মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাতিল করে সকল গ্রেডে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখতে হবে

আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০১৮

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করে সরকারি চাকুরিতে সকল গ্রেডে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রেখে প্রিলিমিনারী থেকে তা বাস্তবায়ন করার দাবি জানিয়েছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর কমিটি।

সংগঠনের সভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদুজ্জামান শাহীন এবং ঢাকা মহানগর সভাপতি শহীদ সংসদ সদস্য নুরুল হক হাওলাদারের কন্যা জোবায়দা হক অজন্তা আজ এক বিবৃতিতে বলেন, মন্ত্রিসভার আজকের সিদ্ধান্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না।

এই সিদ্ধান্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের হৃদয়ে আঘাত করেছে। কোটা বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত সরকারের উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশাসন গড়ে তোলার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

নেতৃবৃন্দ বলেন, জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে যে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর নাগরিক হয়ে থাকতে পারে না। বৈষম্য দূর করার জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছেন।

আর আজ তাদের পরবর্তী প্রজন্মরাই চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তা একদিকে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চরম অপমানের অপর দিকে সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্গন। স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের সন্তানরা মুক্তিযোদ্ধাদের পরবর্তী প্রজন্মের মাথার উপর বসে নির্লজ্জ নৃত্য করবে, তা দেখার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা জাতির পিতার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ করেনি। জীবন সায়াহ্নে মুক্তিযোদ্ধাদের এই চরম অপমান কোনভাবেই মেনে নেয়া হবে না।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে সাধারণ ছাত্র নামধারী কিছু দিকভ্রান্ত যুবককের দাবি মেনে নিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী এই সুপারিশের ফলে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের দীর্ঘদিনের আকাঙ্খার প্রতিফলন হয়েছে।
এরআগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে “আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান” সংগঠন আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মর্যাদা সমুন্নত রাখার ব্যাপারে আন্তরিক ও সচেতন থাকলেও প্রশাসনের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা একশ্রেণীর স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকর্তা প্রতিটি পদক্ষেপে মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করার ব্যাপারে সচেষ্ট রয়েছে। সাম্প্রতিক সচিব কমিটির সুপারিশ এরই একটি নতুন সংস্করণ।

প্রশাসনের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতাবিরোধীরা অনেকদিন থেকে এটাই চেয়েছিল যে, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা যাতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকুরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে না পারে। তারা যাতে সারাজীবন পিয়ন, দারোয়ান ও সুইপারের মতো নি¤œপদে চাকুরি করে।

সংগঠনের সভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেনের সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় সদস্য জোবায়েদ আলমের পরিচালনায় কর্মসূচিতে বক্তৃতা করেন সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও শহীদ এমপি নুরুল হক হাওলাদারের কন্যা জোবায়দা হক অজন্তা, সাধারণ সম্পাদক রাশেদুজ্জামান শাহীন, কোষাধ্যক্ষ ও দপ্তর সম্পাদক আহমাদ রাসেল,

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের দপ্তর সম্পাদক রাসেল আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ অনলাইন কমান্ডের সভাপতি মো. নাজমুল হক, সাধারণ সম্পাদক লামিয়া খানম, প্রচার সম্পাদক মো. স্বপন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. সোহাগ ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধার প্রজন্ম খালেদুজ্জামান ফারসিম।

বক্তারা বলেন, ৭৫ সালে জাতির পিতা হত্যার পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র হয়েছে। পরবর্তীতে ২০০১ সালের পর মুক্তিযোদ্ধা কোটা আবারো ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের পর ২৯ বছর কোটায় কোন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের চাকুরি হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পরবর্তী ২৯ বছর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিস্পেষিত হয়েছে। কোটা সংস্কার বা বাতিল করার আগে এই ২৯ বছরের হিসাব দিতে হবে। এ ছাড়া এই ৩০% কোটা তাদের আত্মমর্যাদা ও সম্মানের সাথে জড়িত। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানের দিকে তাকিয়ে হলেও এই কোটা বহাল রাখা জরুরি।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা একটি অসাম্প্রদায়িক জঙ্গিমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন স্বাধীনতা বিরোধীমুক্ত করতেও সরকারের প্রতি আহবান জানান।
মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত বাতিলসহ ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন, দাবিগুলো হলো-

১) জাতির পিতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটুক্তিকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। ২) বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার সুরক্ষা আইন করতে হবে।

৩) ৩০% মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রেখে তা বাস্তবায়নে কমিশন গঠন করে প্রিলিমিনারী থেকে কোটা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। ৪) মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চলমান সকল নিয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত রাখাসহ সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কোটার শূন্য পদ সংরক্ষণ করে বিশেষ নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। ৫) ১৯৭২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩০% মুক্তিযোদ্ধা কোটায় শূন্য পদগুলোতে চলতি বছরেই নিয়োগ দিতে হবে।

৬) বীর মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন প্রবাসী সরকারের প্রথম সেনাবাহিনী, তাই তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে পেনশন, বোনাস, রেশনসহ সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

৭) রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে স্বাধীনতাবিরোধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্তসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের উত্তরসূরীদের সকল চাকুরিতে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে এবং স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠন জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করতে হবে।

৮) ঢাবি ভিসির বাসভবনে হামলাসহ দেশব্যাপী নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী স্বঘোষিত রাজাকারদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে এবং ৯)মুক্তিযোদ্ধার সন্তানসহ অন্য সকলের জন্য চাকুরিতে প্রবেশের বয়সসীমা তুলে দিতে হবে।