রাষ্ট্র কি জবাব দেবেন- ছেলেটির কি দোষ?

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২০
0

সালেহ আকন:
সকালে নির্বাচনী সংবাদ সংগ্রহ করতে হবে বলে কেনো যেনো সারারাত ঘুম হয়নি। ফজরের নামাজ আদায় করে ভোর সাতটায় এককাপ চা আর এক টুকরো টোষ্ট বিস্কুট খেয়ে বাসা থেকে বের হলাম। সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সামনে গিয়ে দেখি সুমন সেখানে উপস্থিত। ছোটদের মধ্যে আমি যাদেরকে স্নেহ করি তারমধ্যে ও একজন।

নির্বাচন নিয়ে আগেই খানিক আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। যে কারণে একা একা সংবাদ সগ্রহে না গিয়ে তিনটি গাড়ী বহরের একটি দলে অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাই। আটটার দিকে আমাদের গাড়ীটি মালিবাগের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। এরও আধাঘন্টা আগে থেকে নানা অনিয়ম আর টুকটাক সহিংসতার খবর আসছিলো। পাত্তা দেইনি।

মালিবাগ হয়ে খিলগাঁও এলাকায় গিয়ে কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে নানা অনিয়ম চোখে পড়লো।
সরকার সমর্থীত প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের নানা হম্বিতম্বি চোখে পড়লো। পাত্তা দেই নি।

হঠাৎ শুনলাম যাত্রাবাড়িতে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে মারামারি ছুটে গেলাম। যেতেযেতে সব থেমে গেছে।
নিজেদের মধ্যেই ঝামেলা। একজন সরকার সমর্থক, আর অপরজন সরকারী দলেরই লোক; কিন্তু বিদ্রোহী।

ওখানে কাজ শেষ হতে না হতেই শুনলাম রায়েরবাজারে অস্ত্রের মহড়া চলছে।
সরকার সমর্থীত কাউন্সিলর প্রার্থী মোহাম্মদ হোসেন খোকনের লোকজন মহড়া দিচ্ছে।
আমাদের নিয়ে তিনটি গাড়ী ছুটলো রায়েরবাজারের উদ্দেশ্যে।

রায়েরবাজার সুলতানগঞ্জ সাদেক খান সড়কে ওঠা মাত্রই চোখে পড়লো অস্ত্রধারীদের আস্ফালন। বুকে ঝোলানো নৌকা প্রতীক আর টেফিনক্যারিয়ার প্রতীকের কার্ড। হাতে দেশীয় অস্ত্র। এই দৃশ্য দেখে কোন সাংবাদিকই ছবি ধারণ না করে থাকতে পারবেননা। আমি নিজেও পারিনি। ভিটিও করলাম কয়েক সেকেন্ডের। অবশ্য গাড়ীতে বসে, গোপনে। সুমন গাড়ী থেকে নেমে সামনা-সামনি ভিডিও করতে গেলো। বাধা দিলাম। গাড়ীতে তুলে নিলাম। অস্ত্রধারীরা চলে গেলো।

বেলা তখন ১১ টা। আমরা দলবদ্ধভাবেই ছিলাম। ক্ষুধায় সবাই কাতর। কয়েকজন হোটেলে ঢুকে গেলো। ওই হোটেলটি আমার পছন্দ হচ্ছিলো না বলে আমি অন্য হোটেল খুঁজতে গেলাম। যাওয়ার সময় সুমনকে বললাম চল কিছু খেয়ে আসি। ও গেলো না। আমার সাথে গেলেন হালিম মোহাম্মদ ভাই আর মেহেদী।

নাস্তা প্রায় শেষ; এমন সময় সুমন ফোন দিলো ‘ভাই কোথায়? আসেন আমরা বের হবো।’ বললাম নাস্তা শেষের দিকে আসছি। এর আধা মিনিট পরেই ফোন করলো ড্রাইভার। স্যার আপনাদের একজনকে কোপাচ্ছে। আমার হোটেলর বিল শোধ করতে করতে মেহেদী আর হালিম ভাই বের হয়ে গেলেন। বাইরে বের হয়ে তাদেরকে আর খুঁজে পাচ্ছি না। তখন পর্যন্ত জানিনা কে আহত হয়েছে। টিমের সবাইকে ফোন দিচ্ছি কেউ ফোন রিসিভ করছেন না। এক পর্যায়ে জিলানী মিলটন ফোন ধরে জানালেন সুমন আহত। তাকে শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

অনেক দিন থেকেই সাংবাদিকতা করেন সুমন। বছর দুই হবে মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানে বাবা-মা দু’জনকে হারিয়েছে। এরপর ও নিজেও হারিয়ে যায় পেশা থেকে। বাড়িতে ছিলো দীর্ঘদিন। পেশাটা ছেড়ে দেয়ারই পরিকল্পনা করেছিলো। শুনেছি মেহেদী আজাদ মাসুম ভাইয়ের অনুরোধে ও আবার ঢাকায় আসে। পেশায় যোগ দেয়। একজন প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক যাকে বলে ওর মধ্যে আমি তা দেখেছি।

আমি এবং টিমের অন্যরা বাধা দেয়ার পরেও আমার মনে হয় পেশাদারিত্বের সেই জায়গা থেকেই সুমন আবারো অস্ত্রধারীদের ভিডিও করতে গিয়েছিলো। ওর পাশে যারা ছিলেন তারা সে কথাই বলেছেন। ভিডিও করার সময় দুর্বৃত্তরা ওর উপর হামলে পড়ে!

শিকদার মেডিকেলের ডাক্তাররা পরামর্শ দেন দ্রুত ওকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে। আমি যথন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই তখন ওর সিটিস্ক্যান চলছিলো। ওর জ্ঞান নেই। সিটি স্ক্যান শেষে ওকে নেয়া হলো হাসপাতালের ১০০ নম্বর ওয়ার্ডে। এরমধ্যে শ’খানেক সাংবাদিক সেখানে হাজির হলেন। কিছু সময় পড়ে ওর জ্ঞান ফিরলো। কথাও বললো। আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করলাম।

নানা আঘাতে বিধ্বস্ত সুমন। ঢাকায় একটি মেসে থাকে। অফিস থেকে মাত্র একদিন আগে ৩৫ হাজার টাকা দামের একটি মোবাইল সেট দিয়েছে। দুর্বৃত্তরা সেটিও নিয়ে গেছে। রাষ্ট্র কি বলবেন কি অপরাধ ছেলেটির। কেনো এমনভাবে ওকে মারা হলো। ও যদি মারা যেতো কি হতো? আমি বলবো কিছুই হতো না। যেমন হয়নি সাগর-রুনির হত্যাকান্ডে! হয়তো আমরা কেউ কেউ বিচারের দাবিতে রাস্তায় চিৎকার করতাম, আর কেউ কেউ সুমনের রক্তের উপর দিয়ে বড় নেতা হতেন, আখের গোছাতেন। সরি, আমি কাউকে মিন করে বলিনি।

ঘটনার পর র‌্যাবের ডিজি মহোদয়সহ অনেকেই সুমনকে দেখতে গিয়েছেন। ধন্যবাদ আপনাদের।আপনাদের প্রতি আমি এবং আমরা কৃতজ্ঞ। আরো কৃতজ্ঞ হবো যদি দুর্বৃত্তরা ধরা পড়ে। বিচারের মুখোমুখি হয়।

আমার লেখায় যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন; ক্ষমা করবেন।ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি এমন একটি ছবি আপলোড করার জন্য। কি করবো বলেন? এটাইতো বাস্তবতা!

## নির্বাচনী নিউজ সংগ্রহ করতে গিয়ে আজ আরো বেশ কয়েকজন সাংবাদিক মারধরের শিকার ও নাজেহাল হয়েছেন। আমি প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।##

লেখক : সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, সিনিয়র সাংবাদিক

LEAVE A REPLY