সরেজমিন তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর হেফাজত: ভোলার সহিংস ঘটনার জন্য পুলিশের ভূমিকাই দায়ী

আপডেট: নভেম্বর ৪, ২০১৯
0

ইসলাম অবমাননার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভোলায় সহিংস হতাহতের ঘটনার জন্য পুলিশের ভূমিকাকে দায়ী করেছে ঢাকা মহানগর হেফাজতে ইসলাম। গত ২৪ অক্টোবর একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিনে ভোলা সফর করে আসার পর সংগঠনের পক্ষ থেকে বিবৃতি আকারে আজ এই অভিমত প্রকাশ করা হয়।

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও ঢাকা মহানগর সভাপতি আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী বিবৃতিতে আরো বলেছেন, হেফাজত প্রতিনিধি দল তদন্ত করে দেখেছে যে, ভোলা প্রশাসনের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতেই রবিবারের সমাবেশে আলেম সমাজ, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা বক্তব্য রেখে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু ঘটনার দিন সকালে বরিশাল রেঞ্জের এডিশনাল ডিআইজি এহসান সোহেল চাপ দিয়ে ১১টায় শুরু হতে যাওয়া সমাবেশ ১০টায় শেষ করে দেয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে পুলিশ স্বাভাবিক লাঠি চার্জ ও কাঁদাসে গ্যাস প্রয়োগের পরিবর্তে সরাসরি প্রাণঘাতি গুলি বর্ষণ শুরু করে। এতে ৪ জন নিরপরাধ মানুষ নিহত এবং বহু আহত হন।

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী ঘটনার পূর্বাপর বর্ণনা করে আরো বলেন, ঘটনার আগের রাতে ৫ জন আলেম প্রতিনিধি বোরহানুদ্দিন থানায় পুলিশের ওসি, সার্কেল এএসপি, এসপি, জেলা প্রশাসক, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের থানা সভাপতিসহ অন্যান্য আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে একটি বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে ইসলাম অবমাননার ঘটনা ও পরের দিনের সমাবেশ নিয়ে দীর্ঘ কথাবার্তা শেষে এভাবে সমঝোতা হয়েছিল যে, প্রতিবাদ সমাবেশটা কোন ব্যক্তি বিশেষকে সুনির্দিষ্টভাবে দায়ী না করে সাধারণভাবে অবমাননার বিরুদ্ধে হবে এবং সেখানে এ পর্যন্ত প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও জানানো হবে, যাতে এলাকার উত্তেজনাকর পরিস্থিতি শান্ত হয়। সমাবেশে কে কে বক্তব্য দিবেন সেটাও থানার বৈঠকে ঠিক করা হয় যে, বাজার মসজিদের ইমাম, বোরহানুদ্দীন কামিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও ভাটামারার পীর সাহেব আলেমদের পক্ষে বক্তব্য দিবেন। প্রশাসনের তরফ থেকে এডিসি, সার্কেল এএসপি এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যান বক্তব্য রাখার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে এটাও সিদ্ধান্ত হয় যে, এই ছয় জনের বক্তব্যের পরপরই সমাবেশ শেষ করে দেওয়া হবে এবং কোন মিছিল হবে না। আলেমরা সন্তুষ্ট চিত্তে এটা মেনে নিয়ে পরদিন সকালে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, রবিবার সকালে সমাবেশের প্রস্তুতিকালীন সকাল সাড়ে ৮টায় বরিশাল রেঞ্জের এডিশনাল ডিআইজি এহসান সোহেল, ভোলার পুলিশ সুপার, বোরহানুদ্দিন থানার ওসি’সহ আরো কিছু পুলিশ ফোর্স ঈদগাহ মাঠে এসে সমাবেশের প্রস্তুতিতে বাধা প্রদান করেন। এক পর্যায়ে মাওলানা মিজানুর রহমান, মাওলানা জালাল উদ্দিন’সহ আলেমদের সাথে মার্কাজ মসজিদের একটি কক্ষে বসে এডিশনাল ডিআইজি সমাবেশের প্রস্তুতি বন্ধ করতে জোরদার চাপ প্রয়োগ করেন। আলেমরা আগের রাতে থানায় সমঝোতার কথা যতই বলেন, তিনি শুনতে চান না। তখন এডিশনাল ডিআইজি আলেমদেরকে বলেন, আপনারা অসুস্থ হয়ে যান, আমি এম্বুলেন্স আনার ব্যবস্থা করছি। আপনারা এম্বুলেন্সে করে সরে যান। কিন্তু আলেমরা এতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, আমাদের পক্ষে কাল রাতের ফায়সালার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর মধ্যেই মাঠে মানুষজন চলে আসতে শুরু করেছে। এক পর্যায়ে পুলিশ হুমকি দিয়ে আলেমদের সবার ছবি তুলেন ও মোবাইল নম্বর নোট করেন।

এক পর্যায়ে ১০টার কিছু সময় আগে এডিশনাল ডিআইজি ও এসপি স্টেজে গিয়ে মাইক নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। তারা পুলিশ প্রশাসন এই পর্যন্ত কী কী করেছেন এসব বললেন। কিন্তু সমাবেশের সময় হওয়ার আগেই এবং আলেমদের কথা বলা ছাড়া প্রথমেই পুলিশ প্রশাসনের কথা বলাটা উপস্থিত সাধারণ মানুষজন স্বাভাবিকভাবে নেননি। এরপর পুলিশ আলেমদেরকে জোর করে স্টেজে নিয়ে কয়েক মিনিটের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিতে বাধ্য করেন। এরপর খুবই সংক্ষিপ্ত মুনাজাত করিয়ে সাড়ে ১০টায় সমাবেশ শেষ করে দিয়ে মাইকে সবাইকে চলে যেতে বলেন।

আল্লামা কাসেমী বলেন, সমাবেশের নির্ধারিত সময় ছিল ১১টায়। সাড়ে ১০টায় পুলিশ সমাবেশ শেষ করে দেওয়ার পরের দিকেই কিন্তু জনগণের মূল ¯্রােত মিছিল সহকারে সমাবেশ স্থলের দিকে আসতে শুরু হয়। তারা মাইক বন্ধ এবং স্টেজের আশেপাশে ও মাঠে পুলিশের অবস্থান ও পুলিশের তরফ থেকে বার বার মানুষজনকে চলে যেতে বলা দেখে ধারণা করতে শুরু করেন যে, প্রশাসন ইসলাম অবমাননার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ করতে দিচ্ছে না। এমন ধারণার প্রেক্ষিতে এখান থেকেই উত্তেজনার সূত্রপাত।

আল্লামা কাসেমী বলেন, পুলিশী বাধায় ক্রমান্বয়ে যখন উত্তেজনা বাড়তে থাকে এক পর্যায়ে এডিশনাল ডিআইজি, এসপি এবং ইউএনও এ তিনজন মসজিদের দোতলায় ইমাম সাহেবের কক্ষে ঢুকে পড়েন। ওসি সাহেব ফোর্স নিয়ে নীচে ছিলেন, উপরে ওঠেননি। এক পর্যায়ে পুলিশ ছররা গুলি বর্ষণ করাতে কিছু মানুষ রক্তাক্ত হয়ে পড়লে জনতার মাঝে উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়। তখন কেউ কেউ পুলিশের কক্ষের দরজায় আঘাত করে। কিন্তু উত্তেজিত জনতাকে নিবৃত্ত করতে পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট প্রয়োগ না করে সরাসরি প্রাণঘাতি গুলিবর্ষণ শুরু করে। যাতে ৪ জন মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এভাবে ৩০-৪০ মিনিট সংঘর্ষের পর যখন গুলি শেষ হয়ে যায়, এরপরই পুলিশ টিয়ার শেল প্রয়োগ করে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করে। কিন্তু এই টিয়ার শেল তো এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে শুরু থেকেই পুলিশের সাথে রাখা ও প্রয়োগ করার কথা। যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির আশংকা থেকে পুলিশ সকাল থেকেই সমাবেশ না করতে দিতে বদ্ধপরিকর, তাহলে কেন তারা সাথে টিয়ার গ্যাস শেল, ঢাল ও লাঠি নিয়ে প্রস্তুত ছিল না? কেন তারা শুরুতেই প্রাণঘাতি গুলিবর্ষণ শুরু করল? তাছাড়া নিরুপায় ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার জন্য পুলিশকে গুলিবর্ষণ করতে হলে সেটা তো হাঁটুর নীচেই করার কথা। দেখা গেছে, নিহত ৪ জনই মাথায় একাধিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, ভোলার বোরহানুদ্দীনে হতাহতের ঘটনাটি ঘটেছে পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের এডিশনাল ডিআইজি এহসান সোহেল ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের বাড়িবাড়িমূলক আচরণ ও রাতে প্রশাসনিক সমঝোতার বিপরীত অবস্থানের কারণে। তাছাড়া সকালের উদ্ভূত পরিস্থিতিতেও পুলিশপ্রশাসন সেদিন পেশাদারির সাথে কর্তব্য পালন করলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতো না বলেই প্রতিয়মান হয়। সুতরাং ভোলায় ৪ জন নিরপরাধ মানুষের হত্যাকা- ও ব্যাপক সংখ্য মানুষের আহত হওয়া’সহ পুরো সহিংস ঘটনার দায়ভার পুলিশের উপর বর্তায়।

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, ভোলার বোরহানুদ্দিনের হত্যাকা- ও সহিংসতার জন্য ঢাকা মহানগর হেফাজতের পক্ষ থেকে আমরা দায়ী পুলিশ সদস্যদের দ্রুত গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি। পাশাপাশি দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে পুলিশী হয়রানী বন্ধ, হতাহতদের পরিবারের কাছে সরকারীভাবে ক্ষমা প্রার্থনা, ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায় প্রদান এবং ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে আইন পাশের জোর দাবি জানাচ্ছি।

উল্লেখ্য, গত ২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ভোলার ঘটনা তদন্তে ঢাকা মহানগর হেফাজতের পক্ষ থেকে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী এক প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। হেফাজত নেতা মাওলানা মাহফুজুল হকের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে আরো ছিলেন- মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী, মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, মাওলানা সানাউল্লাহ মাহমূদী, মাওলানা মুনির আহমদ, মাওলানা ফায়সাল আহমদ, মাওলানা রাকীবুল ইসলাম প্রমুখ। প্রতিনিধি দলটি দিনভর ঘটনাস্থল বোরহানুদ্দিন পৌরসভা ঈদগাহ মাঠ, মার্কাজ মসজিদ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তারা ঘটনাস্থলের মাদরাসাতুত্তাক্বওয়ার পরিচালক মাওলানা মিজানুর রহমান, মার্কাজ মসজিদের খতীব মাওলানা জালাল উদ্দিন, মাওলানা তৈয়বুর রহমান, মাওলানা মাহবুবুর রহমান, মাওলানা মিজানুর রহমান’সহ প্রায় অর্ধশতাধিক উলামায়ে কেরাম ও স্থানীয় জনসাধারণের সাথে কথা বলে ঘটনার পূর্বাপর বিষয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ করে পরিস্থিতি সম্পর্কে ঢাকায় ফিরে এসে প্রতিবেদন পেশ করেন।

LEAVE A REPLY