বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষনে অনুপ্রাণিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি. কে এস মহিউদ্দিন মানিক, বীর প্রতীক

আপডেট: ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯
0

রাহাদ সুমন,বিশেষ প্রতিনিধি:
স্বাধীনতা আলাদিনের আশ্চর্য্য প্রদীপ নয়,রূপকথা কিংবা গল্পগাঁথাও নয়,স্বাধীনতা মানে শোষণ-তোষন আর পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখন্ড। আর সেই স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনতে যারা মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য মনে করে সন্মূখযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদেরই একজন কে এস মহিউদ্দিন মানিক বীর প্রতীক।একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেন,জাতির জনব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে বরিশালের মুক্তিকামী মানুষ যুদ্ধের জন্য সংগঠিত হতে থাকে। প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যুদ্ধের প্রস্তুতি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়।সচিবলায় ঘীরে বরিশালের লাকুটিয়া জমিদারবাড়ি,নবগ্রাম মিশনারি,বেলস পার্ক ( বর্তমানে বঙ্গবন্ধু উদ্যান), বিএম স্কুল ও ইছাকাঠিতে ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ওইসব ক্যাম্পে খাদ্যদ্রব্যের পাশাপাশি জ¦ালানী মজুদ রাখা হয়। বেশকিছু ক্যাম্পে টেলিফোন যোগাযোগ স্থাপন করা হয়।
বঙ্গবন্ধু উদ্যান সংলগ্ন বিআইডব্লিউটিএ’র চানবাংলোতে নবম সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ জলিল অবস্থান করে যুদ্ধের সামরিক কৌশল নিয়ে কাজ শুরু করেন। ওই সময় কে এস এ মহিউদ্দিন মানিক ছিলেন তার সহযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ করে চাচৈরের যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য তিঁনি বীর প্রতীক খেতাব অর্জণ করেছেন। যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, বরিশালের তৎকালিন এডিসি আজিজুল ইসলাম তার নিজের জিপটি মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে দেন। ওই জিপটি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজে ব্যবহার করা হতো। পরবর্তীতে পাকবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন এডিসি আজিজুল ইসলাম।
অস্ত্র লুটের ঘটনা:
২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর খবর মধ্যরাতেই বরিশালে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের কাছে পৌঁছে যায়। কে এস এ মহিউদ্দিন মানিক জানান,ওই রাতেই বরিশালে আত্মপ্রকাশ করে মুক্তিবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধ ও প্রশাসন পরিচালনার জন্য গঠিত হয় একটি বিপ্লবী সংগ্রাম পরিষদ। ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টায় জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালিন সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন আহম্মেদের কলেজ রোডের বাসভবনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা হয়।
সভা শেষে নুরুল ইসলাম মনজুর ও তার কয়েক সহকর্মী সিদ্ধান্ত নেন, ২৫ মার্চ রাতেই পুলিশ লাইন্সের অস্ত্রাগারের সব অস্ত্র সংগ্রহ করা হবে। তা দিয়ে প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করে ছাত্র ও যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা শুরু করবেন। কে এস এ মহিউদ্দিন মানিক জানান সিদ্বাান্ত অনুযায়ী এডিসির জিপে রাত সাড়ে ৩টায় তারা পুলিশ লাইন্সে পৌঁছে যান। ডিএসবির এসআই বাদশা মিয়া, হাবিলদার আকবর ও অন্য পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় অস্ত্রাগারে রক্ষিত সব অস্ত্র, নিয়ে পেশকার বাড়ির চেম্বারে চলে যান। পরদিন ২৬ মার্চ বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই সচিবালয়ের মাধ্যমে সংগ্রাম পরিষদের তত্ত্বাবধানে বৃহত্তর বরিশাল, পটুয়াখালী ও খুলনা জেলায় স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়।
১৮ এপ্রিল সকালে পাকিস্তানি বাহিনী বরিশালের ওপর বিমান থেকে বোমা হামলা চালায়। এ ঘটনার পর বরিশাল শহর জনমানবশূন্য ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়। বোমা বর্ষণের দুই দিন পর নুরুল ইসলাম মনজুর ভারত থেকে কিছু অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বরিশালে পৌঁছেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়। সে অনুযায়ী বরিশালের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষন দেয়ার পাশাপাশি সন্মুখযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন তারা।
যেভাবে গুলিবিদ্ধ হলেন:
কয়েক দিন ধরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটিতে আক্রমণ ও সফল অভিযান চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বেশ ক্লান্ত। ১৩ নভেম্বরে, ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার চাচৈর গ্রামের একটি খালে তারা অবস্থান নেন। ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত থাকায় কয়েকজন ছাড়া সবাই নৌকায় ঘুমিয়ে পড়েন। সাবসেক্টর কমান্ডার শাহজাহান ওমরের নেতৃত্বে ছিলাম কে এস মহিউদ্দিন মানিকরা। ভোররাতে মানিকের কাছে দুজন লোক এল। তারা জানায়. চাচৈরের পাশের গ্রামে একদল পাকিস্তানি সেনা অবস্থান করছে।
নৌকায় থাকা মুক্তিযোদ্ধারা কোনো কিছু না ভেবেই তাৎক্ষনিক ওই গ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করেন। গ্রামে ঢুকে বেশ কয়েকটি বাড়িতে আগুন জ্বলতেও দেখে । তারা কী করবে কিছু ভেবে উঠতে পারছিলনা। ভোরের আলো তখনো পুরো ফোটেনি। হঠাৎ মানিক দেখতে পেলেন কয়েকজন পাকিস্তানি সেনাকে। তারা জঙ্গলের ভেতর শুয়ে আছে, মাথার হেলমেট চিকচিক করছে।
সহযোদ্ধা জিয়াউদ্দিনকে বিষয়টি বললে তিনি প্রথমে তার কথা বিশ্বাস করেননি। পরমুহূর্তেই অপরাপর সহযোদ্ধারা দেখলেন খালের ওপর সাঁকোর পাশে পাকিস্তানি সেনাদের। খালের দুই পাড়ে চারটি স্থানে তাদের মর্টারের অবস্থান। মানিক সঙ্গে সঙ্গে সহযোদ্ধা জিয়াউদ্দিনের কাছে থাকা মর্টারে গোলা ভরে দেন। মানিক মর্টার চার্জ করলে তা পাকিস্তানিদের মর্টার অবস্থানে পড়ে। এরপর চলতে থাকে সম্মুখ যুদ্ধ।
সংবাদ পেয়ে আশপাশে থাকা অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার দলও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয়। তাঁরা পাকিস্তানিদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। দিনব্যাপী যুদ্ধ চলে। অসংখ্য পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগী রাজাকার ওই যুদ্ধে মারা যায়। কিছুসংখ্যক পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও অধিকাংশই জনতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ওই গ্রামের মহিলারাও দা দিয়ে কুপিয়ে তাদের হত্যা করে। সেদিন যুদ্ধে মানিকের কপালের ডান দিকে গুলি লাগে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।ওই রক্তক্ষয়ী সন্মূখযুদ্ধে তার সহযোদ্ধা নায়েক সুবেদার এলএমজি ম্যান বাকেরগঞ্জের কাজেম আলী আহত ও আউয়াল শহীদ হন।
মহিউদ্দিনের জীবনী:
কে এস মহিউদ্দিন মানিকের বাবার নাম কাজী মনোয়ার হোসেন। মা আনোয়ারা বেগম। স্ত্রী কামরুন্নাহার নাজনীন। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। তাঁর গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির নবগ্রাম। বর্তমানে তিনি বরিশাল শহরের বগুড়া রোডে পৈতৃক বাড়িতে বসবাস করছেন। মহিউদ্দিন মানিক ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ও মা-বাবার নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। বরিশাল পুলিশ লাইন থেকে পাওয়া অস্ত্র নিয়ে ২৫ এপ্রিল চলে যান নানা বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়ায়। সেখানে রাজ্জাকপুর গ্রামের মোসলেম মল্লিকের বাড়িতে বেণী লাল দাস গুপ্ত বেণু, হায়দার খান,সিদ্দিক খান ও এনায়েত হোসেন সহ কয়েকজন মিলে মুক্তিবাহিনীর একটা দল গঠন করেন।সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে তাঁরা সাবসেক্টর কমান্ডার শাহজাহান ওমরের দলে একীভূত হন।এরপর থেকে তাঁর সঙ্গেই বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেন।৮ ডিসেম্বর তাঁরা বাকেরগঞ্জ থানা মুক্ত করেন। সেদিন তিনি আবার আহত হন। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ করে চাচৈরের যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য কে এস এ মহিউদ্দিন মানিক বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন।বরিশাল জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি ও কমান্ডার কে এস মানিক বীর প্রতীক যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিরূপণ করার দাবি জানিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়েও মুক্তিযোদ্ধা সেজে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। যুদ্ধে অংশ না নিয়েও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ভাতা নিচ্ছেন। স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার,আল বদর ও আল শামসরা এমপি-মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে বাড়িতে জাতীয় পতাকা উঁড়িয়ে ২ লাখ মা বোনের সম্ব্রম আর ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলায় বীরদর্পে ঘুরে বেড়িয়েছে যা জাতির জন্য অত্যন্ত দুঃখ ও লজ্জাজনক। জীবন সায়হেৃ দাঁড়ানো ৭১’র রণাঙ্গনের এ বীর সেনানী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ক্ষুধা,দারিদ্র,সন্ত্রাস, দুর্নীতিমুক্ত ও শোষণ-বৈষম্যহীন স্বপ্নের প্রকৃত সোনারবাংলা হিসেবে রক্তার্জিত স্বদেশকে দেখে যেতে চান। তাহলেই জীবন বাজি রেখে তার মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া স্বার্থক হবে বলে তিনি জানান। # ##

রাহাদ সুমন,বানারীপাড়া
তারিখ.১৩-১২-২০১৯ইং

LEAVE A REPLY