ভারতীয় নারীর ঋতু–জাগরণ নিয়ে অস্কার জিতলেন ইরানি পরিচালক

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৯
0

ডকু–ফিচারে অস্কার জিতল ভারতীয় নারীর ঋতু–জাগরণ
‌‌‌‌‌লস এঞ্জেলেসের নক্ষত্রখচিত কোডাক থিয়েটারে আবেগে, উচ্ছ্বাসে, আত্মবিশ্বাসে ঝরঝর করে প্রযোজক গুণীত মোঙ্গা বলছিলেন, ‘‌খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এর জন্য কোনও লক্ষ্যপূরণই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। ভারত এবং তামাম দুনিয়ার মেয়েদের কাছে যেন এই বার্তা খুব স্পষ্ট এবং জোরালোভাবে পৌঁছোয়। ঋতুচক্র একটি বাক্যের শেষ। শিক্ষার নয়। এখন আমাদের হাতে অস্কার। চলো পৃথিবীটা পাল্টে দিই‌!‌’‌
গুণীতের সেই উচ্চারণ শুনল তামাম বিশ্ব। উত্তরপ্রদেশের হাপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম কাঠিকেরাও শুনল কি?‌
ওই অজগাঁয়ে ঋতুচক্রের কারণে মেয়েদের অস্পৃশ্য করে রাখা, স্বাভাবিক যাপন থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রবণতায় কত মেয়ে স্কুলছুট হয়েছে, অসুস্থ হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই।

কাঠিকেরার সেইসব মেয়েই ‘‌পিরিয়ড: এন্ড অফ সেনটেন্স’‌ তথ্যচিত্রের প্রেরণা। যাঁদের আন্দোলনের সুবাদে ২৫ মিনিটের এই সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র পৃথিবীর অন্য সব ছবিকে ছাপিয়ে তথ্যচিত্র বিভাগে জিতে নিল সেরার অস্কার। ইরানি–‌মার্কিনি পরিচালক রায়কা জেতাবচি, প্রযোজক গুণীতের সুবাদে ফের এক দশক পর অস্কার এল ভারতে। ২০০৯ সালে এদেশের পটভূমিকায় ব্রিটিশ পরিচালক ড্যানি বয়েল পরিচালিত ‘‌স্লামডগ মিলিওনিয়ার’‌–‌এ সুর করে জোড়া অস্কার পেয়েছিলেন ‘‌মাদ্রাজের মোৎসার্ট’‌ এ আর রহমান। এদিন অস্কার অনুষ্ঠানে বসে ‘‌পিরিয়ড.‌.‌.‌’‌–‌এর জয়যাত্রা দেখলেন তিনিও।
মনোনয়নে ছিল ‘‌ব্ল্যাকশিপ’‌, ‘‌এন্ড গেম’‌,‌‌ ‘লাইফবোট’‌ এবং ‘আ নাইট অ্যাট দ্য গার্ডেন’‌।

তাদের হারিয়ে–দেওয়া ভারতের এই তথ্যচিত্রে ছিলেন অরুণাচলম মুরুগানাথম, যাঁর জীবনভিত্তিক ‘‌প্যাডম্যান’‌ ছবির উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বলিউডের তারকা অক্ষয় কুমার। এই তথ্যচিত্রেও ভারতের গ্রামে–গ্রামে মহিলাদের সস্তার স্যানিটারি প্যাড পৌঁছে দিতে তাঁর নিরলস কর্মকাণ্ডের কথা আছে।
‘‌পিরিয়ড.‌.‌.‌’‌–‌এর ভাবনার সূত্রপাত ৭ বছর আগে। যখন কাঠিকেরার ঋতুমতী মেয়েদের ওই দিনগুলোতে স্বস্তি দিতে আর্থিক জোগান এবং প্যাড তৈরির মেশিন দিয়ে ঋতুকালীন সচেতনার কাজ শুরু করেন লস এঞ্জেলেসের ওকউড স্কুলের ইংরেজি শিক্ষিকা মেলিসা বার্টন এবং তাঁর ছাত্রীরা। তাঁদের সংস্পর্শে আসেন গুণীত। সেই সূত্রেই ভাবনা— এ বিষয়ে একটা ছবি করলে সচেতনতা আরও বাড়ে। স্কুলছুট মেয়েদের সংখ্যা কমে। মেলিসা এবং তাঁর ছাত্রীদের সহযোগিতায় এবং অনুদানে দিনের আলো দেখেছে ‘‌পিরিয়ড.‌.‌.‌।’‌ বার্তা দিয়েছে— ঋতুমতী মেয়েরা অশুচি নন। এর আগে ‘‌লাঞ্চবক্স’‌,‌ ‘‌মাসান’‌–‌এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ছবির প্রযোজনা করেছে গুণীতের সংস্থা ‘‌শিক্ষা এন্টারটেনমেন্ট’‌। কীভাবে একটি স্যানিটারি প্যাড ভেন্ডিং মেশিন হাপুরের মহিলাদের স্বনির্ভর করেছে, তাঁরা নিজস্ব ‘‌ফ্লাই’‌ ব্র্যান্ডের স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি এবং বিপনন করছেন, তারও আখ্যান গুণীতের এই ছবি।‌
ভারতের তথ্যচিত্রের বিশ্ব দরবারের স্বীকৃতিতে উচ্ছ্বসিত বলিউড। অনুষ্ঠানে বসেই এই ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া।

তাঁর টুইট, ‘‌ঋতুচক্র নিয়ে একটি ছবি সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কার পেল!‌ ‌

ছবির টিম এবং আমার সাহসী বন্ধু গুণীত মোঙ্গাকে অভিনন্দন’‌। ‘‌প্যাডম্যান’‌ ছবির পর অক্ষয়ের ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্যানিটারি ন্যাপকিন থেকে জিএসটি তুলে নিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। তাঁর টুইট, ‘‌গুণীত মোঙ্গা এবং তাঁর সহকর্মীদের হার্দিক অভিনন্দন। এই বিষয়ে আলোচনার দরকার ছিল। এই জয় প্রাপ্য ছিল’‌।
‘‌পিরিয়ড যেন একটি বাক্যকে শেষ করে। মেয়েদের শিক্ষা নয়। এটাই আজ রাতের সেরা বয়ান’‌— টুইটারে প্রশংসা হলিউড তারকা রিজ উইদারস্পুনের।

পদ্মালক্ষ্মী টুইটারে লিখেছেন,‘ঋতুকালীন সচেতনতার একটি অসাধারণ ছবি। এখনও না দেখে থাকলে অবশ্যই দেখুন’‌। আপ্লুত অনুপম খেরের বার্তা, ‘জয় হো!‌ ঋতুচক্র নিয়ে ভারতভিত্তিক একটি ছবি সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কার পেল।’‌ পরিচালক–প্রযোজক অনুরাগ কাশ্যপ টুইট করেছেন, ‘‌জয়ের জন্য গুণীতকে অভিনন্দন!‌’‌ গুণীত ও তাঁর সহকর্মীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় মহিলা ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী মানেকা গান্ধীও।
তবে যাঁদের জন্য এই ছবি, তাদের সেরা বার্তাটি দিয়ে দিয়েছেন ছবির প্রযোজক গুণীত নিজেই।

অস্কারপ্রাপ্তির পর তাঁর টুইট, ‘‌আমরা জিতেছি। বিশ্বের সব মেয়েদের প্রতি, জেনে রাখো তোমরা সবাই দেবী!‌’‌

LEAVE A REPLY