বিদেশ ফেরত কর্মীদের স্ত্রীরা এইচআইভি/ এইডস এর ঝুঁকিতে

আপডেট: মে ৩০, ২০১৭

এমরানা আহমেদ :
এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত সালেহা বেগম (ছ™§ নাম)। স^ামী শরিফুল (ছ™§নাম) আরব আমিরাতে কর্মরত ছিল ৭/৮ বছর। ৬ মাস অন্তর অন্তর সে দেশে আসত। বিদেশে একদিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে সেখানকার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে শরিফুলের শরীরে এইচআইভির জীবাণু ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। দেশে ফিরে পরিবারের কাছে রোগটি গোপন করে সে। এভাবেই কেটে যায় এক বছর। সালেহা অন্ত:সত্তা হয়। দিনদিন শরিফুলের শারীরিক অবস্থার অবণতি হতে থাকে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্ত্রী সেখানেই প্রথম জানতে পারেন তার স্বামী এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত ততদিনে, করিমনের শরীরেও বাসা বেধেঁ ফেলেছে ঘাতক ব্যাধি এইচআইভির জীবাণু। অন্তঃসত্তা অবস্থাই হাসপাতালে স্ব^ামীর সেবা করতে থাকে সে। হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থাই শরিফুল মারা যায়। ভুক্তভোগী করিমন এই প্রতিবেদককে জানায়,স^ামীর মৃত্যুর পর লাশ কবরে রেখে বাসায় আসতে না আসতেই এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত হওয়ার অপরাধে শ^শুড় বাড়ির লোকজন তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়ই লাঞ্চনা-গঞ্জনা মাথায় নিয়ে সেদিনই সে খালি হাতে নিজ ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হয় সে। বাড়ি ছাড়ার এক সপ্তাহ পরেই একটি এনজিও এর সহায়তায় কন্যা সন্তান জš§ দেয় করিমন। বড় সন্তান ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াশুনা করতো। টাকার অভাবে ছেলের পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়। তার শিশু সন্তানটি নিয়ে সে তার বাবার বাড়ি উঠলেও অভাবের কারণে শিশুটিকে দুধ কিনেও খাওয়াতে পারেনি সে। সালেহা বলেন,‘আপনজনদের এমন নিষ্ঠুর আচরণ দেখে মানসিক ভাবেই একবারে ভেঙ্গে পড়েছিল আমি। এইচআইভি/এইডস নিয়ে কাজ করা একটি এনজিও সহায়তায় ছোট একটি চাকুরি পাই, দু’টি সন্তান নিয়ে বর্তমানে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি আমি।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সালেহার মতো নিরীহ নারীরা প্রতিনিয়তই এইচআইভি জীবাণু বহনকারী বিদেশ ফেরত স্বামীর  স্থ্রীরা এই রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। স্বামীর ভুলে সামাজিক কলঙ্ক ও কালিমা মাথায় নিয়ে মানববেতর একটি কঠিন জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন অসহায় নারীরা।
দেশে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ এইডস রোগ সংক্রমিত হচ্ছে বিদেশ প্রত্যাগত এইচআইভি জীবাণুবাহী ব্যাক্তিদের মাধ্যমে। এইডস আক্রান্ত হওয়ার কারণে বিদেশ খেকে বহিষ্কৃত হলেও অনেকেই দেশে এসে রোগ গোপন রেখে জীবনযাপন করছেন। অসর্কতায় মারাত্মক সংক্রামক এ রোগ তাদের স্ত্রী এবং অনাগত সন্তানদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিদেশি শ্রমিকরাও এইডসের জীবাণু নিয়ে ঢুকে পড়ে নির্বিঘেœ কাজকর্ম চালাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো রোগীরা তাদের রোগ সম্পর্কে জানার পরেই আত্মগোপন করছে। সাজিকতার কারণে আইচআইভি আক্রান্ত অনেক রোগী রোগাক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি চেপে যান। এই অবস্থায় না জেনে-না বুঝে অনেকে বিয়েও করছে। এতে তাদের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যেও রোগটি ছড়ানোর আশঙ্কা দিনদিন বেড়েই চলেছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এইচআইভি/এইডস বিষয়ে এক্সপার্ট ডাঃ জয়নুল আবেদীন। বিমান, স্থল, নৌ-বন্দর ও দীর্ঘ সীমান্ত-কোথাও এ ঘাতক ব্যাধিযুক্ত যাত্রীদের শনাক্ত করার বা এ বিষয়ে সতর্কতামূলক কোনো ব্যবস্থা নেই বলেও তিনি জানান।
দেশে বর্তমানে শনাক্তকৃত এইচআইভি সংক্রমিত ব্যাক্তি দুই হাজার ৪৯৫ জন। এইডসের রোগী ৪৭৬ জন। আর এ পর্যন্ত এইডস রোগে মৃতের সংখ্যা ১৬৫। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মানুষ এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত ধারনা করা হলেও বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা। এছাড়া এদেশে এইচআইভি পরীক্ষার নিয়মিত কোনো কার্যক্রমও নেই। ফলে এইচআইভি বা এইডস রোগীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। জাতিসংঘের এশিয়া বিষয়ক এইডস কমিশনের প্রতিবেদনে (রিডিফাইনিং এইডস ইন এশিয়া, ২০০৮) এইডসের প্রকোপ কম অথচ ধীরে হলেও প্রকোপ বাড়ছে এমন কিছু দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশের নামও আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এইচআইভি অ্যান্ড এইডস টার্গেটেড ইন্টারভেনশন বা ‘হাতি’ প্রকল্কপ্প ছয় মাস খুঁড়িয়ে চলার পর ১ জুলাই থেকে একেবারে বল্পব্দ হয়ে গেছে। সেবাদান প্রকল্কপ্প বল্পব্দ হয়ে যাওয়ার কারণে সংকদ্ধমন আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলেও তারা জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এইচআইভি ছড়ানোর ক্ষেত্রে যৌনকর্মী ও ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপ। ২০০৮ সালে দেশের ৫৫টি জেলায় পরিচালিত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ভাসমান যৌনকর্মীর সংখ্যা ২৭ হাজার ১৩৪ জন, হোটেল ও বাসাবাড়িতে ২৬ হাজার ৫৩৩ জন এবং বিভিন্ন পতিতালয়ে রয়েছে আরো প্রায় ৪ হাজার যৌনকর্মী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ যাদের বয়স ২৫ বছরের নিচে সবচেয়ে বেশি এইচআইভি বা এইডসের ঝুঁকির সম্মুখীন। এদের ৫০ শতাংশ কিভাবে এইডস প্রতিরোধ করা যায় তা জানলেও ৫৫ শতাংশ যুবক অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে কনডম ব্যবহার করে না। যদিও ২২ শতাংশ তরুণ ও ২ শতাংশ তরুণীর বিবাহপূর্বক যৌন মিলন করে থাকে। যুব সমাজের মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ পুরুষ এবং ১ দশমিক ১ শতাংশ নারী নিজেদের এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করে। ৫০ শতাংশ তরুণ ও ৭৫ শতাংশ তরুণীর যৌন রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারনা নেই। যদিও যুব সমাজের ২৫ শতাংশের নানা রকম যৌন রোগ রয়েছে। এছাড়া যৌন রোগ সম্পর্কে তাদের বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণাও রয়েছে।
নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক আফরোজা পারভীন বলেন, বাংলাদেশে এইডস রোগীদের একটা বড় অংশ সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছে না। জাতীয় এইডস /এসটিডি কর্মসূচিতে তাদের জন্য কোনো ওষুধও বরাদ্দ নেই। তাদের জরুরি রক্ত-পরীক্ষার সুযোগ অপ্রচুল। বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস আক্রান্তরা সরকারের কাছ থেকে কোনো ওষুধ পায় না। ওষুধ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য যাদের নেই, তারা এনজিও ওপর নির্ভরশীল। তিনি আরো বলেন, দেশে এইচআইভি/এইডস মোকাবিলায় সবচেয়ে আগে দরকার নীতিমালা। আর দরকার মানুষকে সচেতন করার জন্য অবাধ তথ্যপ্রবাহ। নীতিমালার ভিত্তিতে কর্মপরিকল্পনা গ্রহন করলে এবং মানুষ সচেতন হলে এ দেশে এইচএইভি/এইডসের প্রকোপ সব সময়ই নি¤œমাত্রায় রাখা সম্ভব হবে মনে করেছেন আফরোজা পারভীন।
বিশে^ ১৯৮১ সালে ঘাতক এই ব্যাধি ধরা পড়ে। বাংলাদেশে প্রথম বিদেশ প্রত্যাগতদের মধ্যেই এইডস রোগী শনাক্ত হয়। ১৯৮৯ সালে সিলেটে তার সন্তান পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন মধ্যপ্রাচ্য ফেরত। তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীও এই রোগে মারা যায়। তারপর ১৯৯১-এর আগস্ট মাসে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায় একই সঙ্গে তিনজন এইডস রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। দুবাইতে কর্মরত থাকা অবস্থায় চিকিৎসাকালে তাদের শরীরে এইডসের জীবাণু ধরা পড়ার পর তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এদের একজনকে পুলিশ প্রহরায় চিকিৎসা দেয়া হলেও বাকিরা আত্মগোপনেই মৃত্যুবরণ করে। তবে এর আগেই ১৯৮৫ সালে জাতীয় এইডস কর্মসূচির আত্ততায় এইচআইভি ভাইরাস প্রতিরোধে কর্মসূচি গ্রহন করা হয়।
জাতিসংঘ সূত্রে জানা যায়, বর্তমান বিশে^ ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ এইচআইভি ও এইডস সংক্রমিত অবস্থায় বসবাস করছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার মানুষ এইচআইভি ও এইডস সংক্রমিত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে প্রায় ৬ হাজার। অন্যান্য দেশের মধ্যে আমাদের প্রতিবেশী ভারতের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। জাতিসংঘের পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, ২০০৬ সালে ভারতে এইচআইভি ও এইডস সংক্রমিতদের সংখ্যা ছিল ৫৭ লাখ।
২০০৫ সালে এশিয়া প্যাসিফিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখানো হয়, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং থাইল্যান্ডে সর্বমোট ৭৬২ জন এইচআইভি সংক্রমিতদের মধ্যে অর্ধেক এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তিবর্গ বিবরণ দেন যে, তারা স^াস্থ্য সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার।
এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত একজন ব্যক্তিরা নিজের অভিজ্ঞতায় বলেন, তারা সাধারণ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। তিনি জানান, খুলনা জেলার তিনজন এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়লে কোনো হাসপাতাল তাদের চিকিৎসা করতে রাজি হয়নি। তিনি এইডসে আক্রান্তদের জন্য পৃথক একটি হাসপাতাল তৈরির দাবি করেন। ###