ধর্ষণ অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সুরক্ষায় জরুরী ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের দাবী

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২২
0

রেইপ ল’ রিফর্ম কোয়ালিশনের আয়োজনে, ইউ এন ওমেন এর সহযোগিতায় ডেইলী স্টার ভবনে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ‘ধর্ষণ অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনে করণীয়’ শীর্ষক এক মত বিনিময় সভা আয়োজন করে বাংলাদেশ রেইপ ল’ রিফর্ম কোয়ালিশনের সচিবালয়, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থায় ধর্ষণ অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তির বিধান বলবত থাকলেও, ধর্ষণ অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি বিষয়ক সুস্পষ্ট কোন বিধান নেই।

এই বাস্তবতায় আয়োজিত এ মতবিনিময় সভায় আলোচকবৃন্দের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ধর্ষণ অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির আর্থিক সুরক্ষায় যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি বিষয়ক বিধানটি বর্তমান আইন কাঠামোতে সংযুক্ত করা; বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী একটি আইন দ্রুত প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করা; প্রস্তাবিত এ ক্ষতিপূরণ আইনে কি কি বিধান সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত-করণ প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা এবং একইসাথে এ বিষয়ে বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী একটি ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ তহবিল’ গঠনের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করা এবং এ তহবিল সম্পর্কিত কার্যক্রমের নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কিভাবে নিশ্চিত করা যায়- এ বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা। আয়োজনে উপস্থিত সকলেই ধর্ষণ অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের জন্য জরুরী ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের বিষয়ে একমত পোষণ করেন।

বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর ট্রাস্টি বোর্ডের সম্মানিত সদস্য এডভোকেট জেড আই খান এর সভাপতিত্বে এবং ব্লাস্ট এর এডভোকেসী উপদেষ্টা এডভোকেট তাজুল ইসলাম-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেগম লুৎফুন্ননেসা খান, এমপি, সদস্য, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার, এমপি, সদস্য, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

উক্ত অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য রাখেন তাকবির হুদা, সমন্বয়কারী, জানো; শ্রবণা দত্ত, ইউ এন উইম্যান; এডভোকেট আইনুন নাহার সিদ্দিকা, এডভোকেট, সুপ্রীম কোর্ট বাংলাদেশ; তাসলিমা ইয়াসমিন, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আইন কমিশনের লেজিসলেটিভ ড্রাফটসম্যান (অতি. জেলা ও দায়রাজজ) মোঃ. মুর্শীদ আহমেদ এবং রেইপ ল’ রিফর্ম কোয়ালিশনের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ।

অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ব্লাস্ট- এর আইন উপদেষ্টা এস এম রেজাউল করিম বলেন, ‘’ আমরা জানি ধর্ষণের ফলে যদি কোন শিশু জন্ম নেয় তবে তার দায়িত্ব রাষ্ট্র নেয়, ঠিক একই ভাবে ধর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের দায়িত্বও রাষ্ট্রের নেওয়া উচিত।“

প্যানেল বক্তব্যে তাকবির হুদা বলে, “ধর্ষণের বিচার বলতে আমরা শুধু ফৌজদারি বিচার মনে করি,… কিন্তু বিচারের আরেক অংশ হতে হবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য ক্ষতিপূরণটা নিশ্চিত করা।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, ফৌজদারি বিচারের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়াটি আলাদাভাবে চলতে পারে। ক্ষতিপূরণ দাবীর ক্ষেত্রে শুধু অপরাধের শিকার হলেই হবে না বরং পার্সোনাল ইনজুরির বিষয়টিও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ আইন কমিশনের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ জনাব মুর্শীদ আহমেদ তার বক্তব্যে জানান যে, ‘দেশের একাধিক আইনে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণের জন্য তহবিল গঠনের দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে।‘ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে,’ নারী ও শিশু আইনে যদি ধর্ষণ সংক্রান্ত বিধানটি যোগ করা হয় তাহলে তা অধিক ফলপ্রসূ হবে।‘

ইউএন ওমেনের শ্রবণা দত্ত বলেন, “ এটা পরিষ্কার যে একটা অধিকার ভিত্তিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা দরকার।“ এসময় তিনি জোর দিয়ে বলেন যেন দ্রুত এই বিধানটি বর্তমান আইন কাঠামোতে সংযুক্ত করা হয়।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এমপি জনাব গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার, এমপি বলেন, “আমরা সবাই চাই তহবিল গঠন হোক”। তিনি আরও জোর দেন যেন ধর্ষণের জন্য তহবিলের পাশাপাশি ধর্ষণ মামলার বিচারও যেন দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হয়। তিনি আশ্বস্ত করে জানান যে তিনি এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা করবেন এবং তিনি আরও জানান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বিধবা নারী থেকে শুরু করে স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের জন্য ভাতা দিচ্ছেন সেহেতু অবশ্যই এ বিষয়ে ব্যবস্থা তিনি করবেন।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, জনাব বেগম লুৎফুন্ননেসা খান বলেন, ‘ধর্ষণের অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের জন্য তহবিলটি যেন সামাজিক সুরক্ষার অন্তর্গত হয়।‘ তিনি মন্তব্য করে বলেন, ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাটিতে যেন পুনর্বাসনের সুবিধা থাকে।

বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর ট্রাস্টি বোর্ডের সম্মানিত সদস্য এডভোকেট জেড আই খান তার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, “ধর্ষণ অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের জন্য তহবিলটির যে প্রয়োজন আছে সে বিষয়ে সকলে একমত”। তহবিলটির ধরণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানান, এ জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে যেন এই ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তিনি আরও দাবী করেন, ধর্ষণ অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির চিকিৎসার সুবিধা যেন জেলা পর্যায়ে উপলব্ধ থাকে।

সবশেষে, দ্রুততম সময়ে তহবিল গঠনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে অনুষ্ঠানের সমাপনী ঘোষণা কর হয়।