ইংরেজি সাহিত্যের পড়ুয়া কবি পাল তুলেছিলেন ইসলামি সাহিত্যের নৌকায়।

আপডেট: নভেম্বর ২৮, ২০২০
0

বিংশ শতাব্দীর ইসলামি ভাবধারার বাহক কবি ফররুখ আহমদ স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।

একজন ‘ইসলামিস্ট’ হবার জন্য কিভাবে নিগৃহীত, অবহেলিত হতে হয় সেটাও আমরা ফররুখের জীবনে দেখেছি। তাঁর চাকরি চলে যায়, কবি মহলে অবজ্ঞার পাত্রে পরিণত হতে হয় তাঁকে। ১৯৭৪ সালে নজরুলের জন্মবার্ষিকীতে দেশের সকল খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিক দাওয়াত পেলেও দাওয়াত জোটেনি তখনকার শক্তিশালী কবি ফররুখের। কারণ জিজ্ঞেস করা হলে বলা হয়, “তিনি এখন একজন ‘ইসলামি কবি’ এজন্য দাওয়াত দেওয়া হয়নি।”

ফররুখ আহমদ ইসলামি সাহিত্যের পাল তোলা নৌকায় হাল ধরলে তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় সমালোচনার তীর নিক্ষেপ।
কেউ কেউ সামনাসামনি বলতো, কেউবা পত্র-পত্রিকায় সমালোচনা করতো।

সাহিত্যের মধ্যে ‘ইসলাম’ নিয়ে আসাকে অনেকেই ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ বলতো। তাদের কাছে সাহিত্য বলতে ছিলো, প্রেম, মানবতাবাদ, বিপ্লব; যেখানে ধর্মের কোনো ছিটেফোঁটা থাকবে না।

কলকাতায় এক সাহিত্য আড্ডা শেষে অজিত দত্ত ফররুখকে বলেই ফেললেন, “আপনি ধর্মকে কবিতায় আনেন কেনো? এখনকার সময় হচ্ছে মানুষের (মানবতার সময়)। এখন কি মধ্যযুগের ধর্মের সময় আছে?” এমন তীক্ষ্ণ আঘাতের সাবলীল জবাব দেন ফররুখ আহমদ। তিনি বলেন, “আমি তো ধর্ম নিয়ে কবিতা লিখি না, আমি কবিতা লিখি ইসলাম নিয়ে। আর ইসলাম তো চিরন্তন মানব ধর্ম।”

মানবধর্ম, মানবতাবাদ নামে অনেকেই নিজের মনগড়া তত্ত্ব আবিষ্কার করেন, অনেকেই সমাজতন্ত্র থেকে মানবতাবাদ খুঁজতে থাকেন। কিন্তু, ফররুখ আহমদ মানবতার সবক নেবার জন্য অন্য কোনো জীবনাদর্শে নোঙর ফেলেননি, তাঁর নোঙর তো ইসলামি আদর্শের মধ্যে। মানবতার বুলি যে ইসলামের আঙ্গিনা থেকে তোলা যায়, সেই সুর তাঁর ‘সিরাজুম মুনিরা’ আর ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থে দেখান।

চাকরি চলে যাবার পর মেয়ের চিকিৎসা করাতে পারেননি। মেয়ে মারা যায়। পরিবার নিয়ে অনাহারে দিনাতিপাত করেন, তবুও ফররুখ কারো কাছে হাত পাতেননি। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ দুশো টাকা নিয়ে যান ফররুখের দুর্দিনে সহযোগিতা করার জন্য, ফররুখ উল্টো ধমক দিয়ে তাকে ফিরনি খাইয়ে বিদায় করেন। প্রকাশক তৈয়েবুর রহমান ফররুখকে আর্থিক সাহায্য করতে গেলে ফররুখ কথা ঘুরিয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে যান।

যে কবি ‘তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে, খোদার মদদ ছাড়া’ কবিতা লিখেন, তিনি কিভাবে মানুষের দুয়ারে হাত পাতেন? তিনি আর দশজন কবির মতো ছিলেন না। যা লিখতেন, সেটা নিজে ধারণ করতেন। কবির লাইফস্টাইল নিয়ে ছোট্ট একটা রিভিউ দেন তাঁর মেয়ে ইয়াসমিন বানু। “আব্বা বলতেন, ‘দাম্ভিক পরহেজগারের চাইতে অনুতপ্ত পাপী ভালো’। জীবনে জ্ঞান থাকাবস্থায় তিনি সাধারণত নামাজ কাযা করেননি। শরীর ভীষণ অসুস্থ থাকাবস্থায় ত্রিশটি রোজাই রেখেছেন। নবিজীর সুন্নতকে ভালোবাসতেন বলে কাপড়ে তালি দিয়ে পরতেন।”

একজন ইসলামিস্ট জীবিতাবস্থায় সেক্যুলারদের কাছে বিভীষিকার মতো ভয়ানক। সেক্যুলাররা একজন ইসলামিস্টের ডেডবডিকেও যে ভয় পায়, সেটার প্রমাণ পাই ফররুখ আহমদের মৃত্যুর পর। তাঁর কবর দেওয়া নিয়ে যে রাজনীতি হয়, সেই ঘৃণ্যতম ইতিহাসের দলীলে আমরা কালো কালিতে তাদের নাম লিখে রাখবো!

আর ফররুখদেরকে তো আমরা হৃদয়ের মসনদে আসন পেতে দেবো৷ যিনি ক্ষণে ক্ষণে আমাদেরকে রিমাইন্ডার দিবেন- “রাত পোহাবার কতো দেরী, পাঞ্জেরী?”

লেখাটি মিম্বার ফেসবুক গ্রুপের “মিম্বার ম্যাগাজিন” থেকে সংগ্রহীত।