বিএনপি’তে শৃঙ্খলা ফেরানোর দায়িত্ব ফখরুল-গয়েশ্বরকে দিলেন তারেক

আপডেট: মে ৮, ২০১৯
0

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট ডাকাতির’ অভিযোগ তুলে একাদশ নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করা বিএনপি সবাইকে অবাক করে দিয়ে সংসদে যোগ দিয়েছে। দলীয় পাঁচ এমপির শপথ কেন্দ্র করে দলে এক ধরনের হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। রাতারাতি সিদ্ধান্ত বদলের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছেন বিএনপির হাইকমান্ড। তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা প্রকাশ্যে বিষোদগার করছেন জ্যেষ্ঠ নেতাদের। দলীয় ফোরামসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইয়ে যাচ্ছে।

এদিকে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে কেন্দ্রে নেতায় নেতায় সৃষ্টি হয়েছে দূরত্ব। জ্যেষ্ঠ বেশ কয়েকজন নেতা এ ঘটনার পর মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ রাগে ক্ষোভে অভিমানে দলের ঘরোয়া কর্মসূচিতেও যোগ দিচ্ছেন না। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা একে অপরকে দুষছেন। এমতাবস্থায় ভেঙে পড়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।

দলের চরম দুঃসময়ে সিনিয়র নেতাদের দোষারোপের কারণে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাপ্তাহিক বৈঠকও কোনো কারণ ছাড়া বাতিল হয়ে গেছে। বিষয়টি হাইকমান্ডের নজরে পড়েছে। তাই জ্যেষ্ঠ নেতাদের ভুল বোঝাবুঝি দূর করে দলকে এক সুতায় গাঁথতে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।

এ লক্ষ্যে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দায়িত্ব পাওয়ার পর রোববার দুই নেতা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এতে দলের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নানা কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। এর আগে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের সঙ্গেও রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন মির্জা ফখরুল।

দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা পর্যায়ক্রমে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এর পর যত দ্রুত সম্ভব ডাকা হবে স্থায়ী কমিটির বৈঠক। সেখানে তারেক রহমান শীর্ষ নেতাদের শপথের বিষয়টি অবহিত করবেন। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মির্জা ফখরুলও বৈঠকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে পারেন। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

আরও জানা গেছে, দলীয় শৃঙ্খলার স্বার্থে কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ফোরামের বাইরে যাতে কেউ কথা না বলে সে জন্য বিশেষ বার্তা দেয়া হয়েছে। হাইকমান্ডের নির্দেশের পরও যদি কোনো নেতা ফোরামের বাইরে কথা বলেন তার বিরুদ্ধে নেয়া হবে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা। পাশাপাশি নেতাদের মধ্যে সৃষ্ট ক্ষোভ ও হতাশা দূর করতে পবিত্র রমজানে ইফতার পার্টিকেও কাজে লাগাবে দলটি। সার্বিক উদ্যোগে দলে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে মনে করছেন সব স্তরের নেতাকর্মীরা।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, পাঁচ এমপির শপথকে কেন্দ্র করে বিএনপিতে ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তৃণমূলেও সেই ছোঁয়া লেগেছে। বিএনপি হাইকমান্ডের উচিত দলের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া। এ উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বিএনপিতে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি হবে।

জানা গেছে, তারেক রহমানের একক সিদ্ধান্তে বিএনপির চার এমপিকে শপথ নিতে বলা এবং মির্জা ফখরুলের শপথ না নেয়ায় দলের মধ্যে শুরু হয় টানাপোড়েন। ক্ষোভ-অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে নেতাকর্মীর মধ্যে। এ অবস্থায় পরস্পরকে দোষারোপ শুরু করেন শীর্ষ নেতারা। অধিকাংশ নেতা মুখ না খুললেও এ ইস্যুতে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

সিনিয়র নেতাদের এমন দ্বিধাবিভক্তিতে বিপাকে পড়ে দলটির হাইকমান্ড। শনিবার বিষয়টি নিয়ে গয়েশ্বরের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলেন তারেক রহমান। দলের ঐক্য ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তাকে বিশেষ ভূমিকা নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে দলীয় ফোরামের বাইরে সমালোচনা না করতে পরামর্শ দেয়া হয়। এদিকে ঘূর্ণিঝড় ফেনীর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় তাকে ত্রাণ কমিটির আহ্বায়ক করেন তারেক রহমান। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কথা বলার পর অনেকটা নমনীয় হন গয়েশ্বর।

সোমবার এক আলোচনায় সেই ইঙ্গিতই পাওয়া যায়। নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সমালোচনা দলের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস কমায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের ‘ব্লেইম গেম’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একজন আরেকজনকে দোষারোপ করলে প্রতিপক্ষ সুযোগ পায়। আমরা দুর্বল হয়ে যাই। আমাদের সংগ্রাম ঐক্যের জন্য, ঐক্য হলো লক্ষ্য অর্জনের।

গয়েশ্বর আরও বলেন, আসুন আমরা অন্যের সমালোচনা বাদ দিয়ে আত্মসমালোচনা করি এবং নিজেকে সংশোধনের মাধ্যমে ‘ইস্পাত কঠিন’ ঐক্য গড়ে তুলি। এতে দল শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি নেতাকর্মীদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন দেখার বিষয় যে, তারা কতটা ভূমিকা রাখতে পারে। এসব নিয়ে কথা বলার সময় এখন নয়।

সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিশেষ বার্তা পেয়ে রোববার রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। দুই নেতার বৈঠকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে ঘুরেফিরে দলের ‘চেইন অব কমান্ডই’ প্রাধান্য পায়। এ সময় মহাসচিব সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে বিশেষ দায়িত্ব দেন।

পাশাপাশি দলীয় ফোরামের বাইরে কথা না বলতে অনুরোধ জানান। এর আগে তারেক রহমানের নির্দেশ পেয়ে শনিবার স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করেন মির্জা ফখরুল।

বৈঠকে মির্জা আব্বাস বলেন, নেতাকর্মীদের ধারণা শপথের সঙ্গে চেয়ারপারসনের মুক্তির একটা সম্পর্ক আছে। এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে। না হলে আমরা কেউ নেতাকর্মীদের হাত থেকে রেহাই পাব না। এর আগে শুক্রবার স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বৈঠক করেন। সেখানে জ্যেষ্ঠ কয়েক নেতাও উপস্থিত ছিলেন। শপথকে কেন্দ্র করে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্ব দূর করতে সবাই একমত হন।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকে অনেকটাই ভেঙে পড়েছে বিএনপির নেতৃত্বের মূল কাঠামো। দলের দুই প্রধান কর্ণধার খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপিতে বিশৃঙ্খলা প্রকট আকার ধারণ করে। কেউ কার কথা মানছে না। শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে সুযোগ পেলেই জুনিয়র নেতারা সরাসরি নীতিনির্ধারকদের নানা প্রশ্নও করছেন। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি কী করছে? ঐক্যফ্রন্টকে কেন এখনও প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে- নেতাকর্মীদের এমন প্রশ্নে অনেক সময় বিব্রত হচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা।

এদিকে শপথ কেন্দ্র করে সিনিয়র নেতাদের পাশাপাশি তৃণমূলেও বিরাজ করছে ক্ষোভ ও হতাশা। নেতাকর্মীদের হতাশা দূর করে ঐক্যবদ্ধ ও চাঙ্গা করার বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, দলে চেইন অব কমান্ড বলে কিছু নেই। দলীয় শৃঙ্খলা মোটেই ভালো নয়। সবকিছু উচ্ছৃঙ্খল ও বিশৃঙ্খল। তিনি বলেন, নির্বাচিতদের শপথ নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। এসব দূর করতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

এদিকে শপথ ঘিরে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও দেখা দিয়েছে এক ধরনের অস্থিরতা। ইতিমধ্যে ২০ দল ছেড়ে বেরিয়ে গেছে দুই যুগ ধরে বিএনপির সঙ্গে থাকা বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি। জোট ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। আরও কয়েকটি দল জোট ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন। তাদের অভিযোগ বিএনপির কাছে তাদের গুরুত্ব নেই, বিএনপির রাজনীতি ঐক্যফ্রন্টমুখী।

এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও ভাঙনের সুরের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গণফোরামে ভেঙে আলাদা দল গঠনের কথা শোনা যাচ্ছে।আবার জেএসডি ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বিএনপির সঙ্গ ত্যাগের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এসব দলের নেতাদের অভিযোগ, জোটসঙ্গী হলেও বিএনপি তাদের না জানিয়ে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।সব মিলিয়ে চতুর্মুখী সংকট দানা বেধেছে বিএনপিতে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনপি শপথের বিষয়ে এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অথচ আমাদের কিছুই বলেনি। অন্তত একটা বৈঠক সঙ্গে সঙ্গে ডাকা দরকার ছিল। সেখানে তারা জানাতে পারত যে বিশেষ অবস্থায় শপথের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিস্তারিত ব্যাখ্যা পরে দেব। কিন্তু তারা কিছুই করেননি। বিএনপিকে এখন খোলাসা করতে হবে যে এই কারণে আমরা শপথ নিয়েছি, যাতে তাদের কথা শুনে অন্যদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়। একই অবস্থা গণফোরামের ক্ষেত্রেও। তারাও ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের বিষয়টি স্পষ্ট করেনি। ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে পথ চলতে হলে বিষয়টি শরিকদের জানাবেন বলে আশা করি।

LEAVE A REPLY