ন সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হন। ইসলামের সাথে যেসব সংস্কৃতি সাংঘর্ষিক ছিল না,সেগুলোকে ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এসবের ভূমিকা অনস্বীকার্য।