আজও ইতিহাসের সাক্ষী সারদা পুলিশ একাডেমী

আপডেট: ডিসেম্বর ২৫, ২০২০
0

আবু সুফিয়ান,রাজশাহীঃ

রাজশাহীর চারঘাটের গৌরব বলে পরিচিত
সারদাতে অবস্থিত বাংলাদেশ পুলিশ
একাডেমী গড়ে উঠেছে ডাচ
বণিকদের স্থাপিত কুঠিবাড়িকে কেন্দ্র
করে। সারদাহ্ এক সময় ছিল বাঘ-ভল্লুকসহ
হিংস্র জীব-জন্তুর আবাসভূমি। কিন্তু
স্বাস্থ্যকর আবহাওয়া হওয়ার কারণে ডাচ
বণিকরা রেশম সুতার বাণিজ্য করতে এখানে
বানায় সুদৃশ্য এক কুঠিবাড়ি। এদের বাণিজ্যকে
কেন্দ্র করে গড়ে উঠে জনপদ।
ওলন্দাজরা চলে যাবার পর ওয়াটসন
কোম্পানী এখানে শুরু করে নীল চাষ।
যা বাঙলার ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক স্মৃতি
হিসেবে তাড়িত করে। নীলচাষের নামে
বর্বর এই ওয়াটসন কোম্পানীর নীলকর
সাহেবরা এখানকার কিষাণ-কিষাণী ও বউ-
ঝিদের কুঠিবাড়িতে আটকে রেখে যে
অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছিল তা ভুলবার
নয়। নীলচাষে অস্বীকৃতি জানালেই
নীলকর সাহেবরা ‘শ্যামা চাঁদ’ (চামড়া দিয়ে
মোড়ানো বেতের লাঠি) দিয়ে
পেটাতেন এখানকার কিষাণ-কিষাণীদের এবং
তাদের আর্তনাদে পদ্মার গর্জন ছাপিয়ে
ভারি হয়ে উঠতো আকাশ। যার পরিণামে এক
সময় বাঙলায় সৃষ্টি হয় নীল বিদ্রোহ। আর
প্রকৃতির বিচারে নিষ্ঠুর ওই নীলকর
সাহেবদের অনেকেই মারা যায় কলেরা
মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে।
কিন্তু ঐতিহাসিক সেই সারদাতে বইছে
সুবাতাস। এখানে গড়ে উঠেছে
উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ পুলিশ প্রশিক্ষণ
কেন্দ্র। দেশী-বিদেশী বিশাল বিশাল
বৃক্ষের ছায়াঘেরা এক প্রাকৃতিক পরিবেশ।
আজ সেখানে পুলিশ বাহিনীকে পড়ানো
হয় সুশাসন আর মানবতার পাঠক্রম। রাজশাহীর
সারদাহ্-এর ঠিক উল্টো দিকে রয়েছে
মুসলিম ঐতিহ্যের শহর মুর্শিদাবাদ। মোগল
আমলে মারাঠা বর্গীদের তাড়ানোর জন্য
নবাব মুশির্দ কুলি খান ও আলীবর্দী
খানের সৈনিকরা মুর্শিদাবাদ থেকে পদ্মার
ওপার পাড় সারদাহ্-এর বিশাল উম্মুক্ত ময়দানে
তাঁবু গেড়ে এখানে অবস্থান
করেছিলেন। উম্মুক্ত বিশাল ময়দান বা
মাঠকে পার্সি ভাষায় বলা হয়- Serdah. এই
Serdah থেকেই Sardah (সারদাহ্) নামের
সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের মতে, সারদা
এক সময় বাঘ-ভল্লুকের মতো হিংস্র
জানোয়ারের আবাসস্থল ছিল। বাঘ বা
শের’র আবাসস্থলের কারণে স্থানটির
নামকরণ হয়েছে সারদা। কিন্তু ইতিহাসবিদরা
দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিকে অগ্রহণযোগ্য দাবি
করে বলছেন- শুধু সারদা নয়,
প্রাচীনকালে বাঙলার প্রায় সর্বত্রই বাঘ
বসবাস করতো।
রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ২০ মাইল
পূর্বে পদ্মাপাড়ের সারদা-এর বড়কুঠি ব্যবহার
হচ্ছে অফিসার্স মেস হিসেবে আর
ছোটকুঠি হলো প্রিন্সিপালের বাসভবন।
এছাড়াও রয়েছে আরো প্রাচীন ইমারত।
ওলন্দাজদের স্মৃতি বিজড়িত নয়নাভিরাম এসব
ইমারত দেখে সত্যিই চোখ জুড়িয়ে যায়।
ইন্দো-ইউরোপীয় কায়দায় নির্মিত এসব
কুঠির নির্মাণ শৈলী সত্যি অবাক করার মতো।
দরজাগুলো হচ্ছে সেগুনকাঠের কারুকার্য
খচিত, পুরো মেঝে রয়েছে
শ্বেতপাথরে ঢাকা। এলাকা জুড়ে রয়েছে
প্রাচীনকালের দেশী-বিদেশী
রেইনট্রি, মেহগনি, দেবদারু, ঝাউ গাছ ও
আম-লিচুর বাগান। এসব বৃক্ষরাজির ছায়া আকৃষ্ট
করে সবাইকে। কুঠির সামনে রয়েছে
দেশী-বিদেশী বাহারি ফুলের বাগান।
তবে দক্ষিণের সেই প্রমত্তা পদ্মা এখন
পরিণত হয়েছে বালুচরে।
১৬৬২ খ্রীষ্টাব্দে ওলন্দাজদের ডাচ
কোম্পানী সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছ
থেকে বাণিজ্য ফরমান লাভ করায় তাদের
বাণিজ্যের বৃদ্ধি ঘটায়। তারা রেশম ব্যবসা
করতে বোয়ালিয়ায় আসে এবং এখানে
নির্মাণ করে বড়কুঠি। তাদের এ রেশম
ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই রাজশাহী
শহরের গোড়াপত্তন ঘটে। পলাশীর
যুদ্ধের পরে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানীর সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানীর যুদ্ধ হলে ডাচরা পরাজিত হয়।
তারপরেও তারা নিজ শক্তি বলে রাজশাহী ও
সারদায় রেশম ব্যবসা করতে থাকে। পরে
১৮২৫ খ্রীষ্টাব্দে ওলন্দাজরা সুমাত্রার
পরিবর্তে ইংরেজদের হুগলির চুচড়া
ছেড়ে দেয়। আর রাজশাহী ও সরদার
বড়কুঠি বিক্রি করে দেয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানীর কাছে। জানা গেছে, ‘চার্টার
অফ এ্যাক্ট’ প্রবর্তনের কারণে ব্রিটিশরা
১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে এ কুঠিগুলো বিক্রি
করে দেয় মেসার্স রবার্ট ওয়াটসন এন্ড
কোম্পানীর কাছে। ১৮৩৫ খ্রীষ্টাব্দে
রবার্ট ওয়াটসন কোম্পানী এখানে নীল
চাষ ও ব্যবসা শুরু করে। এ অবস্থায় এক সময়
এখানে কলেরা মহামারীতে কুঠিয়ালসহ
কর্মকর্তারা মারা যায়। ধস নামে তাদের
ব্যবসায়। পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে তাদের
কুঠিবাড়ি। এ সময় বেশ কয়েকটি ব্রিটিশ
কোম্পানীর হাত বদল হওয়ার পর ১৯০৮
খ্রীষ্টাব্দে মেদিনীপুরের জমিদারী
এস্টেট এটি ক্রয় করে এবং পরে আর্থিক
সংকটে ব্যবসা বন্ধ করে দিলে সারদা কুঠি
পরিত্যক্ত ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়।
ট্রেনিং কলেজ থেকে একাডেমী
ভারতের পুলিশ বিভাগে অনাচার, অরাজকতা ও
দুর্নীতি দেখা দিলে লর্ড কার্জন ১৯০২
খ্রীষ্টাব্দে একটি পুলিশ কমিশন গঠন
করেন। কমিশনের সুপারিশের
প্রেক্ষিতে রাজশাহী অঞ্চলে একটি
পুলিশ অফিসার্স ট্রেনিং কলেজের স্থান
নির্ধারণের দায়িত্ব অর্পণ করা অবসরপ্রাপ্ত
ইংরেজ পুলিশ সুপার মেজর এইচ চেমনীর
ওপর। ভারতের গাজীপুরে কর্মরত এই
ইংরেজ পুলিশ সুপার রাজশাহী সফর শেষে
স্বাস্থ্যকর স্থান হিসেবে সারদাহ্
কুঠিবাড়িকে নির্বাচন করেন। ১৪২.৬৬ একর
এলাকা বেষ্টিত এ পরিত্যক্ত কুঠিবাড়িটি ১৯১০
খ্রীষ্টাব্দে মেদিনীপুরের জমিদারী
এস্টেট’র কাছ থেকে সরকার ২৫ হাজার
টাকায় ক্রয় করে স্থাপন করে সারদা পুলিশ
ট্রেনিং কলেজ। ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দের
জুলাই মাস থেকে কলেজটি ১০৩ জন
কন্সটেবল, ৭ জন সহকারী পুলিশ সুপার ও
২৫ জন ক্যাডেট সাব ইন্সপেক্টরকে
প্রশিক্ষণদানের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে।
পুলিশ সুপারের পদমর্যাদায় মেজর (অব.)
এইচ চেমনীকে কলেজের প্রিন্সিপাল
হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তিনি ১৯১৯
খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এখানকার প্রিন্সিপালের
দায়িত্ব পালন করেন। দেশ বিভাগের পর
এখানকার প্রিন্সিপাল মি. টি জি হলম্যান বিদায়
নেন এবং দ্বাদশতম প্রিন্সিপাল হিসেবে
যোগ দেন এম এ খান। এ কলেজটি
পাকিস্তান পুলিশ বিভাগের উচ্চতম প্রশিক্ষণ
কেন্দ্র হওয়ায় ১৯৫০ সালে প্রিন্সিপালের
পদটি ডিআইজি-তে উন্নীত করা হয়। এ সময়
কলেজটি উপমহাদেশের একটি প্রথম
শ্রেণীর পুলিশ ট্রেনিং কলেজ হিসেবে
খ্যাতি অর্জন করতে সমর্থ হয়। ফলে
পাকিস্তান সরকার ১৯৬৪ সালে এ পুলিশ ট্রেনিং
কলেজকে একাডেমীতে পরিণত
করে। বর্তমানে ঘোড়ার ব্যবহার না
থাকলেও ঐতিহ্যগত কারণে সারদা
একাড