শামসুর রহমানের কবিতায় প্রতিবাদ ও ইতিহাস

আপডেট: আগস্ট ১৭, ২০১৭

নিজস্ব প্রতিবেদক: মুক্তিযুদ্ধের সময় শামসুর রাহমান যে দেশ ছেড়ে যাননি, তা নিয়ে জল্পনা কম হয়নি। জল্পনা কখনো কখনো কুৎসার রূপও নিয়েছে। যুদ্ধদিনে পরিবারের পাশে থাকা আর নিরাপদে ভারত-প্রস্থান—এই বিপরীত দুই টানে শামসুর রাহমান প্রথমটির পক্ষ নিয়েছিলেন। হুবহু এ রকম আরেকটি ঘটনার কথা বলেছিলেন ফরাসি দার্শনিক জাঁ পল সার্ত্রে। দ্বিতীয় মহাসমরের সময় নাৎসি জার্মানি ফ্রান্স দখলে নিয়ে নেওয়ার জন্য মুখেতীব্র প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। সে সময় দ্বিধাগ্রস্ত এক তরুণ পরামর্শ চাইতে এল সার্ত্রের কাছে। দেশের জন্য সেই তরুণ তার প্রাণ উৎসর্গ করতে চায়। কিন্তু সে ছাড়া তার বৃদ্ধা মায়ের যে কেউ নেই। সে কি তার অবলম্বনহীন মায়ের কাছেই থাকবে, নাকি দেশের জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিতে চলে যাবে? সার্ত্রে বলেছিলেন, এই দুই বিকল্পের মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠতর, সে প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে নেই। এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে এখনো হয়তো তর্ক চলবে। কিন্তু শামসুর রাহমান সেদিন যেসব কবিতা লিখেছিলেন, সেগুলোতে শুধু তাঁর নয়, বাঙালির সে সময়কার আবেগও স্থায়ী হয়ে রইল।

কবি শামসুর রাহমান ২০০৬ সালের ১৭ই আগস্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা বেজে ৩৫ মিনিটে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ঢাকাস্থ বনানী কবরস্থানে, নিজ মায়ের কবরের পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।
প্রতিবাদী কবি শামসুর রাহমান স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে বিদ্রুপ করে ১৯৫৮ সালে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল (পত্রিকা) পত্রিকায় লেখেন ‘হাতির শুঁড়’ নামক কবিতা। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যখন কারাগারে তখন তাঁকে উদ্দেশ্য করে লেখেন অসাধারণ কবিতা ‘টেলেমেকাস’ (১৯৬৬ বা ১৯৬৭ সালে)। ১৯৬৭ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করলে শামসুর রাহমান তখন সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান-এ কর্মরত থাকা অবস্থায় পেশাগত অনিশ্চয়তার তোয়াক্কা না করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের পক্ষে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন যাতে আরো স্বাক্ষর করেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান, আহমেদ হুমায়ুন, ফজল শাহাবুদ্দীন।

১৯৬৮ সালের দিকে পাকিস্তানের সব ভাষার জন্য অভিন্ন রোমান হরফ চালু করার প্রস্তাব করেন আইয়ুব খান যার প্রতিবাদে আগস্টে ৪১ জন কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী এর বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন যাদের একজন ছিলেন শামসুর রাহমানও। কবি ক্ষুদ্ধ হয়ে লেখেন মর্মস্পর্শী কবিতা ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি গুলিস্তানে একটি মিছিলের সামনে একটি লাঠিতে শহীদ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট দিয়ে বানানো পতাকা দেখে মানসিকভাবে মারাত্মক আলোড়িত হন শামসুর রাহমান এবং তিনি লিখেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি। ১৯৭০ সালের ২৮ নভেম্বর ঘূর্ণিদুর্গত দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় ও মৃত্যুতে কাতর কবি লেখেন ‘আসুন আমরা আজ ও একজন জেলে’ নামক কবিতা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবার নিয়ে চলে যান নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে। এপ্রিলের প্রথম দিকে তিনি লেখেন যুদ্ধের ধ্বংসলীলায় আক্রান্ত ও বেদনামথিত কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’।[৩] শামসুর রাহমান ১৯৮৭ সালে এরশাদের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে দৈনিক বাংলার প্রধান সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৮৭ থেকে পরবর্তী চার বছরের তিনি প্রথম বছরে ‘শৃঙ্খল মুক্তির কবিতা’, দ্বিতীয় বছরে ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা’, তৃতীয় বছরে ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা’ এবং চতুর্থ বছরে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবিতা’ লেখেন। ১৯৯১ সালে এরশাদের পতনের পর লেখেন ‘গণতন্ত্রের পক্ষে কবিতা’। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও জনমানুষের প্রতি অপরিসীম দরদ তাঁর চেতনায় প্রবাহিত ছিল। শামসুর রাহমানের বিরুদ্ধে বারবার বিতর্ক তুলেছে কূপমণ্ডূক মৌলবাদীরা। তাঁকে হত্যার জন্য বাসায় হামলা করেছে। এতকিছুর পরও কবি তাঁর বিশ্বাসের জায়াগায় ছিলেন অনড়।

বিংশ শতকের তিরিশের দশকের পাঁচ মহান কবির পর তিনিই আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ হিসেবে প্রসিদ্ধ। কেবল বাংলাদেশের কবি আল মাহমুদ এবং পশ্চিমবঙ্গের কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় বিংশ শতকের শেষার্ধে তুলনীয় কাব্যপ্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন বলে ধাণা করা হয়। আধুনিক কবিতার সাথে পরিচয় ও আন্তর্জাতিক-আধুনিক চেতনার উন্মেষ ঘটে ১৯৪৯-এ, এবং তার প্রথম প্রকাশিত কবিতা ১৯৪৯ মুদ্রিত হয় সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকায়। শামসুর রাহমান বিভিন্ন পত্রিকায় সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লিখতে গিয়ে নানা ছন্দনাম নিয়েছেন। সে গুলো হচ্ছে: সিন্দবাদ, চক্ষুষ্মান, লিপিকার, নেপথ্যে, জনান্তিকে, মৈনাক। পাকিস্তান সরকারের আমলে কলকাতার একটি সাহিত্য পত্রিকায় মজলুম আদিব (বিপন্ন লেখক) নামে কবিতা ছাপা হয় যা দিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট সমালোচক আবু সায়ীদ আইয়ুব।

স্বাধীনতার পরও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সোচ্চার আন্দোলনে শামসুর রাহমান তাঁর কবিতা সমর্পণ করেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর এ দেশ সমরতন্ত্রের বুটে চাপা পড়লে তিনি লিখেছিলেন ‘ইলেকট্রার গান’; পেট্রোডলারের আশকারায় সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে লিখেছেন ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’, এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারের গুলিতে নূর হোসেনের মৃত্যু হলে লিখলেন ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’। তাঁর কবিতা লিফলেট হয়ে মানুষের হাতে হাতে ফিরেছে; বহু পঙ্‌ক্তি রাতারাতি পেয়েছে প্রবচনের লোকপ্রিয়তা; উঠে এসেছে পোস্টারে, প্ল্যাকার্ডে, দেয়াললিখনে।

কিন্তু শুধু কবিতায় তো নয়, মানুষ হিসেবেও লিপ্ত হতে হয়েছিল শামসুর রাহমানকে। ১৯৭৫ সালের ৬ জুন বাকশালের একদলীয় স্বেচ্ছাচার প্রতিষ্ঠার সেই ঘোর নিদানকালে এক গরীয়ান দৃঢ়তায় যাঁরা এর বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি সেই মুষ্টিমেয় একজন। এরশাদ সরকারের সময় তাঁর লাঞ্ছনা চূড়ায় পৌঁছেছিল। শামসুর রাহমানের একের পর এক ঝাঁজালো কবিতায় রুদ্ধ এই কবি যশোপ্রার্থী সমর শাসক সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রিন্টার্স লাইন থেকে প্রধান সম্পাদক হিসেবে তাঁর নাম মুছে দেন। দাপটের পাশাপাশি প্রলোভনও তাঁকে কম দেখানো হয়নি। কবির মুখেই শুনেছি, তাঁকে রাষ্ট্রদূত করে প্যারিসে পাঠানোর লোভনীয় প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তিনি ভ্রুক্ষেপ করেননি। এরশাদের স্বৈরাচারের প্রতিবাদে চাকরি ছেড়ে নেমে এসেছিলেন জনতার মিছিলে।
আধুনিক বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) এক উজ্জ্বলতর জ্যোতিষ্ক। বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য বড় কবির মতো তিনিও ছোটদের জন্য অনেক ছড়া লিখেছেন। ‘এলাটিং বেলাটিং’, ‘ধান ভানলে কুঁড়ো দেব’, ‘গোলাপ ফোটে খুকির হাতে’, ‘লাল ফুলকির ছড়া’, ‘রংধনুর সাঁকো’, ‘নয়নার জন্য’, ‘হীরার পাখির গান’ ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য ছড়াগ্রন্ত’। প্রতিটি গ্রন্থের অধিকাংশ ছড়ার মধ্যেই ফুটে উঠেছে শিশুর প্রতি কবির অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দরদ। তাঁর ছড়ায় আছে ছোটদের মনভোলানোর রূপকথার কাহিনী, আছে স্বপ্নরাজ্যের হাতছানি। সেইসাথে আছে লৌকিক ছড়ার রূপ-রস ও সমাজমনস্কতা।

শামসুর রাহমানের সাতটি ছড়াগ্রন্থের মধ্যে প্রথম দু’টি (‘এলাটিং বেলাটিং’ ও ‘ধান ভানলে কুঁঁড়ো দেব’) ছড়াগ্রন্থের নামকরণ করেছেন লৌকিক জীবনযাত্রা থেকে। প্রথম ছড়ার বই ‘এলাটিং বেলাটিং’ দিয়েই শুরু করা যাক। এটি আসলে একটি লৌকিক খেলার নাম। কবি ছড়ার শুরুতে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তার মধ্যেও লৌকিক রূপ-রস-গন্ধ লক্ষণীয়

যারা বেড়ায় উড়ে পক্ষিরাজের পিঠে,
যারা জিরোয় বসে স্বপ্নবাড়ির ভিটে,
যারা ভেলকি বোঝে হঠাৎ মিলের ফাঁদের,
ফাঁদের ফাঁদের ফাঁদের।
(ছড়ার এ-বই : এলাটিং বেলাটিং)

লৌকিক বা আদি ছড়ার অকৃত্রিম রসকে সম্বল করে তিনি এগিয়ে নিয়েছেন তাঁর ছড়াগুলোকে। এ গ্রন্থের আরেকটি ছড়া যা লৌকিক ঢঙে লেখা-
আঁটুল বাঁটুল শামলা সাঁটুল শামলা গেছে হাটে
কুঁচবরণ কন্যে যিনি, তিনি ঘুমান খাটে।
খাট নিয়েছে বোয়াল মাছে, কন্যে বসে কাঁদে,
ঘটি-বাটি সব নিয়েছে কিসে তবে রাঁধে?
আর কেঁদো না আর কেঁদো না ছোলাভাজা খেয়ো,
মাটির উপর মাদুর পেতে ঘুমের বাড়ি যেয়ো।
(আঁটুল বাঁটুল ছড়া)

এ ছাড়া ‘জল-টুপটুপ’, ‘খোকন গেছে ক্ষীরসাগরে’, ‘জটিবুড়ির ছড়া’, ‘চরকাবুড়ি’, ‘খুকুমণির বিয়ে’- এই ছড়াগুলোর নাম থেকেই বোঝা যায় যে, আমাদের রূপকথার চরিত্র ও কাহিনী নিয়েই তিনি লৌকিক ঢঙে লিখেছেন এই ছড়াগুলো।