আমলাতন্ত্র ও জনগণের প্রত্যাশা

আপডেট: নভেম্বর ১৫, ২০২০
0

বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম

তৈমূর আলম খন্দকার:

বৃটিশ পূর্ব ভারতে আমলাতন্ত্র ছিল, কিন্তু তাদের জবাবদিহিতা ছিল নিয়োগকর্তার নিকট। কারণ তখন জনগণের কোন স্বাধীনতা ছিল না, ছিল না কোন মৌলিক অধিকার। নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার কোন সূযোগ ছিল না। রাজার পুত্রই হতো রাজা। বাহুবলে বা তলোয়ারের জোরে রাজ্য দখলই ছিল ক্ষমতা বদলের একমাত্র পদ্ধতি যার জন্য প্রয়োজন হতো রক্ত আর রক্ত। হাজার হাজার মানুষ হত্যা করে অন্য রাজ্য দখল করলে উপাধি পাওয়া যেতো বীর যোদ্ধা।

কুট কৌশল ও রক্তের বিনিময়ে বৃটিশ ভারত দখল করার পর প্রজাদের শাসন শোষন করার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় একটি প্রশাসনিক বাহিনী গড়ে তোলে। এ বাহিনীর কাজ ছিল বৃটিশ প্রভুত্বকে কোন কোন পদ্ধতিতে পাক-ভারত উপ-মহাদেশে কায়েম রাখা যায়। পাক-ভারতের সূর্য্য সন্তানদের আন্দোলনের মূখে ও অনেক রক্তের বিনিময়ে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হলেও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে নাই। তারা শাসনকর্তার নিকট ণড়ঁৎ ড়নরফবহঃ ংবৎাবহঃ হিসাবেই নিজেদের দক্ষতায় পরিচয় দিয়ে আমলাতন্ত্রের উচ্চ শিখরে উঠার “মই” হিসাবে নিজেকে ব্যবহার করতো। জনগণ কি চায় এবং জনগণের চাহিদা পূরণের বিষয়টি আমলারা তাদের দায়িত্ব হিসাবে তখনো মনে করতো না। বৃটিশ শোষন মুক্ত রাষ্ট্র গঠনের দাবীতে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও কাংখিত আশা পূরণ না হওয়ায় জনগণের আন্দোলন স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নিলো এবং স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন যার ফলশ্রুতিতে মুক্তিযুদ্ধের ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিনত হলো।

বাংলাদেশের জনগণ রক্তের অক্ষরে একটি সংবিধান পেলো যার মধ্যে জনগণের মৌলিক অধিকারকে নিশ্চিত করা ছাড়াও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জনগণের সর্বসময়ে সেবায় নিযুক্ত থাকার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।” শুধু তাই নয়, সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তত্ব কার্যকর হইবে।” সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার শিরোনামে ২৬ থেকে ৪৭ক অনুচ্ছেদে জনগণের অধিকারকে নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধান হলো একটি রাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের জনগণের চুক্তিনামা যা একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দলিল। কিন্তু এই দলিল আজ রাষ্ট্র কর্তৃক পদদলিত করছে প্রজাতন্ত্রে নিযুক্ত কর্মচারীদের দ্বারা যারা জনগণের বেতনভুক্ত কর্মচারী বটে।

ঔপনেবিশিক আমলে বৃটিশরা যে, প্রশাসনিক ক্যাডার গড়ে তুলেছিল তাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল ভয়ভীতি সৃষ্টি করে, গ্রেফতার, রিমান্ড দিয়ে লাঠি চার্জ করে অধিকার আদায়ে সংগ্রামরত জনগণকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়া। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন অনুরূপ শিক্ষা থেকে ব্যতিক্রম হয়ে উঠে নাই। মূখে মূখে গণমূখী প্রশাসনের কথা বললেও কার্যত প্রশাসনকে গণমূখী করা হয় নাই। কারণ প্রশাসন যদি গণমূখী হয় তবে কর্তার ইচ্ছায় কৃর্তন হবে না, বরং সংবিধানে প্রদত্ব জনগণের জন্য যে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে তার ভিত্তিতেই প্রজাতন্ত্র চলবে।

সিনিয়রকে ডিঙ্গিয়ে জুনিয়রকে প্রমোশন ও লোভনীয় পদে পোষ্টিং দেয়ার “মূলা” নাকের ডগায় ঝুলিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের “গাধা” বানিয়ে অধিকার বঞ্চিত জনগণকে ভয় ভীতির মাধ্যমে শাসনকর্তাদের আনুগত্যশীল থাকার যাবতীয় পদক্ষেপ নেয়া। প্রশাসনিক স্তর মূলতঃ জেলা থেকে সৃষ্ট। জেলা প্রশাসক, নিজেই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং জেলা কালেকটর এবং কাগজে কলমে অনেক বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও ক্ষমতাসীনদের সকল অন্যায় আবদারBy way of commission and omission জেলা প্রশাসনই করে থাকে, হয়রানী হতে হয় জনগণকে।

প্রশাসনের নিকট বিচার বা ন্যায় বিচার না পেয়ে অধিকার বঞ্চিত জনগণকে দৌড়াতে হচ্ছে হাই কোর্টে। বাংলাদেশের কত পারসেন্ট লোক প্রতিকারের জন্য হাই কোর্টে যেতে পারে?

সরকার জোর দিয়েই বলে যে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। সরকারী দলের কিছু হোমড়া চোমড়া ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ক্যাসিনিও ও মানি লন্ডারিং মামলায় গ্রেফতার করলেই কি আইন শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়? সংবিধানের ২৭নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত “আইনের দৃষ্টিতে সমতা” যদি প্রতিষ্ঠিত হয় তবেই বলা যাবে যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সংবিধানের উক্ত অনুচ্ছেদকে পায়ের তলায় পৃষ্ঠ করে ফেলেছে। যেমন সরকারী দল যখন কোন মিছিল করে তখন পুলিশ পাহাড়া দেয়, অথচ বিরোধী দল তাদের দাবী আদায়ের জন্য রাস্তায় নামলেই পুলিশ পিটায়, কাদানী গ্যাস দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে, গ্রেফতার করে রিমান্ড বানিজ্য করে। এ ভাবেই নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের সমতা রক্ষা করছে (!)

সম্প্রতিকালে দেখা যাচ্ছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারাই অপরাধে বেশী জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশের অনেক লোককে জেলে পাঠানো হয়েছে। দুদকের বেড়াজ্বালে আটকা পড়ছে সরকারী আমলারা। নিজ পধস্থ কর্মচারীরাও কোটি কোটি টাকার মালিক। স্বাস্থ্য বিভাগের একজন ড্রাইভারের সম্পদ দেখলে মাথা চড়ক গাছের মতো ঘুরতে থাকে। আমলারা নিজেরাই এখন দলবাজী করে। এ দলবাজী থেকে জাতিকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় তাদের জন্য দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। তিনি পরিতাপের বিষয় এই যে, মন্ত্রীরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের একটি নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেছেন। কারণ নিজস্ব বাহিনী না থাকলে মন্ত্রীদের জিন্দাবাদ দেয়ার লোক পাওয়া যাবে না। ৪র্থ শ্রেণী কর্মচারীরা ট্রেড ইউনিয়ন করার সূযোগ পায় বিধায় সে সূযোগের অপব্যবহার করে মন্ত্রীর সাথে “সখ্যতা”কে বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে, যে টাকা রাখার জন্য কোন ব্যাংকে নিরাপদ মনে করে নাই বিধায় খাটের নীচে, বিছানার নীচে বা বালিশের ভিতর টাকা পাওয়া যাচ্ছে।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জনগণকে গিনিপিক হিসাবে ব্যবহার করছে। আধুনিক পুলিশের জন্মদাতা রবাট পীল এর মতে “জনগণই পুলিশ এবং পুলিশই জনগণ” এবং তিনি আরো বলেছেন যে, জনগণের যা অনুমোদন করে না তা পুলিশের কর্ম হতে পারে না। পুলিশ বাহিনীকে আধুনিকভাবে ঢেলে সাজানোর জন্য সরকারের বারংবার প্রতিশ্রুতি কোন কাজে আসে নাই। কারণ রাষ্ট্র নিজেই ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য পুলিশকে অনৈতিক কাজে ব্যবহার করে।

বর্তমানে আমলাদের দেশে একটি পেশাধার প্রশাসন ও পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গড়ে উঠা আবশ্যক। যারা সংবিধান মোতাবেক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করবেন এবং সিনিয়র ডিঙ্গিয়ে প্রমোশন ও লোভনীয় পোষ্টিং এর জন্য সরকারের অনৈতিক কর্মকান্ডের সেবাদাস হিসাবে গড়ে না তুলে একটি গণমূখী প্রশাসনে পরিনত হবে।

জমি রেজিষ্ট্রী করার ৮ দিনের মধ্যে মিউটেশন বা নামজারী করার জন্য সরকারের সিদ্ধান্ত একটি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। অনুরূপ ভাবে সরকারের দায়িত্ব হবে প্রশাসনকে এসি রুমের পরিবর্তে জনগণের গোরদরজায় পৌছে দেয়া যার ফলশ্রুতিতে একটি গণমূখী প্রশাসন আমাদের রাষ্ট্রে সৃষ্টি হতে পারে।

সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার ও বিশেষতঃ আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।” সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করলে রাষ্ট্র কি সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ মোতাবেক জনগণ কি সুবিধা বা অধিকার ভোগ করতে পারছে?

সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দলিল, যার অংশিদার দেশের সমস্ত জনগণ। কিন্তু দেশের রাষ্ট্রীয় সকল সূযোগ সুবিধা ও অধিকার একটি গোষ্টি ভোগ করছে, বাকীরা বঞ্চিত। এ বঞ্চনা থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে জাতীয় অসন্তোষ্টি। এ অসন্তোষ্টি দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে, নতুবা জাতীয় বিভক্তি দূরীভূত হবে না।

লেখক

রাজনীতিক, কলামিষ্ট ও আইনজীবি (এ্যাপিলেট ডিভিশন)

LEAVE A REPLY