পবিত্র আশুরা : করণীয় বর্জনীয়

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮

মুহাম্মদ আমিনুল হক:

আশুরা কি? : আরবী বছরের প্রথম মাসের নাম মুহাররম। মূলতঃ এটি আসল নাম নয়। আসল নাম সফর আউয়াল। সৃষ্টির শুরু থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এ মাসে সংঘটিত হওয়ায় এর তাৎপর্য অনেক। মুহাররম সম্মানিত ও মর্যাদাবান বিধায় একে এই বিশেষিত নামেই ডাকা হয়। মুহাররম মাসের দশ তারিখ আশুরা নামে পরিচিত। আশুরা আরবী শব্দ। এর অর্থ দশম দিন। এদিনটি ঐতিহাসিকভাবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিনে প্রাচীন আরবগণ কাবার দরজা দর্শনার্থীদের জন্য খোলা রাখত। আশুরার ঐতিহাসিক ঘটনা ও তাৎপর্য : সৃষ্টির শুরু থেকে বিভিন্ন ঘটনা এ দিনটিকে করেছে চির ভাস্বর। আরবী মুহাররম মাসের দশ তারিখ যুগ পরম্পরায় যে ঐতিহাসিক ঘটনার জন্ম দিয়েছে তা বিস্মৃত হওয়ার নয়। মুহাররম মাসের দশ তারিখে আল্লাহ তায়ালা এ দুনিয়াকে সৃষ্টি করেছেন।

এদিনে হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা হয়; ফিরিস্তাদের আদেশ দেয়া হয় আদমকে সিজদা করতে; বেহেস্ত থেকে আদমকে দুনিয়ায় প্রেরণ করা হয়; এবং আরাফাতের ময়দানে আদম ও তাঁর বিবি হাওয়ার সাক্ষাতও ঘটে। হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম কঠিন রোগ থেকে রেহাই পেয়েছেন এ তারিখেই। এ দিনে হযরত মুসা (আ.) কে বিজয় দান করা হয়েছিল। হযরত ঈসা (আ.) কে আল্লাহ তায়ালা আসমানে জীবিত তুলে নিয়েছেন এদিনেই। এদিনে নূহের প্লাবন হয় এবং এদিনেই আবার তিনি প্লাবনের পরে নৌকা থেকে নেমে আসেন। এদিনে হযরত ইবরাহিম (আ.) নমরুদের আগুন থেকে মুক্তি পান। এদিনে হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে বেরিয়ে আসেন। এদিনেই সম্ভবত কিয়ামত সংঘটিত হবে।

কারবালার বিরল দৃষ্টান্ত : আল্লাহ তায়ালা মুহাররম মাসের দশ তারিখকে কারবালার ঐতিহাসিক বিরল দৃষ্টান্তের জন্যও মনোনীত করেছেন। এ দিনে নবী দৌহিত্র হযরত হুসাইন (রা.) ও তার পরিবারবর্গ যে আত্মত্যাগের মহা বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা অপূর্ব। হিজরী ৬০ সনে ও ইংরেজী ৬৮০ খ্রীষ্টাব্দে এ দিনে ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে স্মরণকালের মানব ইতিহাসের নির্মমতম হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র; ফাতেমা দুলাল; চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা.) এর পুত্র ইমাম হুসাইন (রা.) সপরিবারে এদিন দামিশক অধিপতি ইয়াজিদের দুর্ধর্ষ বাহিনীর হাতে ফোরাতের কিনারে শাহাদতের পানি পান করেন। নীতি ও আদর্শের জন্য; সত্য ও ন্যায়ের জন্য অবলীলায় প্রাণ উৎসর্গ মানব ইতিহাসে সত্যিই বিরল। অপ্রতিরোধ্য বাতিল ও শয়তানী শক্তির বিরুদ্ধে তেজদ্দীপ্ত ঈমানদারের দুর্বল প্রতিরোধের যে ইতিহাস আশুরার দিনে কারবালার প্রান্তরে রচিত হয়েছে, তা অনন্য ও কালজয়ী। যুগ যুগ ধরে এ ঘটনা মানুষকে বাতিলের বিরুদ্ধে প্রত্যয়ী হওয়ার প্রেরণা যোগায়। আশুরা : আমাদের করণীয় : মানব ইতিহাসের সূচনা লগ্ন থেকেই আশুরাতে সংঘটিত ঘটনাবলী মানবজাতির জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে রয়েছে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ক্রান্তিকালে করণীয় ও বর্জনীয় অসংখ্য নির্দেশনা এ আশুরার ঘটনাবলীতে বিদ্যমান। প্রতিবছর এদিনটি যখনই মানুষের কাছে ধরা দেয়, তখনই মনে হয় যেন আশুরা তাঁর শিক্ষার ভান্ডার নিয়ে আমাদেরকে নতুনভাবে ডাকছে। এদিনের আবেদন ফুরাবার নয়।
আর তাই আশুরাকে আমাদের সুন্দরভাবে উদযাপন করতে হবে। রাসূল (স.) এদিনকে যেভাবে উদযাপন করেছেন এবং উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছেন আমাদেরকেও ঠিক সেভাবেই উদযাপন করতে হবে। আশুরার রোযা : আশুরার দিন রোযা রাখা খুবই ফজিলতের। তবে তার পূর্বে অথবা পরে আরেকটি রোযা সংযোগ করতে হবে। যাতে ইহুদীদের রোযা প্রথা থেকে মুসলমানদের আশুরা পালন ভিন্ন হয়। আল্লাহর রাসূল সবসময় বিধর্মীদের অনুকরণ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। আশুরার রোযা সম্পর্কে হাদীসে এসেছে- হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসূল কিছু ইহুদীকে দেখলেন আশুরা দিবসে তারা রোযা পালন করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এটি কিসের রোযা? তারা বললো, এদিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও বনী ইসরাইল সম্প্রদায়কে সমুদ্রে ডুবে মরার হাত থেকে উদ্ধার করেছেন। ফেরাউনকে ডুবিয়ে মেরেছেন।
আর এদিন ‘জুদি’ পর্বতে নূহের জাহাজ ভিড়েছিল। তাই নূহ ও মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এদিনে রোযা পালন করেছিলেন। মহানবী (স.) বললেন, আমি মুসার অনুসরণের বেশি উপযুক্ত এবং এ দিবসের রোযার বেশি হক্বদার। তিনি তাঁর সাহাবাদেরকে রোযা পালনের নির্দেশ দান করেন। (মসনদে আহমদ) তবে তিনি আশুরার রোযাকে ইহুদীদের রোযা হতে পার্থক্য করার জন্য বলেছেন- ‘‘তোমরা আশুরার দিন রোযা রাখ এবং ইহুদীদের থেকে ব্যতিক্রম কর।
আশুরার একদিন পূর্বে বা একদিন পরেও রোযা রাখ’’। আশুরার দিন রোযা রাখার ফজিলত সম্পর্কে মহানবী (স.) বলেন- ‘‘আশুরার দিনের রোযার ব্যাপারে আমি আল্লাহর নিকট আশাবাদী যে, তিনি এক বছর পূর্বের গুনাহ মাফ করে দিবেন’’। (মসনদে আহমদ) মুসা (আ.) ও ইবরাহীমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়া : আশুরার দিন আমাদেরকে মুসা (আ.) বিজয়ের ইতিহাস স্মরণ করতে হবে। তিনি যেভাবে আল্লাহর পথে অবিচল থেকে ফেরআউনের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন ঠিক তেমনিভাবে আমাদেরকেও বাতিলের পথকে রুদ্ধ করে ইসলামের আলোয় আলোকিত সমাজ গঠনের প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে। ইবরাহীম (আ.) এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে শয়তানী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা গড়তে হবে। কারবালার শিক্ষা বুকে ধারণ করা : আশুরার দিন কারবালা প্রান্তরে মানব ইতিহাসের যে নির্মম কাহিনী রচিত হয়েছিল তা থেকে আমাদেরকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমরা যত দুর্বল হইনা কেন আমাদের শত্রুরা আমাদেরকে এতটুকুও ছাড় দেবে না। বর্তমানে যার নজির আমরা সারা বিশ্বে দেখতে পাই। ইসলাম বিরোধী শক্তি একজোট হয়ে ইসলাম ও মুসলমানের শক্তিকে নিঃশেষ করে দিতে চায়। ইরাকের পুরো মানচিত্র আজ কারবালায় পরিণত হয়েছে। সেখানে আমেরিকা ও তার মিত্রশক্তিরা মুসলমান মা-বোনদের রক্ত নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। ফিলিস্তিন ও আফগানিস্তানের মুসলমানরা আজ ক্ষত-বিক্ষত।

বলতে গেলে শয়তানী ও তাগুতী শক্তি গোটা জাহানকে কারবালায় পরিণত করেছে। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের মজবুত ঈমান। তাই আমাদেরকে ঈমানী চেতনায় বলীয়ান হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কুফরী শক্তির বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কারবালার মরু প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা.) সপরিবারে আত্মত্যাগ করে সমগ্র বিশ্ববাসীকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, যে মস্তক আল্লাহর কাছে নত হয়েছে সে মস্তক কখনো বাতিল শক্তির কাছে নত হতে পারে না। আল্লাহর পথে অটল থাকতে মুমিনেরা তাদের জীবনকে উৎসর্গ করতে দ্বিধা করে না। তাই আজকের মুসলমানরা সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শপথ নিতে পারলেই কেবল আশুরার তাৎপর্য প্রতিফলিত হবে।
মর্সিয়া, তাজিয়া, আলোচনা ও আনুষ্ঠানিতার মধ্যে যেন আমরা আশুরাকে ফ্রেমবন্দি না করি। কবি নজরুল বলেছেন-‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া, ক্রন্দন চাহি না’ আশুরা : আমাদের বর্জনীয় : আশুরার দিন ক্রন্দন-বিলাপ করা; বুকে চাপড়ানো; পিঠে চাবুক দিয়ে আঘাত করা; নিজেকে রক্তাক্ত করা ও শোক মিছিল করা কোনোটিই শরীয়ত সম্মত কাজ নয়। কুরআন হাদীসে এর কোনো ভিত্তি নেই। আশুরার দিন ভাল খাবারের আয়োজন করতে হবে; মুরগী জবাই করতে হবে-এমন ধারণা ও কুসংস্কার আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। ‘এদিন ভালো খেলে সারা বছর ভালো খাওয়া যাবে’ এ জাতীয় কথিত হাদীস শোনা গেলেও মূলতঃ এ ধরনের কোনো বিশুদ্ধ হাদীস পাওয়া যায় না। অতএব আশুরার দিন শোক, মাতম না করে এখান থেকে কি শিক্ষা নেয়া যায় সে চেষ্টাই করা উচিত। আমাদেরকে আরও একটি কথা মনে রাখতে হবে আশুরা মানে কারবালার ঘটনা নয়; এদিনে ঐতিহাসিক অনেক ঘটনা ঘটেছে। কারবালার ঘটনা ঐ ঘটনাগুলির মধ্যে এখন পর্যন্ত সর্বশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। যার মধ্যে মুসলমানের অনেক শিক্ষার বিষয় আছে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তৌফিক দিন। আমীন!

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম। খতীব, ইসলামী সমাজ কল্যাণ পরিষদ জামে মসজিদ, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম।