জমে উঠেছে স্বরূপকাঠির আটঘর-কুড়িয়ানার শতবর্ষের নৌকার ভাসমান হাট

আপডেট: জুলাই ১৫, ২০২০
0

রাহাদ সুমন,বিশেষ প্রতিনিধি :

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীপথ সরু হয়ে আসলেও অথবা শুকনা মৌসুমে নদীর অবস্থা যেমন-তেমন থাকলেও বর্ষা মৌসুমে দেশের সব খাল-বিল-নদী-নালা হয়ে ওঠে যৌবনবতী। তখন নদী-নালাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে গ্রাম্য বাজার বা হাট। পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির আটঘরে বসে তেমন একটি হাট।এ দেশে নৌকা,নদী ও মানুষের জীবন অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত।

এখানে মানুষ নদী ও নৌকার পারস্পরিক সম্পর্কের কথা বলে শেষ করা যাবে না। নৌকার ব্যবহার সারা বছর ধরে চললেও বর্ষাকালে তা অনেকটাই বেড়ে যায়। নৌকা চালাতে তো বৈঠা লাগবেই। তাই বৈঠাও বিক্রি হয়। বরিশালের গ্রামীণ জনপদের বেশিরভাগ মানুষের চলাচল,পণ্য পরিবহন, জীবন-জীবিকা নদী, খাল ও বিলের ওপর নির্ভরশীল।


যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সড়কপথের উন্নয়ন ঘটেছে তবে নদী, খাল ও বিল বেষ্টিত এ অঞ্চলে নৌ-যানের ওপর নির্ভরশীলতা কমেনি সাধারণের। তাই বৈঠার নৌকাসহ ইঞ্জিনচালিত বিভিন্ন নৌ-যানের চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলছে এ অঞ্চলে। গত চারমাস যাবত প্রাণঘাতি করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যে প্রভাব পড়লেও তেমনটা ঘটেনি নৌকার হাট-বাজারে।

বর্ষার শুরু থেকেই এ অঞ্চলে নৌকার হাটগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের মতোই বেচা-বিক্রি হচ্ছে। নৌকার হাটে আসা ক্রেতা-বিক্রেতারা বলছেন,বর্ষাকালে নদী ও খাল-বিল পানিতে টইটুম্বর থাকায় নৌকাই হয়ে ওঠে স্থানীয় যাতায়াতের প্রধান চালিকা শক্তি। ফলে প্রতিবছর বর্ষায় শুরু হওয়ার আগ থেকেই নৌকা তৈরির কারিগররা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ক্রেতাদের চাহিদামতো স্ত্রী, সন্তান নিয়ে দিন-রাত পরিশ্রম করে ছোট-বড় নৌকা তৈরি করেন এর কারিগররা। যা হাট-বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহও করছেন এ অঞ্চলের অসংখ্য পরিবার। সেই হিসেবে সারাবছর যেমন তেমন গেলেও বর্ষায় নৌকার বাজার জমজমাট থাকছে প্রতিবছর। জানা গেছে, বিভাগের ছয় জেলায় মানুষের চলাচলসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে নৌকার ব্যবহার এখনো রয়েছে।

বিশেষ করে খাল-বিল ও নদীতে মাছ শিকারে এ অঞ্চলে এখনো হাত বৈঠায় চালিত নৌকার ব্যবহার বেশি হয়ে থাকে। আবার বর্ষায় নিম্নাঞ্চলগুলো পানিতে নিমজ্জিত থাকায় সাধারণ মানুষকে পুরোপুরি নৌকার ওপর নির্ভর হয়ে পড়তে হয়। সরেজমিনে স্বরূপকাঠির আটঘর-কুড়িয়ানার হাটে গিয়ে দেখা যায়, খালে ও রাস্তার দু‘ধারে কেবল নৌকা আর বৈঠা। আগে নৌকা তৈরি হত সুন্দরী কাঠে, এখন নৌকা তৈরিতে বেশিরভাগ কারিগর মেহগনি কাঠ ব্যবহার করেন, ব্যতিক্রমও আছে। কেউ কেউ রেইন্ট্রি,গাব, চম্বল, বাদাম, বা আমড়া গাছ দিয়েও নৌকা তৈরি করেন।
ভাসমান হাটে মেহগনি, চাম্বল, কড়াই ও রেইনট্রি গাছ দিয়ে নির্মিত এসব সারি সারি নৌকা দেখতে স্থানীয় ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ী আর উৎসুক মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো। যে দিকে চোখ পড়ে সেদিকেই দেখা যায় সারিবদ্ধ বিভিন্ন আকারের নৌকা আর নৌকা। এদিকে এসব নৌকার কাঠ ও আকার ভেদে রয়েছে দামের ভিন্নতা। চাম্বল কাঠ দিয়ে তৈরি একটি আটহাত দীর্ঘ নৌকা বিক্রি হয় ১৮শ থেকে ২২শ টাকায়। এছাড়া ৯, ১০ ও ১২ হাত সাইজ পর্যন্ত বাহারি ডিজাইনের নৌকাও আসে এখানে। স্বরূপকাঠির আটঘর-কুড়িয়ানার পেয়ারা বাগান চাষি নিরঞ্জন জানান, বর্ষাকালে বাগান পরিচর্যা করতে ছোট ছোট খাল পেরিয়ে বাগানে যেতে নৌকার প্রয়োজন হয়। তাই এবছরও বর্ষার শুরুতে পছন্দমতো নৌকা কিনেছি। আর ডিঙি নৌকার সুবিধা হচ্ছে এগুলো খুব হালকা এবং সরু, তাই সহজেই যেমন নিয়ন্ত্রণ করা যায় এ নৌকা তেমনি দ্রুত চালনা করা যায়। তিনি আরো বলেন কৃষি কাজ পরিচর্যা, পেয়ারা বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ ও বিক্রি, বিল থেকে শাপলা তোলা, মাছ শিকার করাসহ নানান প্রয়োজনে নৌকা আমাদের কর্মজীবনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। যুগ যুগ ধরে নৌকা এখানকার দীর্ঘ সময়ের ঐতিহ্য বহন করে আসছে। এ যেন চিরচেনা বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যের কথা জানান দেয়। যদিও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্ষার কারণে ফসলি জমি কিংবা বসতবাড়ি নির্মাণ কাজ কমে যাওয়ায় অলস হয়ে পড়েন কাঠমিস্ত্রিরা। তাদের এই অলস সময়ে নৌকা তৈরিতে লেগে পড়েন তারা। গ্রাম ঘুরে অপেক্ষাকৃত কম দামের জারুল, রেইনট্রি, চাম্বল, কদম, রয়না ও আম কাঠ দিয়ে ঘরে বসেই স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে কাঠমিস্ত্রিরা তৈরি করেন বিভিন্ন সাইজের নৌকা। তবে বিভিন্ন নৌকার মধ্যে চালনা সহজ ও ওজনে হালকা হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে তথা বরিশালের মানুষের কাছে ডিঙি নৌকার কদর একটু বেশি। আর ডিঙি নৌকার হাটগুলোর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী হচ্ছে বরিশাল জেলা সংলগ্ন পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানার হাট। নৌকার বাজার একশ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে এখনও আটঘর বাজার মাতিয়ে চলেছে বর্ষা ঋতুর প্রতি শুক্রবারে। আটঘর বাজারের খালে ঐতিহ্যবাহী এ ভাসমান নৌকার হাটটি বসে। শুক্রবার সকাল থেকে হাট বসলেও দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাটের রমরমা অবস্থা বাড়ে। সারা বিকেল থাকে জমজমাট অবস্থা। সন্ধ্যা হলেই হাটের আয়ু শেষ হয়ে যায়। এ হাটে নৌকার পাশাপাশি বৈঠা,মাছ ধরার চাই ও বুচন,নানা জাতের বনজ,ঔষধী,ফলদ ও সবজি চারা,পেয়ারাও বিকিকিনি হয়। এ হাটটিকে কেন্দ্র করে শত শত মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্বাহ হয়। এদিকে আটঘর কুড়িয়ানার ভাসমান নৌকার হাট ছাড়াও বরিশাল জেলার গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার কমপক্ষে ১০টি হাটে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে ডিঙি নৌকা। আগৈলঝাড়ার বারপাইকা গ্রামের নৌকা তৈরির কারিগর নকুল ঘরামী জানান, বর্ষার মধ্যেও নৌকা তৈরি তাদের পরিবারে স্বচ্ছলতা ধরে রেখেছে। যা অন্য কারিগরদের ক্ষেত্রে ঘটছে। তিনি জানান, স্থানীয় ব্যবসায়ী ছাড়াও স্বরূপকাঠি, বানারীপাড়া, উজিরপুর ও মাদারীপুর এলাকার ব্যবসায়ীরা এসে তাদের কাছ থেকে নৌকা কিনে নিয়ে যান। যা তারা অন্য বড় বাজারগুলোতে নিয়ে বিক্রি করেন। একেকটি নৌকা প্রকারভেদে দুই থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আটঘর-কুড়িয়ানার হাটের নৌকা পাইকার বিক্রেতা রফিক জানান,পিরোজপুরের স্বরূ“পকাঠি (নেছারবাদ),বরিশালের বানারীপাড়া,আগৈলঝাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এই সময়ে বাড়িতে বসে কারিগররা এসব নৌকা তৈরি করছেন। তাদের মতো পাইকাররা বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে এসব নৌকা ক্রয় করে হাটে এনে বিক্রি করছেন। কাঠ ও আকার অনুযায়ী এসব ডিঙি নৌকা বিক্রি করেন তারা। প্রকারভেদে আড়াই হাজার থেকে পাঁচ হাজার বা এর চেয়েও বেশি টাকা দরে এসব নৌকা বিক্রি করা হয়ে থাকে। আর নৌকা চালনার জন্য হাতের বৈঠা বা দ্বার তিন থেকে পাঁচশ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। যা আলাদাই কিনতে হয় ক্রেতাকে। আটঘর-কুড়িয়ানার হাটে নৌকা কিনতে আসা রমেশ চন্দ্র ও বিশ্বজিৎ হালদার জানান, বর্ষায় গো-খাদ্য সংগ্রহসহ চলাচলের জন্য আমাদের নৌকার প্রয়োজন হয়। দাম কিছুটা কম হওয়ায় প্রতিবছরই একটি করে ডিঙি নৌকা কিনেন। আর ডিঙি নৌকাটাও তৈরি হয় অনেকটা এক মৌসুম বা এক বর্ষার জন্য। তবে একাধিক মৌসুমে এক নৌকা ব্যবহার করতে চাইলে তার পেছনে খরচটাও বাড়াতে হয়। ###

রাহাদ সুমন,বানারীপাড়া

LEAVE A REPLY