বিএনপির সিনিয়ররাই জানেন না কীভাবে সিদ্ধান্ত হচ্ছে

আপডেট: মে ২৭, ২০১৯
0

বগুড়ার নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং তার আগে সংসদে যোগদানসহ সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতামত নেওয়া হয়নি। কোন প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, সেটাও তাঁরা জানেন না। এ নিয়ে তাঁরা মনঃক্ষুণ্ন। তবে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত আসায় তাঁরা চুপচাপ মেনে নিয়েছেন। এ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা মিডিয়াকে বলেন, শপথ, সংসদে যোগদান ও বগুড়ার আসনে আবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত দলের নেতা-কর্মীদের বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলেছে। এসব সিদ্ধান্ত কোন পর্যায় থেকে, কোন প্রক্রিয়ায় হচ্ছে; তা নিয়ে দলের ভেতরে প্রশ্ন আছে। এতে দলীয় প্রধান কারাবন্দী খালেদা জিয়ার কতটা সায় আছে, তা নিয়েও নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংশয়–সন্দেহ তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ বগুড়া-৬ আসনের নির্বাচনে দলের মনোনয়ন ফরমে খালেদা জিয়া সই না করায় বিষয়টি আবার সামনে এসেছে।

এই অবস্থায় জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকে খটকায় পড়েছেন, আদতে দলীয় সাংসদদের শপথ নেওয়ার বিষয়ে খালেদা জিয়ার মত ছিল কি না, এবং বগুড়ার নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে কোনো বার্তা তিনি দিয়েছেন কি না।

দলের একাধিক সূত্র জানায়, হঠাৎ করেই বিএনপির সাংসদেরা সংসদে যোগ দেন। এরপর ২০-দলীয় জোটের বৈঠকে প্রকাশ পায় বিএনপি বগুড়ার নির্বাচনে যাবে এবং সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী দেবে। তারপরই নারী আসনের প্রার্থী চূড়ান্ত হয়। এসব বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্ষদ স্থায়ী কমিটিতে কোনো আলোচনা হয়নি। সিদ্ধান্তগুলো এসেছে লন্ডনে নির্বাসিত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছ থেকে। নেতাদের কেউ কেউ হয়তো জানতেন কী হতে যাচ্ছে। কিন্তু বিষয়গুলো নিয়ে একধরনের লুকোচুরি দৃশ্যমান ছিল।

অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী  বলেন, খালেদা জিয়ার সম্মতি ছাড়া কিছুই হয়নি। যাঁরা জানেন না, তাঁরা এসব বলছেন। তিনি বলেন, ‘তবে হ্যাঁ, অনেকের ভিন্নমত ছিল। এই ভিন্নমত না থাকলে তো দলে গণতন্ত্রই থাকে না।’

কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁরা এখনো পরিষ্কার নন বিএনপির সংসদে যোগদান বা বগুড়ার নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি কী। হঠাৎ করে সংসদে যোগদান এবং এ সরকারের অধীন আর কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত উল্টে দিয়ে বগুড়ার নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেতা-কর্মীদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। যে আসনে জয়ী হয়ে দলের মহাসচিব শপথ নেননি, সেই আসনের নির্বাচনে যাওয়ার অর্থ কি? আবার এই আসনে প্রার্থী হিসেবে খালেদা জিয়ার জন্য মনোনয়ন ফরমও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই ফরমে সই করতে রাজি হননি। এ অবস্থায় প্রশ্নও উঠেছে, এ সিদ্ধান্ত কোথা থেকে কীভাবে এসেছে? ইতিপূর্বে আলোচনা উঠেছিল যে, বিএনপির সংসদে যোগ দেওয়ার বিনিময়ে খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পাবেন। সেটারও কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবির সঙ্গে বিএনপির সংসদে যোগদানের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, আমাদের দলের স্বার্থে সংসদে গেছি। বেগম জিয়ার মুক্তি তো শর্ত সাপেক্ষে হবে না, আইনগতভাবে হবে। জামিনে মুক্তি তাঁর প্রাপ্য। আমরা সেটাই চাই।’

তবে দলের নেতাদের কেউ কেউ বগুড়া-৬ আসনের মনোনয়ন ফরমে খালেদা জিয়ার সই না করাকে ইঙ্গিতপূর্ণ বলে মনে করছেন।

খালেদা জিয়াকে বগুড়া-৬ আসনের প্রাথী করানোর চিন্তাকে নির্বোধের মতো কাজ বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেখানে দলের মহাসচিব শপথ নেননি, সেখানে দলের প্রধানকে দিয়ে নির্বাচন করানোর ব্যাপারটা গ্রহণযোগ্য নয়। এটা নির্বোধের মতো বাজে সিদ্ধান্ত।’

এদিকে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলোর পক্ষে যুক্তি হিসেবে কোনো কোনো কেন্দ্রীয় নেতা বলছেন, তাঁদের কাছে তথ্য ছিল, মহাসচিব ছাড়া বাকি পাঁচ সাংসদ দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে হলেও শপথ নিতেন। তাঁদের বহিষ্কার করলে তখন ওই সাংসদেরাসহ আরও কিছু ব্যক্তিকে দিয়ে ‘আসল বিএনপি’ নামে দল গঠন করা হতো। তাঁরা বগুড়ার নির্বাচনেও কাউকে মনোনয়ন দিতেন। এসব বিবেচনায় নিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব অবস্থান বদলান।

এ বিষয়ে দুজন জ্যেষ্ঠ নেতা মিডিয়াকে বলেন, এমন আশঙ্কা থাকলে তা দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হতো। যে প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্তগুলো হয়েছে, তাতে নেতারা নিজেদের অপাঙ্ক্তেয় ভাবতে শুরু করেছেন।

LEAVE A REPLY