‌ ‘কোদাল হাতে মাটি কেটে বিপ্লব শুরু করেছিলেন শহীদ জিয়া ‘

আপডেট: জানুয়ারি ২৯, ২০১৯
0

ড.এমাজ উদ্দিন আহমদ

১৯৭৯ সালের শেষ দিক। হঠাৎ রাষ্ট্রপতি জিয়া ঘোষনা দিলেন “আমি বিপ্লব করব”। সারা দেশ এক রকম স্থবির হয়ে গেল এই ঘোষনা শুনে। তখন ও মানুষের মনে জাসদ আর বাকশালী শ্বেত বিপ্লব আর লাল বিপ্লবের আতংক জ্বল জ্বল করছে। আমলারা হতবাক আর নিজ দলের রাজনীতিবিদরা অস্থির বিরোধী দলীয়রা ভয়ে জরোসরো।
আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিপ্লব তো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাধারণের প্রতিবাদ বুজায়। রাষ্ট্র প্রধান সেখানে কার বিরুদ্ধে বিপ্লব করবে? কয়েকজন সিনিয়র নেতা এবং মন্ত্রী তৎকালীন এন এস আই য়ের মহাপরিচালককে অনুরোধ করে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে বিপ্লব সম্পর্কে জানার জন্য। মহাপরিচালক প্রেসিডেন্ট জিয়াকে মন্ত্রীদের উদ্বেগ জানালে তিনি বলেন, “ ওদের বলে দিন, ওদের ধারনা ভুল, দুশ্চিন্তা অমূলক।“
“সাধারন মানুষের ধারনা বিপ্লব সব সময় হিংসাত্মক হয়। কিন্তু তা সত্য নয় । ইউরোপে যান্ত্রিক ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন এসেছিলো দেখা যায় তাকে শিল্প বিপ্লব আখ্যা দেয়া হয়। সে বিপ্লব কিন্তু হিংসাত্মক রূপ নেয় নি। আমার বিপ্লব ও হবে শান্তি পূর্ন। আমাদের বিপ্লবের মুল উদ্দেশ্য হল জনগনের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাওয়া।“ প্রেসিডেন্ট জিয়া বলে যাচ্ছেন, “আমাদের দেশে অনেক লোক অভুক্ত থাকে, অনেক লোকের কর্ম সংস্থাপন নেই, অনেক মানুষের থাকার জায়গা নেই, ওষুধ পায়না বহুলোকে। আমরা যদি পরিকল্পিত বিপ্লবের মাধ্যমে এগুলোর সমাধান না করি তাহলেও বিপ্লব হবে। সে বিপ্লব হবে অপরিকল্পিত হিংসাত্মক নেতৃত্বহন। এতে কারোই মঙ্গল হবে না দেশ যাবে বিদেশী মানুষ দের দখলে।“
“সে বিপ্লব ঠেকাতেই আমাদের পরিকল্পিত বিপ্লব ঘটাতে হবে। বসে থাকার সময় নেই। আমার বিপ্লবের টার্গেট হল কৃষি বিপ্লব এবং শিল্প বিপ্লব। আমি নিরক্ষরতা দুরীকরনের বিপ্লব করব। আমি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে স্বনির্ভর, স্বাবলম্বী উৎপাদনশীল জন গোষ্ঠী গড়ে তুলব যারা নিজের পায়ে দাড়াতে শিখবে। যারা নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরা করার আত্ম বিশ্বাস লাভ করবে”
সকল কানাঘুষার অবসান ঘটিয়ে ১৮ ই নভেম্ভর ৭৯ সালে জাতির উদ্দেশ্যে ৪ টি শান্তিপূর্ন বিপ্লবের কর্মসূচী ঘোষনা করেন।

১। কৃষি ও খাদ্য বিপ্লব
২। শিল্প বিপ্লব
৩। শিক্ষা বিপ্লব
৪। স্বাস্থ্যসেবা ও জন সংখ্যা নিয়ন্ত্রন।

একজন রাষ্ট্রপতি হিসাবে তিনি দিক দর্শন করিয়ে আমলা মন্ত্রীদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান তো শুধু কোন রাষ্ট্রপতি ছিলেন না ছিলেন বাংলাদেশীদের আত্ম মর্যদা জাতীয়তাবোধের অহং কে চিনিয়ে দেবার কান্ডারী। নিজে নেমে গেলেন নিজের প্রদর্শিত পথ হাতে কলমে দেখিয়ে দেবার জন্য। এখানেই তিনি ছিলেন আছেন অনন্য।

এমাজউদ্দিন স্যারের সাক্ষাতকার নেয়ার সময় ……..

কৃষি বিপ্লব

স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার মুল উপাদান হচ্ছে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্বয়ংসম্পুর্নতা বৃদ্ধি। ২ য় পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনায় ৫ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুন করার কর্মসূচী গ্রহন করেছিলেন। তিনি বুজতে পারেন যে গ্রাম বাংলার সমৃদ্ধির ওপর বাংলাদেশের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি। খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ন হতে হলে একই জমিতে দুই বার তিনবার ফসল ফলাতে হবে। ফারাক্কা বাধের কারনে উত্তাল উন্মাতাল পদ্মাকে ভারত মেরে ফেলছে। শীতকালে আমাদের নদীতে পানি থাকেই না। কিন্তু সারা বছর ফসল উৎপাদন করতে হলে নদীতে পর্যাপ্ত পানি চাই।

দেশের হাজামজা নদীগুলোকে আবার পূর্ন খনন করে তাতে পানির অবাদ প্রবাহ নিশ্চিত করেন আবার যেখানে নদী নেই সেখানে ছোট ছোট নালা কেটে নদীর পানি দিয়ে খাল বানিয়ে নিলেন। আবার যেখানে তাও সম্ভব না সেখানে স্থানীয় ভাবে পুকুর কেটে অথবা কচুরী পানা ভর্তি পুকুর ডোবা গুলোকে সংস্কার করে সেগুলো বর্ষাকালে পানি ধরে রাখার উপযোগী করে তুললেন।

ওই পুকুর গুলোতে আবার মাছ চাষে উদ্ভুদ্ধ করতেন। তিনি স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে দেশের ছোট বড় সবাই কে আহ্বান জানান। প্রধান সামরিক আইন প্রশাষক থাকা অবস্থাতেই উলশী- যদুনাথপুর প্রকল্পের মাধ্যমে ১৯৭৬ সালের ১ লা নভেম্বর খাল খননের আনুষ্ঠানিক উদ্ভোধন করে দেশে তিনি খাদ্য বিপ্লবের শুরু করেন।

দৈনিক বাংলার আলোক চিত্র শিল্পী জনাব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান তার “স্মরনের মালা গাথি” স্মৃতিচারন নিবন্ধ এখানে তুলে ধরা হলঃ

“ আমি সংবাদপত্রের এক নগন্য আলোক চিত্র শিল্প। পেশা গত দায়িত্ব পালনের জন্য আমার ছবি সংগ্রহ করতে হয়। সেভাবেই জিয়ার ছবি আমাকে সংগ্রহ করতে হয়েছে। তার ছবি সংগ্রহ করতে হয়েছে রাজধানীর বিমান বন্দর, বঙ্গভবনে, ওইতিহাসিক পল্টন ময়দানে, নগরীর বিভিন্ন মহল্লায়, বিভিন্ন জেলা আর মহাকুমা সদরে। ছবি তুলতে হয়েছে বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে। গত ছয়টি বছর ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমি তার ছবি তুলেছি আর সর্বত্রই শুনেছি তার মুখ দিয়ে একটি কথাঃ আপনারা কাজ করুন। নিজ পায়ে দাড়ান, অলস হয়ে বসে থাকলে চলবে না।”

নেতাদের ক্ষেত্রে এমন তাগিদ দেয়া নতুন কিছু না। তবে এ ক্ষেত্রে একটু তফাৎ ছিল – তিনি অপরকে যা বলতেন নিজে তা করে দেখাতেন। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই মনে পড়ে যশর জেলার উলশী-যদুনাথপুরের বেতনা নদী সংযোগ প্রকল্প। ১৯৭৬ সালের ১ লা নভেম্বর। উলশী – যদুনাথপুরের যেখানে খাল কাটা শুরু হওয়ার কথা সেখানে অপেক্ষা করেছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম একটি সামাজিক আন্দোলন শুরু করার অপেক্ষায় একজন মানুষের জন্য। তিনি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।

যথা সময়ে হেলিকপ্টার এল। তিনি হেলি কপ্টার থেকে নেমে এগিয়ে গেলেন প্রকল্পের দিকে, সাথে সেনাবাহিনীর অনেক উচ্চ পদস্থ অফিসার। তার পরনে ছিল সামরিক পোষাক। হাতে ছিল ছড়ি। সব কিছু দেখে আমার আগে কার দিনের নেতাদের কথাই মনে হচ্ছিল। ভাবছিলাম আজো বক্তৃতা মঞ্চে ভাষন দেবার হাজার হাজার মানুষের ছবি পাঠাব। কিন্তু পাঠান হয় নি পাঠালাম রাইফেল ধরা হাতে কোদাল ধরা ছবি। পুরো সামরিক পোষাকে সজ্জিত সেনাপতির মাটি কাটার ছবি।

বেতনা নদীর দৈর্ঘ্য বারো মাইল। খালের বিভিন্ন সাথে কোদাল হাতে মাটি কেটে যাচ্ছেন জিয়া আর সে দৃশ্য সাধারনের মাঝে এক অভুত পূর্ব প্রেরনা সঞ্চার করেছিল। ছবি তুলছিলাম আর ভাবছিলাম “এখান থেকে শুরু হল দেশের পট পরিবর্তনের এক নতুন পালা” সুদীর্ঘ ১৬ মাইল পথ পায়ে হেটে সাধারন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে তিনি ব্যাখ্য করতে লাগলেন প্রকল্পের ভবিষ্যতের কথা। বুজাচ্ছিলেন এই খাল খনন হলে সামনে কি হবে।

LEAVE A REPLY