‘জোছনা ও জননীতে ‘ যেভাবে শহীদ জিয়াকে নিয়ে লিখেছেন হুমায়ুন স্যার

আপডেট: জুলাই ২০, ২০২০
0

নাসিমুল গনির ফেসবুক থেকে:
স্যার হুমায়ুন আহমেদ এর ৭ম মৃত্যু বার্ষিকী.. গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি… স্যারের কোন সৃষ্টি নিয়ে কথা বলার ধৃষ্টতা আমার নাই – শুধু এই টুকু বলি হুমায়ুন আহমেদ অল্প কথায় আমাদের নেতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেছেন তা আমরা এতো বছরেও তুলে ধরতে পারি নাই..
মুক্তিযুদ্ধের বই জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাসে জিয়াউর রহমানকে পেজেন্ট করেছে এই ভাবে —
” তার চোখে কালো চশমায় ঢাকা । গায়ে ধবধবে সাদা হাফ হাতা গেঞ্জি। বসেছেন ঋজু ভঙ্গিতে। বাঁ হাতের কব্জিতে পড়া ঘড়ির বেল্ট সামান্য বড় হয়ে যাওয়ায় হাত নামানোর সময় ঘড়ি উঠানামা করছে। এতে তিনি সামান্য বিরক্ত, তবে বিরক্তি বুঝার উপায় নেই । যে চোখ মানবিক আবেগ প্রকাশ করে, সেই চোখ তিনি বেশীভাগ সময় কালো চশমায় ঢেকে রাখতে ভালোবাসেন। মানুষটার চারপাশে এক ধরনের রহস্য আছে ।
তার নাম জিয়াউর রহমান। তিনি তাঁবুর বাহিরে কাঠের ফোল্ডিং চেয়ারে বসে আছেন। চারপাশের দৃশ্য অতি মনোরম। যে দিকে চোখ যায় জঙ্গলময় উঁচু পাহাড়। কোন জনবসতি নেই। জায়গাটা মেঘালয় রাজ্যের ছোট্র শহর তুরা থেকেও মাইল দশেক দূরে। নাম তেলঢালা। মেজর জিয়া ঘন জঙ্গলের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে চোখ ফেরালেন আকাশের দিকে। আকাশে মেঘের আনাগোনা। এই মেঘে বৃষ্টি হয় না, তবে এই অঞ্চলে বৃস্টির ঠিক নেই। যে কোন মুহূর্তে ঝুমঝুমিয়ে বৃস্টি নামতে পারে।
প্রায় স্বর্গের কাছাকাছি এই অপূর্ব বনভূমিতে জড়ো হয়েছে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম, তৃতীয় এবং অষ্টম বাটালিয়ান। তাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে দুর্ধর্ষ এক পদাতিক ব্রিগেড, নাম ‘জেড ফোর্স ‘ । জিয়াউর রহমানের নামের প্রথম আদ্যাক্ষর জেড দিয়ে এই ফোর্সের নামকরণ ।” (পৃষ্ঠা -৪০৭)
স্বাধীনতার ঘোষনা নিয়ে বিরোধীরা অনেকেই অনেক কথা বলেন- কিন্তু বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পের জাদুগর হুমায়ুন আহমেদের জোছনা ও জননীর গল্পে একটি লেখাতেই বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন এই দেশের স্বাধীনতার ঘোষক কে ???
” ২৭শে মার্চ শনিবার রাত আঁটটায় রেডিওর নব ঘুরাতে ঘুরাতে এই দেশের বেশ কিছু মানুষ অদ্ভুত একটা ঘোষণা শুনতে পায় … মেজর জিয়া নামের কেউ একজন নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষণা দিয়ে বলেন – ”আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি” তিনি সর্বাত্মক যুদ্ধের ডাক দেন ।
দেশের মানুষের ভিতর দিয়ে তীব্র ভোল্টেজের বিদ্যুতের শক প্রবাহিত হয় … তাদের নেতিয়ে পড়া মেরুদণ্ড একটি ঘোষণায় ঋজু হয়ে যায় … তাদের চোখ ঝলমল করতে থাকে । একজন অচেনা অজানা লোকের কণ্ঠস্বর এতটা উম্মাদনা সৃষ্টি করতে পারে ভাবাই যায় না ।”
স্যারের রাজনৈতিক উপন্যাস ‘দেয়াল’ বইয়ে ১৮৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন –
“শুক্রবার ভোরে প্রেসিডেন্ট জিয়া নাস্তা খাচ্ছিলেন। আয়োজন সামান্য।
চারটা লাল আটার রুটি। দুই পিস বেগুন ভাজি। একটা ডিম সিদ্ধ ।
জিয়ার সঙ্গে নাশতার টেবিলে বসেছেন তার বন্ধু ও সহযোদ্ধা জেনারেল মঞ্জুর ।
জেনারেল মঞ্জুর বিস্মিত হয়ে বললেন, এই আপনার নাশতা ?
প্রেসিডেন্ট বললেন, হতদরিদ্র একটি দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই নাশতা কি যথেষ্ট না ?”
” জিয়াউর রহমানের পাঁচ বছরের শাসনে প্রতি মাঘের শেষে বর্ষন হয়েছিল কিনা তা কেউ হিসাব রাখেনি , তবে এই পাঁচ বছরে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি । অতি বর্ষনের বন্যা না , খরা না , জলোচ্ছাস না । দেশে কাপড়ের অভাব কিছুটা দূর হলো । দ্রব্যমূল্য লাগামছাড়া হলো না । বাংলাদেশের নদীতে প্রচুর ইলিশ মাছ ধরা পড়তে লাগলো ।
বাংলাদেশের মানুষ মনে করতে লাগলো অনেক দিন পর তারা এমন এক রাষ্ট্রপ্রধান পেয়েছে যিনি সত্‍ । নিজের জন্য বা নিজের আত্নীয়স্বজনের জন্য টাকা পয়সা লুটপাটের চিন্তা তার মাথায় নেই । বরং তার মাথায় আছে দেশের জন্য চিন্তা । তিনি খাল কেটে দেশ বদলাতে চান । জিয়া মানুষটা সত্‍ ছিলেন , এতে কোনো সন্দেহ নেই । লোক দেখানো সত্‍ না , আসলেই সত্‍ । তার মৃত্যুর পর দেখা গেল জিয়া পরিবারের কোনো সঞ্চয় নেই । ” ( পৃষ্ঠা -১৯৩)
লেখক ইমদাদুল হক মিলনের নেয়া দেশের সর্বোচ্চ জনপ্রিয় ও বিখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎকারের অংশ বিশেষ —
ইমদাদুল হক মিলন — ” আপনি শুনেছেন ?”
হুমায়ূন আহমেদ —- ” জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাটি আমার নিজের কানে শোনা। এই ঘোষণাটি বারবার রিপিট করছিল। এটা নিয়ে বিতর্ক হওয়ার তেমন কিছু নাই। আমি আমার বইপত্রেও একাধিকবার লিখেছি।
শোনা মিলন, জিয়াউর রহমান খুবই ভাগ্যবান একজন ব্যক্তি। তাঁর কাছে একটা রেডিও স্টেশন ছিল। তিনি প্রচারটা করতে পেরেছেন। আর বাকি যারা যুদ্ধ করেছেন, তাদের সামনে রেডিও স্টেশনটা ছিল না। তাঁরা প্রচারটা করতে পারেননি।
সেই অর্থে আমি বলবো, শহীদ জিয়াউর রহমান অসম্ভব ভাগ্যবান একজন মানুষ। যিনি ঐতিহাসিক এই ঘোষণাটি রেডিওতে দিয়েছেন। এই যুগান্তকারী ঘোষণা টি আমাদের জন্য খুবই জরুরি ছিল।
সেসময় আমাদের দেশের মানুষের নৈতিক শক্তি ও মনোবল ভীষণ ভেঙে পড়েছিল। জিয়াউর রহমান একটি জাতীয় ঘোষণার মাধ্যমে সেটাকে শক্তভাবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। এই একটি মাত্র ঘোষণার মাধ্যমে দিশেহারা বিপর্যস্ত দেশবাসী ভয়ঙকর অন্ধকারে আশার আলো দেখেছিল। এই সম্মান তাঁকে অবশ্যই দিতে হবে। কাউকে সম্মান জানিয়ে কেউ ছোট হয় না।
আওয়ামী লীগের যারা, তাঁরা হয়তো ভাবছেন, শহীদ জিয়াউর রহমানকে এই সম্মান জানালে তাঁরা ছোট হবেন। ব্যাপারটা মোটেই সেরকম নয়।
সেই চরম দুঃসময়ে জিয়াউর রহমান নামের সাহসী মানুষটির ঐতিহাসিক ঘোষণাটি দিশেহারা জাতির জন্য ভীষণ প্রয়োজন ছিল।” ।

LEAVE A REPLY