‘নীল হাওয়ার সমুদ্রে’ ধানসিঁড়ির জীবনানন্দ

আপডেট: মার্চ ১৫, ২০১৯

অস্পষ্ট রহস্যময় সিঁড়ি’ নামে একটি গল্প আছে জীবনানন্দের। সেখানে জীবনানন্দ বলছেন, জীবনের কেন্দ্র থেকে উঠে আসা আখ্যান নয়, বরং জীবনের কিনার থেকে যে গল্পের জন্ম হয় তার হিম নীরবতাই তাঁকে আজ আকর্ষণ করে বেশি। এই উপলব্ধি যেন কবি জীবনানন্দ দাশের সমগ্র লেখকজীবনের অন্তরতম স্টেটমেন্ট। যে রণ–রক্ত–সফলতা এই ঊর্ধ্বশ্বাস সভ্যতায় আধুনিক মানুষের একমাত্র অন্বিষ্ট, সেই ঘটনাবাহুল্য থেকে ঢের দূরে, নির্জন, অস্পষ্ট জীবনের রহস্যময়তার ঘেরাটোপে যে মন্থরতা, যে আত্ম–অনুসন্ধান, যে সাবলাইমের খোঁজ তিনি পেয়েছিলেন, শব্দ–অক্ষরের চলাচলে তাকে ধরতে চাওয়াই ছিল এই কবির লক্ষ্য। আর, তাঁর অকালমৃত্যুর অনেকদিন পরে, কোনও একজন ঔপন্যাসিক যখন তাঁর জীবনের আধারে রচনা করতে বসেন এক জীবন–আখ্যান, তখন সেই পুনর্নির্মাণও আসলে হয়ে ওঠে আধুনিক বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠতম কবির জীবনের নিরলংকরণ— বিনির্মাণ। ‘নীল হাওয়ার সমুদ্রে’— এই জীবনীমূলক উপন্যাসে সেই কঠিন ও দুরূহ কাজটি করতে চেয়েছেন প্রদীপ দাশশর্মা।
মৃত্যুর পর বিপুলায়তন গদ্যসাহিত্য আবিষ্কৃত হয়েছে জীবনানন্দের, যে গল্প–উপন্যাসগুলি কবি জীবদ্দশায় প্রকাশিত করেননি।

ট্রাঙ্কবন্দি করে রেখেছিলেন। আজ, সেই কথাসাহিত্যের আলোকে জীবনানন্দের এক সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত, অপঠিত জীবনী পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে আমাদের সামনে। সমকালীন সময়ের প্রেক্ষিতে একজন ‘মিসফিট’ মানুষ হিসেবে নয়, এই লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে খুঁজে নেওয়া যায় এমন এক মানুষকে, যিনি ক্রমশই নিজেকে ঠেলে দিচ্ছেন মার্জিনের দিকে, এক ধরনের স্বেচ্ছা–প্রত্যাহারের বৃত্তে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন, সেই তিরিশ–চল্লিশের দশকেও একের পর এক কলেজের চাকরি থেকে অব্যাহতি নিচ্ছেন, পরিবারে চূড়ান্ত কোণঠাসা হচ্ছেন ও দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী থাকছেন, দারিদ্র্য বরণ করে নিচ্ছেন।

অথচ তিনি চূড়ান্ত জীবন–সংরক্ত। নিজের একান্ত ব্যক্তিগত পরিসর ও সমকালীন চারপাশের সঙ্গে নিজেকে এনগেজড করছেন প্রত্যেক মুহূর্তে। সেই সূত্রেই মার্কস, গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জিন্নাহ্‌, নেহরু, সুভাষচন্দ্র, চিত্তরঞ্জন, ফজলুল হক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এসেছে এই উপন্যাসে।

আবার একান্ত ব্যক্তিগত নারীরাও এই উপন্যাসের প্রাণভ্রমর হয়ে উঠেছে— মনিয়া, বনলতা, ওয়াই, অপর্ণা, সুরুচি, সুরঞ্জনা, স্ত্রী লাবণ্যও কবির লেখার পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে। আসলে ব্রাহ্মসমাজই হোক বা কলেজ কর্তৃপক্ষ অথবা সমকালীন কাব্যরাজনীতি— কোনও জায়গাতেই জীবনানন্দ রেজিমেন্টেশনের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। তার মূল্যও চোকাতে হয়েছে তাঁকে গোটা জীবন দিয়ে।

তাঁর ‘সফলতা–নিষ্ফলতা’ উপন্যাসটি পড়লে এই স্বেচ্ছা–নির্বাসনের প্রক্রিয়াটি বোঝা যায়। এই উপন্যাসের নিখিল হলেন জীবনানন্দ নিজে। আর, বাণেশ্বর চরিত্রটি বুদ্ধদেব বসু ও বিষ্ণু দে–র আদলে তৈরি। ঢের বেশি মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও নিখিল স্বেচ্ছায় জীবনের যাবতীয় জাগতিক সফলতার বৃত্ত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়

। আর, তুলনায় অনেক কম প্রতিভাধর বাণেশ্বরেরা জাগতিক সাফল্যের তুঙ্গ উচ্চতায় পৌঁছতে থাকে। আর এই বৈপরীত্য নিয়ে রীতিমতো ঠাট্টা–ইয়ার্কি করে নিখিল, করুণা করে বাণেশ্বরদের। এই অন্তর্লীন প্যাথোস, তীব্র আত্মকরুণা, সময়বিশেষে নিজের মানুষদের প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা— সবই এসেছে প্রদীপ দাশশর্মার এই লেখায়। কবির মৃত্যুদৃশ্যটিও পরম হৃদয়স্পর্শী করে এঁকেছেন তিনি— ‘সে কী তবে দূরাগত কোনো শব্দ শোনে! দৃষ্টিতে কোনো দূরবর্তী সিগন্যাল। ট্রামলাইনের মধ্যভূমিতে ঘাস, কাশফুল.‌.‌.‌সহসা সুচরিতার চিৎকার— না–আ–আ !…চারটি যুবা ভেতরে ছুটে যায়!…লাবণ্য, লাবি, লাব, লা…চারদিক এখন ও.‌কে…’
কিন্তু জীবনানন্দের মাপের কবির জীবনকে আখ্যানে ধরতে হলে সমতুল্য একটি সাবলাইম ভাষার প্রয়োজন হয়।

যে ভাষা ‘নীল হাওয়ার সমুদ্রে’র লেখকের একেবারেই অনায়ত্ত। এই উপন্যাসের ভাষা না হয়েছে পাঠক–প্রিয় কোনও স্বচ্ছন্দ ন্যারেটিভ, না হয়েছে মেধাবী কোনও গহন অভিসার। এক ধরনের আড়ষ্ট, কাটা–কাটা, ক্রিয়াপদ–বর্জিত খণ্ডবাক্যের সমাহার, যার ফলে এই লেখাটি চূড়ান্তভাবে পাঠককে হতাশ করে ও উপন্যাস থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যা কোনওভাবেই জীবনানন্দের সমগ্র লেখালেখির প্রতি সুবিচার করে না। এটুকু বাদ দিলে, এই উপন্যাস জীবনানন্দ–চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।