গাজীপুরে ব্যতিক্রমী চাকুরি মেলা,  হাজারো চাকুরি প্রার্থীর পদচারণায় মুখরিত মেলা প্রাঙ্গণ 

আপডেট: জানুয়ারি ৮, ২০২৩
0

স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর \ দেশের স্বনামধন্য শিল্প কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে কর্মস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্যতিক্রমী চাকুরি মেলার আয়োজন করেছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন। চাকুরিপ্রার্থী ও চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি সংযোগ সৃষ্টি করতে নেয়া হয়েছে এমন উদ্যোগ। কোন প্রকার তদবির ছাড়াই চাকুরির জন্য যোগ্য প্রার্থীরা শুধু চমৎকার ও আকর্ষণীয় একটি সিভি নিয়ে হাজির হলেই চাকরি পাবেন। যোগ্যপ্রার্থীদের মধ্যে থেকে প্রায় ১২শ’ বেকার এ মেলার মাধ্যমে চাকুরি পাবেন বলে আশা করছেন আয়োজকরা। শনিবার দুই দিনব্যাপী এ চাকুরি মেলার উদ্বোধন করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি।

গাজীপুর জেলা শহরের ভাওয়ালবাড়ি মাঠে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো শনিবার হতে দুইদিন ব্যাপী এ মেলার আয়োজন করা হয়। রবিবার বিকেল পর্যন্ত চলবে এ মেলা। এ চাকুরি মেলায় বেক্সিমকো টেক্সটাইল লি., স্কয়ার টেক্সটাইল মিলস এন্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লি., নেসলে বাংলাদেশ লি., ওয়ালটন গ্রুপ, প্রাণ আরএফএল গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, বাটা গ্রুপ, ইপিলিয়ন গ্রুপ, ট্রান্সকম, মিনিস্টারসহ ছোট-বড় প্রায় ৪০টির মতো প্রখ্যাত শিল্প প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহন করেছে। এছাড়াও সরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, জাতীয় মহিলা সংস্থা, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়সহ জেলা প্রশাসনের দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক তথ্য সম্বলিত স্টল রয়েছে। 

শনিবার মেলা এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই হাজারো চাকুরী প্রার্থীর পদচারণায় মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠে। চাকুরী প্রার্থী বিভিন্ন বয়সী ছেলে মেয়েরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টলে গিয়ে চাকুরী দাতা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারছেন। নতুন চাকুরির আশায় জীবন বৃত্তান্ত জমা দিচ্ছেন তারা। গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলার বেকার যুবক যুবতীদের পাশে দাঁড়াতে মেলায় অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।

চাকরি লাভের আশায় বাবা বিনয় দেবের সঙ্গে এসেছেন তনয় কিশোর দেব। তার সঙ্গে আছে ছোট বোন তনয়া রানী দেবী। তারা বিবিএ’র শিক্ষার্থী। তাদের সঙ্গে এসেছেন ফুপাতো বোন কৃষ্না রানী দাস। তিনি ঢাকা নিউ মডেল ডিগ্রী কলেজ থেকে এমবিএ’র শিক্ষার্থী। চাকুরি লাভের প্রত্যাশায় যোগ্যপদের জন্য আবেদন করতে এসেছেন তারা। একাধিক প্রতিষ্ঠানেও আবেদন করেছেন তারা। তারা জানান, এখানে একসঙ্গে এতগুলো বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান দেখে আমরা অভিভূত। আমরা তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি, তারা কি ধরণের লোক চায় সেসব বিষয়ে ধারণা পেয়েছি। এছাড়াও প্রতিষ্ঠাণগুলো সম্পর্কে আমরা বিশদ ভাবে জানতে পেরেছি। এতে আমাদের অভিজ্ঞতা, সাহস ও আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে। আশা করছি মেলা থেকেই আমরা যোগ্যপদে চাকুরি পাব।

জেলা শহরের ছায়াবিথী এলাকা হতে চাকুরি লাভের আশায় চাকুরি মেলায় এসেছেন সানজিদা ইসলাম। তিনি বিএসএস ফাইনাল ইয়ারের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, আমার কাছে এ ধরণের মেলা এটাই প্রথম। কোন রকম তদবির বা ঘুরাঘুরি-হয়রানি ছাড়াই এখানে সরাসরি চাকুরি দাতা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা যাচ্ছে। তাদের চাহিদা জানা যাচ্ছে, সত্যিই অসাধারণ বিষয়। এখানে এসে অনেক কিছু জানার সুযোগ পেয়েছি। 

মেলায় আলোচক হিসাবে অংশ নেন বিডিজব লি: এর এজিএম (প্রোগ্রাম) মোহাম্মদ আলী ফিরোজ। তিনি বলেন, মেলায় চাকুরি প্রার্থীদের বিরাট উপস্থিতি লক্ষণীয়। তিনি বলেন, অনেক সময় চাকুরি প্রার্থী মনোনয়ন/নিয়োগ বোর্ডের সামনে গিয়ে মাথার চুল আচঁরায়, শার্টের কলার বা কাপড় ঠিক করে। অনেকে বুঝাতে চায় চাকুরিটা তার কতবেশী প্রয়োজন। আমরা তাদের বুঝাতে চেয়েছি, কিভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে। আপনার সমস্যার কথা শুনে কেউ আপনাতে চাকুরি দিবে না। এজন্য নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে। 

বেক্সিমকো গ্রুপের স্টলে গিয়ে দেখা গেল, প্রতিষ্ঠানটি ৫টি ক্যাটাগরিতে চাকুরি দেওয়ার জন্য মেলায় এসেছে। এসব পদের জন্য তারা দুটি বাক্সে আবেদন গ্রহণ করছেন। সিনিয়র ব্যবস্থাপক (এইচআর) সৈয়দ শাকিল আহাদ জানান, বেক্সিমকো আশা করছে মেলা থেকে চাকুরি দেয়ার জন্য কমপক্ষে ২৫০-৩০০ জন যোগ্যপ্রার্থী পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, আমরা ২৫ হাজার টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা বেতনের চাকুরি দেয়ার জন্য যোগ্যপ্রার্থীর অপেক্ষায় এখানে আছি। ভবিষ্যতে আমাদের নতুন চারটি প্রকল্পে আরো তিন হাজারের বেশি লোক লাগবে। আমাদের কাছে জমা দেওয়া সিভি থেকে আমরা তাদেরও বাছাই করার চেষ্টা করবো।

মেলার উদ্বোধন করে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, আমাদের দেশকে স্বাবলম্বী করতে হবে, এজন্য দক্ষ জনবল প্রয়োজন। আমাদের দেশে যে সমস্ত কলকারখানা রয়েছে সে সকল কারখানায় লোকজনকে চাকুরি দেয়ার পর দেখতে হবে কি ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন। সে অনুযায়ী দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলতে হবে। তিনি আরো বলেন, বিসিএস সহ চাকুরির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার কোঠা আরো বাড়ানোর জন্য কাজ করছে সরকার। চাকুরি প্রার্থীদের জানতে হবে নিয়োগকারীরা কি ধরণের স্কিলড লোক চায়। সেভাবেই নিজেদের তৈরী করতে হবে। এ সময় তিনি চাকুরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ারও আহ্বান জানান। 

মন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় যেন বেকার সৃষ্টির কারখানা না হয় সেদিকটায় নজর দিতে হবে। এমনটা হলে সেটা শুধু রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হবে। শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী যোগ্যতম নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে উদ্যোক্তা হতে হবে। এ জন্য সরকার ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের উপর জোর দিয়েছে। এতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে উঠতে সহায়ক হবে। 

মেলার আয়োজক গাজীপুর জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান বলেন, আমাদের গাজীপুরে প্রচুর প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে চাকুরি পাওয়া সম্ভব। চাকুরি প্রার্থী ও চাকুরিদাতার মধ্যে যাতে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা যায়, সেজন্য আমরা এ মেলার আয়োজন করেছি। এখান থেকে আমাদের শিক্ষিত প্রজন্ম প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংস্পর্শে এসে নিজেদের ঘাটতি গুলো বুঝতে পারবে, কোন মাধ্যম বা তদবির ছাড়াই কম সময়ে চাকুরি লাভের সুযোগ পাবে। এতে করে প্রতিষ্ঠান গুলোও লাভবান হবে। তিনি আরো জানান, মেলায় বেক্সিমকো, স্কয়ার, নেসলে, ওয়ালটন, প্রাণ আরএফএল, বাটাসহ দেশসেরা ৪০টির মতো প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। আশা করছি রবিবার মেলার শেষে এখান থেকে অন্ততঃ ১২শ লোকের চাকুরির সু সংবাদ দিতে পারবো।

তিনি আরো জানান, মেলায় বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাগণ তাদের কাজ করার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হচ্ছে। ক্যারিয়ার বাছাই, জীবন বৃত্তান্ত প্রস্তুতকরণ ও দক্ষতা-অভিজ্ঞতা কিভাবে বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয় নিয়ে মূল্যবান পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। চাকুরি ও ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য প্রযুক্তি ও ভাষাগত দক্ষতা কিভাবে বৃদ্ধি করা যায় ও এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা করা হচ্ছে। 

গাজীপুর জেলা প্রশাসন আয়োজিত দুইদিন ব্যাপি চাকুরী মেলা- ২০২০-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম, কুমিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো: গিয়াসউদ্দিন মিয়া, বিজিএমইএ-র সভাপতি ফারুক হাসান, গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন) মোঃ ওয়াহিদ হোসেন, ভাষা শহিদ কলেজের অধ্যক্ষ মুকুল কুমার মল্লিক প্রমুখ। 

উল্লেখ্য মেলায় কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারি দপ্তরসমূহ সহ গাজীপুরে অবস্থিত বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলার প্রখ্যাত শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের ৫০টি স্টল দেয়া হয়েছে। উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে চাকুরিদাতা ও চাকুরিপ্রার্থীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন ও চাকরি প্রার্থীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে চাকুরি মেলা ইতিবাচক ভ্থমিকা রাখবে। শিক্ষিত ও দক্ষ হাজারো বেকারের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো এ মেলার আয়োজন করা হয়েছে।