অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারকে দালালমুক্ত করতে হবে : নগরায়ণ-শিল্পায়ন অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে– বাপার সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের অভিমত

আপডেট: জুলাই ১৯, ২০২১
0

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন , ”ন্যায্য পাওনা এবং শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত আইন মেনে চলতে হলে অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারকে দালালমুক্ত করতে হবে । একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার ইতহাস সবগুলোই ছিল অপরিকল্পিত। নগরায়ণ এবং শিল্পায়ন দুটোই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। শিল্পায়নকে ব্যক্তি খাতে দেওয়ার ফলে ব্যবসায়রা বেশি বেপরোয়া হয়েছে মুনাফা লাভের আশায়। ফায়ার সাভির্সের তথ্যমতে দেশের ৯০ভাগ কারখানায় ফায়ার সেফটির ব্যবস্থা নেই। সরকার এ সমস্ত প্রতিষ্ঠনগুলোর ক্ষেত্রে নমনীয় হওয়ার কারণেই দেশে এ ধরনের দুর্ঘটনা বারবার হচ্ছে।”

“কারখানাসমূহের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশ প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ হাশেম ফুডের দুর্ঘটনা” -শীর্ষক অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা এসব অভিমত দিয়েছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র উদ্যোগে আজ ১৯ জুলাই, ২০২১ সোমবার সকাল ১১:০০টায় “কারখানাসমূহের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশ প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ হাশেম ফুডের দুর্ঘটনা” -শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভা ‘জুম’ প্লাটফর্মের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়।

আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রাক্তন আঞ্চলিক উপদেষ্টা এবং বাপা’র পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক, ড. এ. এম. জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপা’র কার্যনির্বাহী সদস্য ও স্বাস্থ্য আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদা আখতার।

বাপার পরিবেশ স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মসূচি কমিটির সদস্য-সচিব লেখক ও গবেষক বিধান চন্দ্র পালের সঞ্চালনায় আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান, বাপার সাধারণ সম্পাদক জনাব শরীফ জামিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের পরিচালক ও অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন, বাপা’র যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহের ফুড টেকনোলজি ও গ্রামীণ শিল্প বিভাগের প্রফেসর এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য ড. মোঃ আব্দুল আলীম, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক জনাব হাফিজুল ইসলাম।

এছাড়া অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, অধ্যাপক গোলাম রহমান, ড. মাহবুব হোসেন, এম এস সিদ্দিকী, অধাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার, কামরুল হাসান পাঠান প্রমূখ।

সভাপতির বক্তব্যে ড. এ. এম. জাকির হোসেন বলেন, পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রণকারী শর্তগুলো আমাদের দেশে মানা হচ্ছে না।সেজন্য দেশে পুঁজিবাদীদের নিয়ন্ত্রণহীন দৌরাত্ম বেড়েই চলছে।তিনি সবার বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, জবাবদিহিতার জায়গাটি যেন সবক্ষেত্রেই উপক্ষিত থেকে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহ তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন না।ব্যবস্থাপনার গোড়া দুর্বল ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত। সরকারের কন্ট্রোলিং ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়েছে বিশেষত শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। এজন্য তিনি আইনের যথাযথ প্রয়োগ করার দাবি জানান।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে শরীফ জামিল বলেন, অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে দেশে হাসান ফুড কালখানার মত প্রাণনাশের দুর্ঘটনা বারংবার হয়ে আসছে। এ বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাপা আরও জোর দিয়ে কাজ করবে আজকে এই আলোচনার মধ্য দিয়ে তারই সূচনা হচ্ছে বলেও এ সময় তিনি মন্তব্য করেন।

ফরিদা আখতার মূল বক্তব্যে বলেন, ওই ভবনে প্রচুর প্লাস্টিক, কেমিক্যাল, কার্টনসহ দাহ্য পদার্থ মজুত ছিল যার কারণে আগুন ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। এত দাহ্য পদার্থ থাকলে আগুন লাগার সম্ভাবনা থাকে বলে যথেষ্ট অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল, কিন্তু ফায়ার সার্ভিস সে বিষয়ে বলতে পারে নি। হাশেম গ্রুপের ফ্যাক্টরীতে Department of Inspection for Factories and Establishments (DIFE) এর কর্মকর্তারা ৮ জুন, ২০২১ তারিখে পরিদর্শনে এসে সেখানে শিশু শ্রমিকদের অ-নিরাপদ ব্যবহার দেখে নোটিশ দিয়েছিলেন। কিন্তু হাশেম গ্রুপ তা আমলে নেয় নি। একমাসের মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে গেল। পত্রিকার খবরে জানা গেছে, চকলেট এবং hazelnut এর জন্যে Nocilla নামক spread তৈরির জন্য কাঁচামাল হিশেবে যে তেল ব্যবহার করা হয় তার কারণেই ২৪ ঘন্টা ধরে আগুন জ্বলেছে। তিন তলায় এই স্প্রেডটি তৈরি হচ্ছিল। ফ্যাক্টরিতে পাইপ লাগিয়ে এই তেল অন্যান্য ফ্লোরেও সরবরাহ করা হয়। যে কোনো তেলেই আগুন জ্বলতে পারে, কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে এগুলো একদিকে দাহ্য পদার্থ, অন্যদিকে স্বাস্থ্যের জন্যেও কতখানি নিরাপদ তা দেখার কি কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে কিনা। ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদন বিএসটিআই ২৬টি কোম্পানির খাদ্য পণ্যকে নিম্নমানের বলে চিহ্নিত করেছিল, তার মধ্যে হাশেম গ্রুপের কুলসন সেমাই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শুধু হাশেম গ্রুপ নয়, স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর উপাদান অন্যান্য কোম্পানিরও আছে। সেগুলো উৎপাদন করতে গিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটছে। বেচে যাওয়া শ্রমিকরা অভিযোগ করেছেন যে কারখানায় কাজের পরিবেশ নিরাপদ নয়। প্রায় ৭০০০ শ্রমিক হাশেম ফুড লিঃ এ কাজ করত। যারা মারা গেছে তারা তিন তলায় আটকে ছিল, যেখানে দাহ্য পদার্থ এবং প্লাস্টিক স্টোর করে রাখা ছিল।

অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ কারখানার প্রতিটি স্তরে নিয়মকানুনের ব্যত্যয় ঘটেছে। শুধু ব্যাংক এবং বায়াররা যখন চাপ দেয় তখন কারখানাগুলো নড়ে চড়ে বসে। কিন্তু দেশের মানুষ যে পুড়ে মরছে সে দিকে তাদের কোনো গুরুত্ব নেই। ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনিং করা হলে কারখানাগুলো যথাযথ মনিটরিং করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন। একাধিক তদন্ত কমিটি না করে একটিই বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। একের অধিক তদন্ত কমিটি হলেই সেই রিপোর্ট প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ নিম্ন আয়েরে দেশ থেকে ২০২৬ সালে বের হয়ে মধ্য আয়ের দেশে যাবে কিন্তু কল-কারখানা বিষয়ে আগের মতই ধ্যান-ধারনা রয়ে গেছে। অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারকে দালালমুক্ত করতে এবং এ ধরনের রিপোর্টগুলো বিষয়ে সাবক্ষণিক ফলোআপ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এ ধরনের দূর্ঘটনার পূনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সে বিষয়ে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি। একইসাথে তিনি দায়বদ্ধতার বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।

অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন বলেন, বাংলাদেশের শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার ইতহাস সবগুলোই ছিল অপরিকল্পিত। নগরায়ণ এবং শিল্পায়ন দুটোই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। শিল্পায়নকে ব্যক্তি খাতে দেওয়ার ফলে ব্যবসায়রা বেশি বেপরোয়া হয়েছে মুনাফা লাভের আশায়। ফায়ার সাভির্সের তথ্যমতে দেশের ৯০ভাগ কারখানায় ফায়ার সেফটির ব্যবস্থা নেই। সরকার এ সমস্ত প্রতিষ্ঠনগুলোর ক্ষেত্রে নমনীয় হওয়ার কারণেই দেশে এ ধরনের দুর্ঘটনা বারবার হচ্ছে।

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, হাশেম ফুডের খাদ্যের গ্রহণযোগ্যতা, ভবনটি গোডাউন হিসেবে তৈরি করে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে ব্যবহার করা, অগ্নিনির্বাপক না মানা এ সমস্ত বিষয়কে তিনি শুভংকরের ফাঁকী বলে মন্তব্য করেন। ভবন অনুমোদন প্রদানের পরে সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ মনিটরিং করেনি। এ ধরনের কারখানাকে মোটা অংকের জরিমানা করা ও প্রতি বছর নিয়মিত পরিদর্শন করার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারকে দায়বদ্ধতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট চালু করে সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে নিয়ে জন প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রতি বছর নবায়নযোগ্য সার্টিফিকেট নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় তিনি কমপ্লায়েন্স কমিশন গঠনেরও দাবি জানান।

ড. মোঃ আব্দুল আলীম বলেন, এ ধরনের ফ্যাক্টরী বিল্ডিং কখনো ছয় তলা হতে পারেনা। প্রশাসনিক অবহেলার জন্য এ ধরনের দুর্ঘটনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন্ তিনি। কারখানার ভিতরের পরিবেশগুলো আমাদেরকে যথাযথ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ছয় মাস পর পর পরীক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের ফুড ইন্ডাস্ট্রিগুলো কোনোটিই পরিকল্পিত পন্থায় হয়নি। কারখানার সামগ্রিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাসহ প্রতিটি তলায় আলাদা আলাদা সিঁড়ির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। শ্রমিকদের আগুন নির্বাপণ যন্ত্র চালনার উপযোগী করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।

হাফিজুল ইসলাম বলেন, কারখানা তালা বদ্ধ থাকার কারণে মৃত্যু ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছে ৪ তলায়। কারখানায় কতজন শ্রমিক ছিল তার সঠিক হিসাব এখন পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। সপ্তম-অষ্টম পড়ুয়া শিশু শ্রমিকদের দিয়ে সে প্রতিষ্ঠান কাজ করাত যাদেরকে নামমাত্র পারিশ্রমিক দেওয়া হত বলে অভিযোগ করেন তিনি। নারায়ণগঞ্জে ব্যাটারী তৈরির কারখানা চাইনিজদের মালিকানায় বেআইনিভাবে চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। পরিবেশের কোনো কিছিুই সেখানে মানা হয়নি। ৩৫ হাজার স্কয়ার ফিটে ৪টি সিঁড়ি থাকার কথা নিয়ম অনুযায়ী কিন্তু সেখানে মাত্র ২টি সিঁড়ি ছিল। মালিক পক্ষ এবং সরকার পক্ষের যোগসাজসে কয়েক বছর ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে এ ধরনের ঘটনায়।এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করার দাবি জানান তিনি। অতীতের সব ঘটনায় যথাযথ বিচার এবং শাস্তি প্রদান করা হলে এ ধরনের ঘটনার পূনরাবৃতি হত না বলে তিনি মনে করেন। নারায়ণগঞ্জে ব্যাঙ্গের ছাতার মত যে সমস্ত কারখানা করা হয়েছে সেগুলোকে অতি দ্রুত আইনের আওতায় আনারও আহবান জানান তিনি।

বিধান চন্দ্র পাল বলেন, কারখানার পরিবেশের ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম স্পষ্ট। আমরা জেনেছি এ বিষয়ে সিআইডি তদন্ত করছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন কারখানায় বা কর্মস্থলে অগ্নিকাণ্ড, অগ্নিকাণ্ডে অকাল মৃত্যু এবং বিভিন্ন হতাহতের ঘটনায় এটিই প্রথম তদন্ত। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সামগ্রিক প্রেক্ষিত যাতে উঠে আসে সেজন্য তিনি দাবি জানান। তিনি বলেন, সেখানে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশ প্রেক্ষিত যেন আলাদাভাবে গুরুত্ব পায়। সেখানে কার কি দায়িত্ব সেটা যেন সুস্পষ্টভাবে থাকে এবং সেগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়নের পথনির্দেশনা ও সুপারিশমালাও যেন থাকে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।