নারায়ণগঞ্জে বেড়েই চলছে ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ : নারায়ণগঞ্জে দিন দিন ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলছে। বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ডেন্টাল ক্লিনিকগুলোতে ভুয়া ডাক্তারের ছড়াছড়ি। চিকিৎসক হওয়ার সনদ না থাকলেও অনেকেই নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। ওই সকল ভুয়া চিকিৎসকদের খপ্পড়ে পড়ে অনেক রোগীর জীবন হয়ে উঠছে শঙ্কটাপন্ন।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলী এলাকার এম হোসেন জেনারেল হসপিটাল নামের হাসপাতালে নিজেকে অভিজ্ঞ ডাক্তার পরিচয় দিয়ে ফাহমিদা আলম দিনে পর দিন প্রতারণা করে আসছিলেন রোগীদের সঙ্গে।

প্রেসক্রিপশনে তার নামের পাশে পদবীর ডিগ্রী হিসেবে লেখা থাকতো এমবিবিএস, এফসিপিএস। তবে শেষতক রযাবের অভিযানে ধরা পড়েন ভুয়া ডাক্তার ফাহমিদা আলম। ওই সময়েও নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিলেও দেখাতে পারেনি কোন সনদ। সেই সঙ্গে তিনি যে হাসপাতালে বসতেন সেই হাসপাতালেরও প্রয়োজনীয় নথি নেই। র‌্যাবের অভিযানে ওই ভূয়া ডাক্তারের ৬ মাসের জেল ও হাসপাতালটি সীলগালা করে দেয়া হয়। ৫ ফেব্রুয়ারী রাত ১১ টায় চলে র‌্যাব-১১ এর অভিযান। এর নেতৃত্বে ছিলেন র‌্যাব-১১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসিমউদ্দিন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুল ইসলাম।
এর আগে ২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় দুই ভুয়া চিকিৎসককে পৃথক মেয়াদে সাজা দেয় ভ্রাম্যমান আদালত। বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মৌসুমী হাবিব এ দন্ড দেন। এর আগের দিন রাতে বন্দরের শাহী মসজিদ এলাকাবাসী ওই ২ ভূয়া ডাক্তারকে আটকে পুলিশে সোপর্দ করে। দন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে হবিগঞ্জের বড় গ্রামের জয়নাল আবেদীনের ছেলে রুহুল আমিনকে (৩৫) ১৫ দিন ও সিরাজগঞ্জের কোরবান আলীর ছেলে কামাল হোসেনকে (৪২) এক মাসের কারাদন্ড দেন ভ্রাম্যমান আদালত।
২০১৬ সালের ১০ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে অবস্থিত ন্যাশনাল মেডিক্যাল সেন্টারে র‌্যাবের অভিযানে ভুয়া ডাক্তার গৌরি চাঁদ পন্ডিত ওরফে সুবিরকে (৪০) গ্রেফতারের পর ভ্রাম্যমান আদালতের ২ বছরের কারাদন্ড দেয়। একই সঙ্গে আরো ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। দন্ডপ্রাপ্ত ভূয়া ডাক্তার গৌরি চাঁদ পন্ডীত ওরফে সুবিপর কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী এলাকার সতেন্দ্র পন্ডীতের ছেলে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও নারায়ণগঞ্জ সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাসুম আলী বেগের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ওই সাজা দেয়া হয়। এসময় ন্যাশনাল মেডিক্যাল সেন্টারের পরিচালক মো. কামাল হোসেন (৪৫) ও ম্যানেজার শুকলা সাহাকে (৫২) ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ভুয়া চিকিৎসক পরিচয়ে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার পাশাপাশি বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকেও কমিশন হাতিয়ে নিয়ে সে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গিয়েছিল।
২০১৬ সালের ৮ জুন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল চৌধুরীবাড়ী বাসস্ট্যান্ডস্থ জনস্বাস্থ্য জেনারেল হাসপাতালে মোবারক ইসলাম নামের এক ভুয়া ডাক্তারকে দুই বছরের কারাদন্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় ভুয়া ডাক্তার মোবারক ইসলামের অফিসে তল্লাশী চালিয়ে বিপুল পরিমানের বাংলাদেশ, ভারত ও চায়নার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সার্টিফিকেট ও সার্টিফিকেট তৈরীর সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এসময় জনস্বাস্থ্য জেনারেল হাসপাতালটিকে সিলগালা করে দেয় ভ্রাম্যমান আদালত।
২০১৫ সালের ২০ মে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরে একটি অনুমোদনহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে সীলগালা ও এর একজন ভুয়া ডাক্তারকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড সঙ্গে আরো ৫ হাজার টাকা দন্ড করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ র‌্যাব-১১ এর একটি টিম এ অভিযান চালায়। অভিযানে বিচারকের দায়িত্ব পালন করে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ফতুল্লা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকির হোসেন।
এদিকে স্কুলের গন্ডি না পেরুলেও দিব্যি সাইনবোর্ডে চিকিৎসক উপাধি লিখে ৩ বছর ধরে রোগীদের চিকিৎসার নামে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল মাহফুজ চৌধুরী। গত ৮ এপ্রিল হাতেনাতে সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল চৌধুরী বাড়িস্থ সুলতান সুপার মার্কেটে চৌধুরী ডেন্টাল কেয়ার নামের একটি ভুয়া দন্ত চিকিৎসালয় থেকে ৮ম শ্রেনী পাশ করা মাহফুজকে আটক করে ২ মাসের কারাদন্ড দিয়েছে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুমানা ইয়াসমিনের নেতৃত্বাধীন ভ্রাম্যমান আদালত। মাহফুজের ন্যায় ভুয়া দন্ত চিকিৎসকের ছড়াছড়ি নারায়ণগঞ্জ শহরের সর্বত্রই। শুধুমাত্র নারায়ণগঞ্জ শহরের কালিরবাজারেই অন্তত ৩০ জন রয়েছে যাদের নেই সরকার অনুমোদিত ব্যাচেলর অব ডেন্টাল সার্জারীর (বিডিএস) সার্টিফিকেট। অথচ তারা দিব্যি চিকিৎসক পরিচয় দিচ্ছেন। এছাড়া বেশ কয়েকজন টেকনোলজিষ্টও নিজেদের ডাক্তার পরিচয় দিচ্ছেন। এছাড়া শহরের বাহিরেও রয়েছে এ ধরনের বহু ভুয়া দন্ত চিকিৎসক।
শহরের কালিরবাজারের অন্তত ৩০ জন রয়েছেন যারা বিডিএস সার্টিফিকেট ছাড়াই নিজেদের ডেন্টাল ডাক্তার পরিচয় দিচ্ছেন। চাষাঢ়ায় মিজানুর রহমানের ডাক্তারী পাশের কোন সার্টিফিকেট না থাকলেও ডাক্তার পরিচয়ে দিব্যি চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই অবস্থা হাবিব ডেন্টালের হাবিবের। নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের দন্ড বিভাগের টেকনোলজিষ্ট মোঃ আক্তারুজ্জামান শহরের খানপুর এলাকায় আলভী ডেন্টাল কেয়ারে নিজেকে ডাক্তার পরিচয়ে সাইনবোর্ড সাটিয়েছেন। আর এসকল ভুয়া ডাক্তারের অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে শত শত রোগী। এদেরকে আবার ডাক্তারী ভাষা কোয়াক বলেও উল্লেখ করা হয়।