মহিলা পরিষদের ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে “নারী আন্দোলন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম” বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

আপডেট: এপ্রিল ৭, ২০১৯
0

নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ৪৯তম বছরে পদার্পণ করেছে। এবার প্রতিষ্ঠবার্ষিকীতে সংগঠনের স্লোগান হচ্ছে- ’আসুন যৌন হয়রানি, ধর্ষণসহ নারী ও কন্যা নির্যাতন এবং সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলি’। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে আজ ৭ এপ্রিল ২০১৯ রবিবার বিকাল ৩টায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সেগুন বাগিচাস্থ সুফিয়া কামাল ভবন মিলনায়তনে ‘নারীআন্দোলন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’ বিষয়ে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি নারীনেত্রী আয়শা খানম। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম। আলোচক ছিলেন ডাটাসফ্ট-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ডাকসুর প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মাহবুব জামান, ঢাকা ইউনিভার্সিটি রিচার্স সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাইফুল্লাহ সাদেক, ফ্রিল্যান্সার হাবিবুর রহমান সোহন, ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রী শাফকাত আলম আঁখি, মহিলা পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক কানিজ ফাতেমা টগর। অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ব্যান্ড দল এফ মাইনর।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সকলকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন আমরা এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী একটু ভিন্নভাবে পালন করছি। নারী আন্দোলনে কিভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে যুক্ত করতে পারি আজকে আমরা সেটা নিয়ে আলোচনা করবো। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ যে বহুমূখি কর্মসূচি পালন করে থাকে তা পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্য নিতে পারি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটো দিকই আছে। নেতিবাচক বিষয়ে আামদের সচেতন থেকে এই মাধ্যমকে কিভাবে ইতিবাচকভাবে নারী আন্দোলনে যুক্ত করা যায় সেটা আমাদের ভাবতে হবে।

সভায় সংগঠনের সভাপতি আয়শা খানম বলেন ২০০৮ এর একটি স্লোগান ছিল এবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে কাজ করতে হবে। বিজ্ঞানের সব কিছু ক্ষতিকর না, এর ইতিবাচক দিকও আছে। মহিলা পরিষদ কিভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাজ করতে পারে তা ভাবতে হবে। আমাদের সমাজে নারীদের যে ত্যাগ তার মূল্যায়ন করতে হবে। আমাদের প্রশিক্ষণ কারিকুলামে তা অর্ন্তভুক্ত রতে হবে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে আরও অর্ন্তভুক্ত করতে হবে এবং তাদের সচেতন করতে হবে। তরুণরা পরিবারে বেশি বাধার সম্মূখীন হয় সেই বাধাকে অতিক্রম করতে আমাদের আন্দোলন প্রতি ঘরে ঘরে নিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারবিধি আমাদের যথাযথভাবে জানতে হবে। আগামী বছর আমাদের সংগঠনের ৫০ বছর পূর্ণ হবে। সংগঠনের কিছু দুর্বলতা আছে তা আমদের কাটিয়ে উঠতে হবে। এই লক্ষ্যে নারী সংগঠকদের সাথ নিয়ে নারী আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, ‘নারী আন্দোলন মানে নারীবাদ’Ñ এই স্লোগান নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব।

ডাটাসফ্ট-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাহবুব জামান বলেন আমি কাজ করি তরুণদের সঙ্গে। তাদের সাথে কাজ করতে ভাল লাগে তারা অনেক তথ্য প্রযুক্তির সব ব্যবহার ভাল বুঝে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন বয়সের ছেলে মেয়ে অংশগ্রহণ করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মানুষ এখন সবাইকে সবাই চিনে এবং জানে। তবে সব জিনিসের একটা নেতিবাচক দিক তাকে আবার ইতিবাচক দিক রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া ই-কমার্সের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। তিনি বলেন, আমরা তো বেগম রোকেয়া, বেগম সুফিয়া কামালকে দেখিনি কিন্তু তাদের একটা বাণী বা ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হতে পারি। কিন্তু অন্য বাংলাদেশের নারী আন্দোলন তথা মহিলা পরিষদের তেমন কিছু অনলাইনে পাওয়া যায় না। তাই এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নেতৃত্ব দিতে পারে।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি রিচার্স সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাইফুল্লাহ সাদেক বলেন আদিম যুগে নারীরা যখন কৃষি কাজের উদ্ভাবন করেছেন তখন থেকেই নারী আন্দোলনের শুরু। প্রতিটি সভ্যতায় রয়েছে নারীদের উল্লেখ্যযোগ্য অবদান। সেখানে পুরুষদের সহযোগিতা ছিল চোখে পড়ার মত। যখন থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শুরু তখন থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারী আন্দোলন যুক্ত হয়। #মিটু বালাদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সেখানে নারীরা তাদের নির্যাতনের কথা সাবলীলভাবে বলছেন যা আগে হয়ত কখনো কারো সাথে শেয়ার করেনি। তিনি বলেন আমরা চাই নারী আন্দোলনের এই ধারা বন্ধ হয়ে যাক। সমাজ থেকে পিতৃতান্ত্রিকতা দূর হোক।

ফ্রিল্যান্সার হাবিবুর রহমান সোহন বলেন, সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম বাস্তব জগত নয় তবে এর প্রতিফলন বাস্তব জগতে আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিভাবে নারী আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়া যায় এই বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কাজ করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন না তাদের চেয়ে অনেক বেশি সহমর্মী হন। তার প্রতিফলন দেখা যায় বাস্তব জীবনে। আবার এর বিপরীত দিকও চোখে পড়ে যা খুবই দুঃখজনক। অনেকেই আছেন যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন আন্দোলনে যুক্ত থাকেন কিন্তু বাস্তবে কোন আন্দোলনে তাদের ডাকলে সাড়া পাওয়া যায়না।

ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রী শাফকাত আলম আঁখি বলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ যে কর্মসূচিগুলো পালন করে তা যদি ফেসবুক লাইভ-এ দেখানো সম্ভব হয় তাহলে সকল সংগঠক কর্মীর মাঝে বার্তাগুলো সহজে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীনেত্রীদের গুরুত্বপর্ণ আলোচনাগুলো থাকা খুবই প্রয়োজন।

মহিলা পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক কানিজ ফাতেমা টগর বলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুফল কুফল উভয় দিকই আছে। দুটো দিক বিবেচনায় রেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নারী আন্দোলনে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের একটি ইউটিউব চ্যানেল আছে সেখানে মহিলা পরিষদের কার্যক্রম নিয়ে ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ দেয়া আছে। নারী আন্দোলনকে কুসংস্কারমুক্ত ও বিজ্ঞানমনস্ক করতে হলে তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার।

সভায় আলোচকবৃন্দ মহিলা পরিষদের একটি অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ, সংগঠনের সংগঠক ও কর্মীদের নিয়ে একটি ফেসবুক গ্রুপ থাকতে পারে। মহিলা পরিষদের একটি ইউটিউব চ্যানেলে মানসম্মত কন্টেন্ট নির্ধারণ করে আপলোড করতে হবে। সংগঠনের ওয়েবসাইটে একটি ব্লগ যুক্ত করা যেতে পারে যেখানে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের লেখা দেয়া যেতে পারে। এছাড়াও সংগঠনের একটি টুইটার একাউন্ট থাকতে পারে যেকানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে তাদের মতামত জানাতে পারেন।

মুক্ত আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন হুমায়রা, গুলশান, ফারহানা হেলাল, মেহতাব, নাজিয়া নওশিন, আদৃতা ইসলাম সাথীসহ আরো অনেকে। বক্তারা বলেন মহিলা পরিষদকে সামাজিক গণমাধ্যমে নারীর বিভিন্ন বিষয়ে আরো সক্রিয় অংশগ্রণের মাধ্যমে নারী আন্দোলনকে অগ্রসর করে নেয়ার বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদে সংগঠন সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম।
অনুষ্ঠানে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির নেত্রীবৃন্দ, তৃণমূলের সংগঠক তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিসহ প্রায় দেড় শতাধিক উপস্থিত ছিল।

LEAVE A REPLY