নারায়ণগঞ্জ পুলিশ প্রশাসন আতংকে

আপডেট: মার্চ ৯, ২০১৯

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ : নারায়ণগঞ্জে দুইটি প্রভাবশালী থানার ওসি দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার হওয়ায় পুলিশ প্রশাসনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি এই আতঙ্কে রয়েছে দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ অফিসারগন। যারা বিভিন্ন অপকর্ম করে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। কাউকে তোয়াক্কা না করেই হুমকি ধমকি দিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করেছেন। যাদের দাপটে থানার অন্যান্য পুলিশ সদস্য তটস্থ হয়ে থাকতেন। যারা বিভিন্ন বড় ভাই, বড় অফিসারের নাম বিক্রি করে বড় বড় সুবিধা ভোগ করতেন তারাই রয়েছেন অভিযোগের আতঙ্কে। তবে এর বাইরের পুলিশরা আতঙ্কে থাকলেও এমন অভিযোগের জন্য নয়, রয়েছেন সামনের দিন গুলোর জন্য।
হারুন অর রশিদ জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে নারায়ণগঞ্জে যোগদান করার পর থেকেই পুলিশের অপরাধের লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করছেন। কোনো কোনোটায় সফল হয়েছেন। ডিবির টিম নিয়ে সারা দেশেই আলোচনা হয়েছে। তাদের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে আদালত থেকে। তারপরও ডিবি নিয়ে আতঙ্ক কাটেনি নারায়ণগঞ্জে। সেই ডিবির টিম বর্তমান পুলিশ সুপার বন্ধ করে দিয়েছেন।
বন্ধ করার কারণ বলতে গিয়ে তিনি ডিবির অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে এক সময়ে ডিবির অপতৎপরতা ছিল। বিভিন্ন থানায় থানায় সিভিল টিমের অপতৎপরতা ছিল। আমরা ডিবির কার্যক্রম সীমিত করেছি, প্রত্যেক থানায় সিভিল টিম বন্ধ করেছি। কারণ আমাদের কাছে খবর ছিল তারা নাকি সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতো।
এমনি করে ভেতরের অনেক বিষয়ে তিনি পরিবর্তন এনেছেন এবং আনছেন। গত কয়েদিনে তার বক্তব্যে সেরকম অনেক ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি অপরাধীদের বড় ভাইয়ের বিষয়ে কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এক বক্তব্যে তিনি বলেছেন, কোন ভূমিদস্যু কোন মাদক ব্যবসায়ী পর্দার অন্তরালে অপতৎপরতা চালাবেন আর বড় ভাইয়ের পরিচয় দিবেন এটা হবে না। আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নিব এবং সেই কাজ আমাদের চলছে।
তার এই কথার পরেই অনেক ঘটনা ঘটেছে। সেই ঘটনার মধ্যে রয়েছেন দুইজন ওসিকে প্রত্যাহার। মাদক দ্রব্য ইয়াবার কেলেংকারীতে নারায়ণগঞ্জ সদর ওসি কামরুল ইসলামকে এবং পরদিন ঘুষ কেলেঙ্কারির গাড়ি আত্মসাতের অভিযোগে রূপগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল হককে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর আগে থানার ওসিদের বিরুদ্ধে এমন কোন ঘটনার নজির নারায়ণগঞ্জে পাওয়া যায়নি।
একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান বলেছেন, আমরা পুলিশ কিংবা কারও উপর ডিপেন্ড করতে চাই না। আমরা সবই বুঝি। কেউ পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে প্রেফতার করবে, সেটা হবে না। জনগণ ভয় পাবেন না। আমরা সেদিন মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, ঘুষখোর ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবো।
আরেক স্টেপ এগিয়ে তিনি বলেন, আমি ধান্দা করতে আসি নাই। কেউ কেউ খাল কেটে কুমির আনবেন না। কেউ পুলিশ ভিত্তিক ফতুল্লা থানা ভিত্তিক আওয়ামীলীগ করবেন না। করলেও কোন লাভ হবে না। আল্টিমেটলি আমার হাত না থাকলে আপনি থাকতে পারবেন না।
শামীম ওসমান আরো বলেছেন, সরকার দ্বারা দল চলবে না। দলের দ্বারা সরকারকে পরিচয় দিতে হবে। আমাদের একজন কর্মীর গায়ে আঁচড় দিলে সবার গায়ে আঁচড় লাগবে। আমরা কারও উপর ভরসা করে রাজনীতি করি না। একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করে রাজনীতি করি।
একদিকে পুলিশ সুপারের বক্তব্য অন্যদিকে প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের বক্তব্যে অনেকটাই আতঙ্ক বাড়িয়েছে। তার উপর দুইজন ওসির প্রত্যাহার। এসব কারণে পুলিশ সদস্যরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তারা রীতিমত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
পুলিশ মেমোরিয়াল ডে উপলক্ষ্যে ১ মার্চ বেলা ১১ টায় চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেছেন, আপনারা নিজেরা কোন অপরাধ করবেন না, মানুষকে কোন হয়রানি করবেন না এবং বিভিন্ন ধরনের অপতৎপরতা আপনারা করবেন না। আমরা কাউকেই ছাড় দেই নাই। ইতোমধ্যে আমরা কনস্টেবল, এসআই এবং ওসিকেও আমরা ক্লোজড করেছি।
এর ঠিক একদিন পরই ঘুষ কেলেঙ্কারির গাড়ি আত্মসাতের অভিযোগে রূপগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল হককে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা দায়েরের পর এই ঘটনা ঘটেছে। এর আগে থানার ওসিদের বিরুদ্ধে এমন কোন ঘটনার নজির নারায়ণগঞ্জে পাওয়া যায় না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারী ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলায় ওসি আব্দুল হকের বিরুদ্ধে জব্দকৃত গাড়িটি ছাড়াতে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি এবং তার মামা শ্বশুরের নেতৃত্বে ভুয়া মালিকানার কাগজপত্র দেখিয়ে গাড়িটি আত্মসাতের অভিযোগ করেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে প্রত্যাহার করা হয়।
তার একদিন আগে নারায়ণগঞ্জের সদর থানার ওসি কামরুল ইসলামকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠায় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি ও নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। ৪ মার্চ হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত বে এই আদেশ দেন।
আদেশে একইসঙ্গে এক মাসের মধ্যে এ মামলার তদন্ত শেষ করতে তদন্ত কর্মকর্তাকে (আইও) নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সহকারি অ্যাটর্নি জেনারেল ইউসুফ মাহমুদ মোর্শেদ।

এম আর কামাল