নিরাপদ, নারী বান্ধব ঢাকার গড়তে সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলরদের জন্য ৪৫ সুপারিশ মহিলা পরিষদের

আপডেট: জানুয়ারি ১২, ২০২০
0

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, নারী -পুরুষের সমতা ভিত্তিক মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবৎ বহুমাত্রিক প্রক্রিয়ায় কাজ করে যাচ্ছে। দেশ গঠনে সর্বস্তরে নারীদের সম্পৃক্ত করা, রাজনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর সক্রিয়তা বৃদ্ধি, এক কথায় নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তৃণমূল থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত সর্বস্তরেই নারীর সমঅধিকার ও সমঅংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠার জন্য মহিলা পরিষদ ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিফলন ঘটে নির্বাচনী ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই। এই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, সব মানুষের( অনুমোদিত সকল রাজনৈতিক দল, নারী- পুরুষ, শ্রেণী- পেশা, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে) অংশগ্রহণের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সময়মতো, সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয় সেজন্য দেশের নারী সমাজ সর্বদা সজাগ। আর এই অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নারীসমাজ দীর্ঘকাল ধরে সংগ্রামী ভূমিকা রেখে আসছে। আগামী ৩০ জানুয়ারি ২০২০ ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (উত্তর ও দক্ষিণ) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ।

শক্তিশালী, কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দেশে গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম মূল ভিত্তি। এই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনয়নের মাধ্যমে প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় জাতীয় নির্বাচনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন। পাশাপাশি স্থানীয় সমস্যার সমাধান, উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ। স্থানীয় সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সিটি কর্পোরেশন। মূলতঃ জনগণের প্রদেয় করে পরিচালিত সিটিকর্পোরেশন একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। সিটিকর্পোরেশনে বসবাসকারী ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, নারী- পুরুষ নির্বিশেষে সকল জনগণের নাগরিক সুবিধা সিটি কর্পোরেশনকেই নিশ্চিত করতে হবে। তাই নারী সমাজ মনে করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, সকল নাগরিকের নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য এই সিটিকর্পোরেশন নির্বাচন অত্যন্ত আকাঙ্খিত এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এইজন্য নির্বাচন কমিশনের যেমন স্বাধীন, নিরপেক্ষ,শক্তিশালী ভূমিকা অপরিহার্য তেমনি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী এবং সাধারণ জনগণ, রাজনৈতিক দল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা শহরে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ যা বিশ্বের জনবহুল শহরের মধ্যে ১১তম (তথ্য সূত্র: জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টের) এবং বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ নগর। এই শহরে বিভিন্ন শ্রেণী- পেশা, নারী- পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ, ধনী, মধ্যবিত্ত, দরিদ্র, প্রান্তিক, প্রতিবন্ধী, ভাসমান মানুষের বাস। কিন্তু বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা,অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে এই বিপুল জনসংখ্যা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে।
সিটি কর্পোরেশনের অপরিকল্পিত এবং সমন্বয়হীন কাজের কারণে নাগরিকদের নানা দূর্ভোগের সম্মূখীন হতে হচ্ছে। মানুষের বহু কাঙ্খিত এক মেগা প্রকল্পের নাম মেট্রোরেল। আমরা সকলেই জানি যে মেট্রোরেল চালু হলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষ একদিকে যেমন যানজট থেকে রক্ষা পাবে অন্যদিকে বাাঁচবে তাদের সময়। তবে বর্তমানে ঢাকা মহানগরীর এক বিশাল এলাকা জুড়ে মেট্রো রেল তৈরীর কাজ চলায় চলাচলের রাস্তা সরু হয়ে গেছে, বিকল্প কোন রাস্তা না থাকায় এইা সরু রাস্তা দিয়েই যানবাহন ধীরগতিতে চলে।যেহেতু এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প কাজেই জনস্বাচ্ছন্দ্য, জননিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া দরকার ছিল। প্রতিদিন এই অসুবিধা এবং ঝুঁকি নিয়েই পথ চলতে হয় শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী, অফিসযাত্রী, রোগী ও প্রসূতি সহ সাধারণ মানুষদের। এছাড়াও ডেসা, ওয়াসা, তিতাস গ্যাস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ( বিশেষ করে বর্ষাকালে) এবং যথাসময়ে রাস্তার মেরামতের কাজ শেষ না করায় একদিকে যেমন বহুবিধ দুর্ঘটনার সম্মূখিন হতে হয় নারী- শিশু সহ সকল পথচারীকে, অন্যদিকে সরকারী অনেক অর্থের এবং সম্পদের অপচয় ঘটে।
বর্ষাকালে প্রতিবছরই ঢাকা মহানগরীর অনেক রাস্তা জলাবদ্ধ থাকে। কখনও কখন রাস্তার কোথাও কোথাও ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা থাকে। এর ফলে ঘটে অনেক দুর্ঘটনা। গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং সুপেয় পানির সরবরাহের অপ্রতুলতা ছাড়াও দুষিত, দূর্গন্ধ, ময়লাযুক্ত ওয়াসার পানির কারণে, রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় ময়লা রাখার কারণে, পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট না থাকার কারণে সাধারণ নাগরিকের স্বাস্থ্য ঝুঁকি আজ অনেক বেশী। এ কারণে অনেক সময় প্রাণহানিরও ঘটনা ঘটে।
পরিবহনের ক্ষেত্রে দেখা যায় পুরোনো বা ফিটনেসহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল, লাইসেন্স না থাকা চালকের গাড়ি চালানোর জন্য, প্রতিযোগিতায় গাড়ি চালানো এবং সঠিকভাবে ট্রাফিক আইন মেনে না চলা এবং বাস মালিকদের আইনের প্রতি ঔদাসীন্য এবং জবাবদিহীতা না থাকায় প্রায়শঃই বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে, মৃত্যু হয় নারী, শিশু, শিক্ষার্থীসহ বহুমানুষের। সম্প্রতি সময়ে যা লাগামহীন ভাবে বেড়ে চলেছে বিভিন্ন আ্যাপস ভিত্তিক যেসব পরিবহন জনসাধারণের নাগরিক সেবার জন্য রাস্তায় নেমেছে , সেখানে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোন রকম মনিটরিং না থাকায় দিন দিন ভাড়ার উচ্চমূল্যের কারণে গণমানুষ সেই সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি এইসব অ্যাপস ভিত্তিক যান বাহনগুলো সঠিক নীতিমালাও মেনে চলেনা। ফলে দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত হয় অনেক মানুষ, স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় তারমধ্যে অনেককে। অসহনীয় ট্রাফিক জ্যামের কারণে জনগণ বিশেষ করে কর্মজীবী, শ্রমজীবী, শিক্ষার্থী, অসুস্থ রোগীদের দূর্দশার শেষ থাকেনা। সাধারণ জনগণের বহু কর্মঘন্টা পথে নষ্ট হয়। যা সামগ্রিকভাবে ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন ছাড়াও জাতীয় অর্থনীতিতে বিরুপ প্রভাব ফেলে।
ঢাকা শহরে অবৈধ দখলদারদের কবলে অধিকাংশ ফুটপাত। যার ফলে নগরবাসীকে হাঁটা চলাফেরায় অসুবিধা ও মারাত্মক ঝুঁকির সম্মূখীন হতে হয়, সবচেয়ে বেশী অসুবিধার সম্মুখিন হতে হয় নারীদের।
চারপাশের নদী, লেক, জলাশয়গুলো ভূমিদস্যুরা দখল করে, ভরাট করছে, এমনকি স্থাপনা পর্যন্ত তৈরী করছে। অপরিকল্গিত, অনুমোদনহীন ভাবে গড়ে উঠছে অনেক বহুতল ভবন। ফলে বর্ষাকালে জলবদ্ধতা তৈরী হয়। পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে অল্প বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় অনেক এলাকা। সুয়ারেজের ময়লাযুক্ত পানির লাইনের সাথে খাবারের পানির পাইপের লাইন এক হয়ে যায়। ফলে অনেক এলাকায় মানুষ দুষিত, দূর্গন্ধযুক্ত পানি পান করতে বাধ্য হয় এবং পেটের পীড়া সহ বিভিন্ন রোগের শিকার হয়। ভবন তৈরীর সময় যেমন অনেক ক্ষেত্রেই রাজউক অনুমোদিত নক্শা এবং বিল্ডিং কোড যথাযথ অনুসরণ করা হয় না পাশাপাশি পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের (আবাসিক এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও) যথাযথ নীতিও অনুসরণ করা হয়না। এরফলে পরিবেশগত ভারসাম্য চরমভাবে বিনষ্ট হচ্ছে। আর এজন্য ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকতে হয় নগরবাসীকে। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে গত বছর এই ঢাকা মহানগরীতেই শুধু অগ্নিকান্ডে নিহত হয়েছেন প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ( নিমতলী, এফ আর টাওয়ার)।
বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে যাচেছ, তখন এ দেশের রাজধানীবাসীর জন্য ‘মশা’ হচ্ছে সবচেয়ে স্বাস্থ্যঝঁুিকর বড় কারণ। সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সাধারণ জনগনের নাগরিক অধিকার রক্ষায় জবাবদিহীতা ও দায়বদ্ধতা না থাকা, রাজনৈতিক তোষামোদী এবং সর্বোপরি দূর্নীতির কারণে ২০১৯ সালে মশার মাধ্যমে বিস্তারলাভ করা ডেঙ্গু ও চিকোনগুনিয়া প্রায় মহামারীর রূপ ধারন করেছিল।
বর্তমানে ঢাকায় কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকার পরিমান ৮২ শতাংশ এবং জলাভূমির পরিমান ৪.৩৮শতাংশ, যেখানে একটি শহরের কমপক্ষে ১০-১৫ শতাংশ জলাশয় এবং ১৫-২০ শতাংশ এলাকা সবুজে আচ্ছাদিত থাকা প্রয়োজন। রাস্তা বর্ধিত করার জন্য, নতুন বাড়ি ঘর করার জন্য যেসব গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে তার পরিবর্তে নতুন বৃক্ষরোপন ঢাকা মহানগরীতে চোখে পড়ে কম। একটি শহরের মোট ২০-২৫ শতাংশ রাস্তা থাকার কথা থাকলেও এই মহানগরীতে আছে প্রায় ৭-৮ শতাংশ রাস্তা তার মধ্যে ৩০ শতাংশই গাড়ি পার্কিং বা অবৈধ দখলদারদের দখলে ফলে ঢাকাকে বলা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর।
ঢাকা শহরে মোট নারী জনসংখ্যা প্রায় ৮৫ লক্ষ। রাজধানীতে নিরাপদ, সঠিক পরিবেশ না থাকার কারণে সকল বয়সের নারীই প্রায় প্রতিদিনই নানাভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে। প্রতিদিনই ভয়াবহ নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘরে, বাইরে, কর্মস্থলে, শিক্ষাঙ্গনে, গণপরিবহনে ঘটে চলেছে। যার কিছু পত্রিকায় আসে, কিছু আসেনা। ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহনে ঘটছে প্রতিদিনই যৌনউত্যক্তকরণের ঘটনা। নারী আন্দোলন এবং সরকারী- বেসরকারী উদ্যোগে এই সহিংসতা প্রতিরোধে এই মহানগরী সহ দেশব্যাপী বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সকল বয়সের নারী ও কন্যা সিরাপত্তাহীনতায় বাস করছে, যা তাদের সামগ্রিক জীবনযাত্রা ও উন্নন সক্ষমতাকে ব্যাহত করছে। স্কুল কলেজের তরুণী, কিশোরীদের উত্যক্তকরণ, ক্রমবর্ধমান সহিংস আচরণ, সন্ত্রাসী তৎপরতা, সাইবার ক্রাইম এ শহরের নারী ও কন্যা শিশুর জীবনকে নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে। নারীর কর্মস্থলে যথাসময়ে পৌঁছনোর জন্য নেই চাহিদা অনুযায়ী নিরাপদ যথাযথ যানবাহন, নেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা। অধিকাংশ বাস সিটিং গেট লক হওয়ার কারণে বিভিন্ন নির্ধারিত বাস স্ট্যান্ড থেকে নারী ও শিশু বাসে উঠতে না পেরে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করা, লোকাল বাসে ‘মহিলা সিট নাই’ বলে নারীদের বাসে উঠতে না দেয়া এখন এই মহানগরীর একটি সাধারণ চিত্র। রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, মার্কেট, কাঁচাবাজার কোনটিই নারী বান্ধব নয়। রাস্তায় আলোর অপ্রতুলতার সুযোগে এক শ্রেণীর মাদকসেবী, চোর, ছিনতাইকারী অসৎ ব্যক্তিরা ছিনতাই, চুরি, নারী নির্যাতন সহ বিভিন্ন ধরণের অবৈধ কর্ম চালায় যা নারীসহ সকল নাগরিকের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে। বিভিন্ন প্রয়োজনে ঢাকা মহানগরীর বাইরে থেকে আগত অনেক নারী, শিক্ষার্থী, কর্মজীবীদের আবাসিক হোটেলে অবস্থান করতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ হোটেলের পরিবেশই নারীর জন্য নিরাপদ এবং নারী বান্ধব নয়। কর্মজীবী মায়েদের কর্মসহায়তার জন্য নেই প্রয়োজনীয় ডে কেয়ার সেন্টার, নিরাপদ আবাসন।
ভরাট হয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ। বিলুপ্ত হচ্ছে এলাকা ভিত্তিক ক্লাব ও পাঠাগার। শিশু ও তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদন এবং সংস্কৃতি কর্মকান্ডের অভাব। এলাকা ভিত্তিক যে নামমাত্র ক্লাব আছে সেখানেও সুস্থ শিক্ষা ও বিনোদনের বদলে চলে জুয়া বা অসামাজিক কাজ। অবাধ মাদক ব্যবসার প্রসারের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এদেশের তরুণ সম্প্রদায়।
আমরা জানি, এই ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ২ টি মেয়র পদে, ১১১টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে এবং ৩৭টি সংরক্ষিত আসনে নারী কাউন্সিলর পদে নির্বাচন হবে।
গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র পরিচালনায় ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর সমান অংশগ্রহণ । সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলরগণকে ৩টি ওয়ার্ড নিয়ে (বিশাল পরিসরে) কাজ করতে হয়। কিন্তু আমাদের বিগত দিনের অভিজ্ঞতা বলে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত সংরক্ষিত আসনের নারী জনপ্রতিনিধিগণ সিটি কর্পোরেশনে যথাযথ সুযোগ ও পরিবেশ ও অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ার কারণে তাঁরা নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরের নির্বাচিত নারী সহ সকল জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি করে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর সমঅংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দীর্ঘ দিন যাবত দাবি জানিয়ে আসছে।
তাই একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল, জনকল্যানমুখী, নিরাপদ, নারীবান্ধব সিটি কর্পোরেশনের লক্ষ্যে আমাদের দাবি:

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের নিম্নলিখিত সুপারিশগুলোর আলোকে নির্বাচনী প্রতিশ্রতি থাকা দরকার:
১. জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করতে হবে।
২. সিটি কর্পোরেশনের সিটিজেন চার্টার জনগণকে অবহিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের পরিবেশ রক্ষা, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা সহ পথচারী বান্ধব এলাকার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। নির্বিঘ্নে ফুটপাত ও ফুট ওভার ব্রীজে পথচারীদের চলাচলের জন্য অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করতে হবে।
৪. ঢাকা মহানগরকে যানজটমুক্ত শহর করার লক্ষ্যে বাস, রিকসা স্ট্যান্ড ইত্যাদি পরিকল্পিতভাবে তৈরী ও ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ গণপরিবহনের শুধু সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, নারী, শিশু সহ সকল জনগণের জন্য এই গণপরিবহনের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে জনগণের জন্য নিরাপদ , যানযটমুক্ত রাস্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. ঢাকাকে একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ প্রস্তুত, বৃক্ষরোপণ করে সবুজায়ন এর ব্যবস্থা রাখতে হবে। জলাশয়গুলো পরিস্কার ও দখলমুক্ত করতে হবে।
৬. পরিস্কার পরিচ্ছন্ন শহর করার লক্ষ্যে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা( রিসাইক্লিং সিস্টিম) চালু করতে হবে। পর্যাপ্ত ঢাকনাসহ ডাষ্টবিনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এই বর্জ্য পরিবহনের জন্য ঢাকনা সহ গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কর্র্মী সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। রাস্তায় ময়লা আবর্জনা স্তুপাকার করে রাখার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
৭. মশা নিধনে বিশেষ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।
৮. শহরের বিনোদন কেন্দ্রগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি করে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করতে হবে।
৯. যে কোন অবকাঠামো তৈরীর সময় শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে।
১০. মাদকের প্রভাব থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার জন্য বেশী সংখ্যক পাঠাগার, খেলার মাঠের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে এবং তা অবৈধ দখলের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।
১১. কমিউনিটি সেন্টারের সংখ্যা বাড়াতে হবে ও এর মানসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
১২. সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত স্কুল এবং হাসপাতালগুলোতে সর্বোচ্চ সেবার মান বাড়াতে হবে এবং নিয়মিত মনিটরিংএর ব্যবস্থা করতে হবে।
১৩. সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার সাথে বাস্তবায়ন করতে হবে।
১৪. জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য বিশেষ করে বর্ষাকালে, ঢাকার জলাশয়, খাল-বিল গুলো অবৈধ দখলের মাধ্যমে ভারাট হওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে, পানির প্রবাহ সচল রাখার জন্য নিয়মিত এগুলো পরিস্কার করতে হবে। এরসাথে পরিকল্পিত ড্রেনেইজ সিস্টেম করতে হবে।
১৫. ফরমালিন মুক্ত বাজার নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে।
১৬. রোগী পরিবহনের লক্ষ্যে এ্যাম্বুলেন্সের জন্য বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
১৭. সিটি কর্পেরেশনের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় সমস্যার উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
১৮. কর্মজীবী নারীদের জন্য কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল, এবং শিশু রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।
১৯. জনগণের নিরাপত্তা বিশেষ করে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাস্তায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে হবে।
২০. কর্মজীবী, শ্রমজীবী নারীদের যাতায়াতের জন্য মহিলা বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে এবং বিআরটিসিসহ অন্যান্য সকল গণপরিবহনে মহিলা আসন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তা কার্যকরী করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ।
২১. সকল বাস স্টপেজ থেকে যাতে নারীরা তাদের গন্তব্যগামী পরিবহনে উঠতে পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
২২. প্রত্যেকটি বাজারকে নারী বান্ধব করতে হবে।
২৩. নারীদের জন্য পৃথক, স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে।
২৪. নারীর উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ ও সুনির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।
২৫. যে কোন গলিতে বা রাস্তায় এ¤ু^লেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাতে প্রবেশ করতে পারে অবকাঠমো তৈরীর সময় সেই বিষয় খেয়াল রাখতে হবে।
২৬. অবকাঠমোগত পরিকল্পনা প্রণয়নের আগে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব পর্যালোচনা করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের প্রতি:
২৭. নির্বাচন কমিশনকে- অবাধ , শান্তিপূর্ণ , নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
২৮. নির্বাচনী আচরণ বিধি মেনে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে প্রার্থীদের উৎসাহিত করতে হবে এবং লংঘনকারীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী বিধান অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
২৯. কালো টাকা ও পেশী শক্তির প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।
৩০. নির্বাচনে সাধারণ ,সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক নারীরা যাতে অবাধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
৩১. নির্বাচনী প্রচরণায় ধর্মকে যাতে কোনভাবেই ব্যবহার করা না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
৩২. প্রার্থীদের দাখিলকৃত তথ্যাদি নিরপেক্ষভাবে যাচাই বাছাই করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩৩. মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত, মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত, দুর্নীতিবাজ প্রার্থী যাতে কোনভাবেই মনোনয়ন না পায় সেজন্য যথাযথ পদক্ষেপ প্রহণ করতে হবে।
৩৪. নারী নির্যাতনকারী ও নারীর মানবাধিকার লংঘনকারী ব্যক্তিকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।
৩৫. নির্বাচনকালীন সময়ে নারী ভোটারগণ যাতে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সেজন্য বুথের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।
৩৬. নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৩৭. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে সেজন্য পৃথক ব্যবস্থা করতে হবে।
৩৮. সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের ক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন করতে হবে।
৩৯. সময়ে নারী- পুরুষ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল সাধারণ জনগণ যাতে স্বেচ্ছায়, সুষ্ঠুভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই লক্ষ্যে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪০. নির্বাচনপূর্ববর্তী, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচনপরবর্তী সময়ে সকল জনগণের বিশেষ করে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৪১. ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নির্বাচনকালীন সময়ে সেই সকল এলাকার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
জনগণের প্রতি:
৪২. নারী- পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে
দলমত নির্বিশেষে সমগ্র ঢাকা বাসীকে এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে হবে এবং নির্বাচন পরবর্তীতে তাঁদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে দায়বদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
৪৩. নির্বাচনী আচরণ বিধি মেনে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে প্রার্থীদের উৎসাহিত করতে হবে।
৪৪. জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে অপব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে কোনভাবেই ধর্মকে ব্যবহার করা যাতে না হয় সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।
৪৫. মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত, মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত, দুর্নীতিবাজ, কালো টাকা, পেশী শক্তি, নারী নির্যাতনকারীদের ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
আমরা জানি আজকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে উন্নত ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে নানা সূচকে এগিয়ে আছে। সে ক্ষেত্রে আজকে ঢাকা মহানগরকেও সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে একটি পরিকল্পিত, উন্নত,আধুনিক, নিরাপদ, নারী বান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

LEAVE A REPLY