সীমান্ত হত্যা নাকি চীন নিয়ে বাংলাদেশ- ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন

আপডেট: জানুয়ারি ২৩, ২০২০
0

মাহমুদা ডলি:

সীমান্ত হত্যা নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের যে টানাপোড়েন চলছে তা নিয়ে বিতর্ক থামছেই না। সম্প্রতি আরবের গালফ নিউজকে দেয়া সাক্ষাতকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের এনআরসি বিরোধী মন্তব্যও করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি এটাও বলেছেন যে বাংলাদেশ-ভারতের সর্ম্পক বর্তমানে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে।

গত ১৩ জানুয়ারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল,পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাাহরিয়ার আলম সীমান্তহত্যা ১২ গুন বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গণমাধ্যমের কাছে। এমনকি পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দু’জনেই ভারত সফরও বাতিল করেছেন।

তবে আজ ২১ জানুয়ারী ভারতীয় গণমাধ্যম সীমান্তের চেয়েও এবার সম্পর্কের টানাপোড়েনে কারন হিসেবে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এমনকি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সর্ম্পক যেন খারাপ না হয় সেজন্য ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সুপারিশ করেছেন।

এসব বিষয় নিয়ে দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেনন বলেছেন,” সীমান্ত নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও প্রধানমন্ত্রী তো দিল্লীকে বার্তা পাঠানোর কথা বলেছেন। দেখা যাক দিল্লী কি বলে। আর মতান্তর থাকতেই পারে দুটো দেশের মধ্যে। সেজন্য সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় না। ভারত নিশ্চয় সীমান্তে হত্যার বিষয়টি ভালোভাবে বিবেচনা করবে আমরা আশাবাদী। ”

অপরদিকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন বিশ্ব অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করে রাষ্ট্রীয়ভাবে গর্বভরে প্রচার করা হচ্ছে তখন ২০১৯ সালে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর হাতে বাংলাদেশিদের প্রাণহানির সংখ্যা ১২গুন বেড়ে গেছে বলে খবর দিয়েছে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)
গত ১৩ জানুয়ারী শেখ হাসিনার পশ্চিম এশিয়া সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি-র তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-এ বিএসএফের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা ২০১৮সালের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেড়ে ৩৫-এ দাঁড়িয়েছে। ২০১৮-য় এই সংখ্যা ছিল ৩। মন্ত্রী মোমেন বলেন, ‘‘আপনাদের মতো আমিও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে দু’দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে। নানা পদক্ষেপও করা হয়েছে। তার পরেও হত্যাকাণ্ড বেড়েই চলেছে।’’ এর পরে মন্ত্রী জানান— সীমান্তে মৃত্যু কেন বাড়ছে, সে বিষয়ে ভারতকে বার্তা পাঠানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেছেন, ‘সীমান্তে হত্যার বিষয়টি এক বছরে প্রচুর বেড়েছে। সীমান্ত পারাপার হচ্ছে এমন কাউকে দেখলেই গুলি করে দিচ্ছে বিএসএফ। তাদের এমন আচরণ বদলাতে হবে। ‘ সীমান্তে এসব হত্যাকান্ডকে মারাত্মক ধরণের মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এই নির্বাহী পরিচালক বলেছেন, ভারতের পক্ষ থেকে এসব বাংলাদেশিদের অবৈধ ব্যবসায়ী বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। শিপা হাফিজ আশঙ্কা করে বলেন যে, ভারতে নতুন যে নাগরিকত্ব আইন করা হয়েছে এর কারণে আরো বেশি মানুষ সীমান্ত পার করতে পারে।

ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই ইন্ডিয়া টাইমস,আনন্দবাজার,এশিয়ান নিউজ, সময়সহ প্রথম শ্রেনীর গণমাধ্যমই জোড়ালোভাবে লেখালেখি চলছে। এমনকি বাংলাদেশে পেয়াঁজ রপ্তানী বন্ধ ঘোষনাকে কেন্দ্র করেও বেশ হইচই শুরু হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মন্সি বার বার শঙ্কা ওক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

অপরদিকে , বাংলাদেশে চিনের বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক এশিয়ান এইজ পত্রিকায় লিখেছেন ,“উদীয়মান এই অর্থনীতি কয়েক লাখ ভারতীয়কে বাংলাদেশে আকৃষ্ট করেছে যারা দেশটির গার্মেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবসাখাতে কাজ করেন। বাংলাদেশের অর্থনীতি যত এগোবে সুযোগ ততই খুলবে। ভারতীয়রা লাভবান হবে যদি এই ভালো সম্পর্ক বজায় থাকে।

নতুবা চীন চলে আসবে। দেশটি ইতোমধ্যেই কৌশলগত ক্ষেত্রে এগিয়েছে। পাকিস্তানের পর চীনা সমরাস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা বাংলাদেশ। চীন থেকে ট্যাংক, বিমান ও সাবমেরিন কিনেছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা মনে করেন, এই অঞ্চলে আরো বড় ভূমিকা পালন করবে চীন। তিনি বেশ আগ্রহসহকারে দেশের অবকাঠামোতে চীনা বিনিয়োগ চেয়েছেন।

চীন বাস্তবায়ন করছে এমন বড় ধরনের প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৩৭০ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিতব্য ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু ও চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন প্রকল্প। নয়াদিল্লি ও রাজধানীর সংবাদমাধ্যম মূলত পশ্চিমে বিশেষ করে পাকিস্তানে চলমান কৌশলগত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিভোর। কারণ, পাকিস্তানে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর পরিচালনা করছে চীন। কিন্তু ভারতের আগে চীন আরো বৃহৎ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।

কিন্তু ঢাকা এখনও বিভিন্ন বিকল্প খুঁজছে। আর চীন কিন্তু অতীতে নিজেদের স্বার্থ এগিয়ে নিতে বিদেশি রাজনীতিবিদ বা কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে পর্যন্ত পিছপা হয়নি। ভারতের জন্যও সম্ভবত সময় এসেছে বাংলাদেশে নিজের রাজনৈতিক সংযোগ আরও বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় করার।”

LEAVE A REPLY