‘পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানীই প্রথম ‘ আসসালামু আলাইকুম’ উচ্চারণ করেন কাগমারী সন্মেলনে’

আপডেট: নভেম্বর ১৬, ২০২১
0


লায়ন আনোয়ার হোসাইন উজ্জ্বল :

মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, (১২ ডিসেম্বর ১৮৮০ – ১৭ নভেম্বর ১৯৭৬) যিনি মাওলানা ভাসানী নামে পরিচিত, ছিলেন বিংশশতকী ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম তৃণমূল রাজনীতিবিদ ও গণআন্দোলনের নায়ক, যিনি জীবদ্দশায় ১৯৪৭-এ সৃষ্ট পাকিস্তান ও ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে “মজলুম জননেতা” হিসাবে সমধিক পরিচিত। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠনকারী প্রধান নেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায়ও তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি মাওপন্থী কম্যুনিস্ট, তথা বামধারার রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তার অনুসারীদের অনেকে এজন্য তাকে “লাল মওলানা” নামেও ডাকতেন। তিনি কৃষকদের জন্য পূর্ব পাকিস্তান কৃষক পার্টির করা জন্য সারাদেশ ব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা এবং পঞ্চাশের দশকেই নিশ্চিত হয়েছিলেন যে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ একটি অচল রাষ্ট্রকাঠামো। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের কাগমারী সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের ‘আসসালামুআলাইকুম ‘ বলে সর্বপ্রথম পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন।

রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন। জয়পুরহাট-এর পাঁচবিবিতে মহিপুর হক্কুল এবাদ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন যার অধীনে একটি মেডিকেল, টেকনিক্যাল স্কুল,হাজী মুহসিন কলেজ(প্রস্তাবিত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় )প্রতিষ্ঠা করেন, পরে সেটি জাতীয়করণ করা হয়। আসামে ৩০ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কারিগরী শিক্ষা কলেজ, শিশু কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন সন্তোষে। এছাড়াও তিনি কাগমারিতে মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ সন্তোষে (সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়)যা কিনা “মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়” ২০০২ সাথে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে ৩য় স্থান এ আছে।

এবার আসা যাক মুল আলোচনায়: আফ্রো-এশিয়া-লাতিন আমেরিকার মজলুম মানুষের সংগ্রামে প্রেরণার দীপশিখা হিসেবে খ্যাত মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪৪ তম ওফাত বার্ষিকী মঙ্গলবার , ১৭ নবেম্বর ২০২০ তারিখ।
পশ্চিমী দুনিয়ার গণমাধ্যম তাঁকে ‘ফায়ার ইটার’ বা অগ্নিভূক, ‘রেড মুলানা অব দ্য ইস্ট’ বা প্রাচ্যের লাল মওলানা ইত্যাকার বিশেষণে চিত্রিত করলেও তিনি স্টকহোমে আফ্রো-এশীয় শান্তি-সন্মেলনে সভাপতিত্ব করেছেন। বিশ্ববিশ্রুত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে যৌথবিবৃতি দিয়েছেন যুদ্ধবাদিতার বিরুদ্ধে। টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করেছে; দিয়েছে ‘প্রোফেট অব ভায়োলেন্স’ বা সহিংসতার ধর্মপ্রবর্তক তকমা। তবে নির্যাতীত মানুষ তাঁকে উৎপীড়নবিরোধী সংগ্রামের মহানায়ক হিশেবেই শ্রদ্ধা করে এসেছে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ এই দু’টি রাজনৈতিক দলের তিনি প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ন্যাপের তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তান শাখা বিলুপ্ত করলে এই দলের নেতা-কর্মীদের নিয়েই জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তান পিপলস পার্টি গঠন করেছিলেন। মওলানার ইন্তেকালের পর বাংলাদেশে ভাসানী ন্যাপ বিলোপ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির মূল রাজনৈতিক স্রোতধারা তৈরি হয়। ভাসানী ন্যাপের নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ হয় বিএনপিরও প্রতীক।
পূর্ববঙ্গের কৃষক-প্রজাদের নিয়ে সামন্ত-জমিদার বিরোধী লড়াই চালিয়ে, আসামে ‘বাঙ্গাল খেদা’ নামের জনগোষ্ঠীগত হিংস্রতা রুখে দিয়ে এবং কুখ্যাত লাইন প্রথাবিরোধী সংগ্রামের পুরোভাগে থেকে অভিজ্ঞতা সন্চয় করে তিনি খেলাফত আন্দোলনের পথ বেয়ে উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতার সংগ্রামে উঠে আসেন নেতৃত্বের কাতারে।

পাকিস্তান আমলে আমাদের জাতীয় চেতনা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের তিনিই ছিলেন প্রথম তূর্যবাদক। বাঙলা ভাষা ও সংষ্কৃতির বিরুদ্ধে পাকিস্তানি শাসকদের বৈরিতার বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রাম গড়ে তোলেন। ভাষা আন্দোলনকে দুর্নিবার করে তোলার পাশাপাশি তিনি সাহিত্য-সংষ্কৃতি সন্মেলন আয়োজন করেন। একজন জননেতার এমন ভূমিকা এই জনপদের ইতিহাসে অনন্য। মওলানা ভাসানীই প্রথম পাকিস্তানি শাসন ছিন্ন করতে ঐতিহাসিক আসসালামু আলাইকুম উচ্চারণ করেন কাগমারীর ইতিহাসখ্যাত সন্মেলনে। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং এই আন্দোলনের পথপ্রদর্শকও ছিলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনাকারী সরকারের সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি ছিলেন তিনি।

স্বাধীনতার পরেও আমাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, জনগণের অধিকার রক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় তিনি নিরলস সংগ্রাম করে গেছেন। এ কারণে তদানীন্তন আওয়ামী সরকার তাঁর পত্রিকার প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি মওলানা ভাসানীর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখে। জীবন সায়াহ্নে এসেও গঙ্গার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে তিনি ঐতিহসিক ফারাক্কা লংমার্চের ডাক দেন এবং এতে নেতৃত্ব দেন। কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ তাৎপর্যবাহী জাতীয় সম্মেলন যা পরবর্তীতে পাকিস্তানের বিভক্তি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ে বিশেষ ইঙ্গিতবহ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৫৭ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টাঙ্গাইল জেলার কাগমারী নামক স্থানে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ৮ই ফেব্রুয়ারি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি আরম্ভ হয়।

মহানবী(সা.)-র সাম্যবাদী সাহাবী হযরত আবু জর গিফারী(রা.)-র ‘রবুবিয়ত’ দর্শনে গভীরভাবে আস্থাশীল ছিলেন মওলানা ভাসানী। খেলাফতে রাব্বানী বা বিশ্বপ্রভুর প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রীয় সমাজ গড়াই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। মানুষের সেবা ও নিজের জীবনাদর্শ প্রচারের জন্য গড়ে তুলেছেন খোদায়ী খিদমতগার সমিতি। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি জনপ্রিয় বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করেছেন। উন্নত শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে আধুনিক সাচ্চা মুসলিম গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্থাপন করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সাম্প্রদায়িকতা ছিল তাঁর দু’চোখের বিষ। ধর্মের নামে বিভেদ, হানাহানি, উগ্ররতা, কুসংষ্কার ও গোড়ামীকে প্রশ্রয় দেননি তিনি কখনোই। ইসলামের সাম্যবাদী ভাবাদর্শ ও সমাজবাদী দর্শনের সংমিশ্রণে একটি শোষণহীন-সাম্য-মৈত্রীর সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল এই লোকায়িত জননায়কের আজন্মলালিত স্বপ্ন। মওলানা ভাসানী শতাব্দিব্যাপ্তপ্রায় তাঁর জীবনকালে বিশ্বের খ্যাতনামা রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, দার্শনিক, সমাজ সংষ্কারক ও সাহিত্য-সংষ্কৃতির দিকপালদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। শোষণ, পীড়ন, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর প্রাণপণ লড়াই। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের পোশাক পরে, মাটির শানকিতে কৃষকের খাদ্য খেয়ে, গ্রামের পর্ণ কুটিরে বাস করেও তিনি ছিলেন দুর্বিনীত শাসকদের ত্রাস। তাঁর ডাকে পঙ্গপালের মতো লাখ লাখ মানুষ নেমে আসতো ঘর ও কর্মস্থল ছেড়ে পথে। কবি শামসুর রাহমান তাঁর বিখ্যাত ‘সফেদ পান্জাবী’ কবিতায় জনসমুদ্রে ভাষণদানরত মওলানার আন্দোলিত হাত “বল্লমের মতো ঝলসে ওঠে বারবার” বলে বয়ান করেছেন। মজলুম জননেতার ‘খামোশ’ আওয়াজে কেঁপে উঠেছে জালিমের সিংহাসন।
১৯৭৬ সালে মহাপ্রয়াণের আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে তিনি অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন। তাঁর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার ভার দিয়ে জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন তিনি তাঁর আদর্শের পতাকা।

ক্ষমতাকে তুচ্ছ করা এই মহান জনগণমন অধিনায়কের পূণ্যস্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই তাঁর ওফাত বার্ষিকীর প্রাক্কালে। তাঁকে স্মরণ করি হৃদয়মথিত অকৃত্রিম ভালোবাসায়। বাংলাদেশে শোষণ-বন্চনা ও জুলুম-পীড়নমুক্ত, সামাজিক ইনসাফভিত্তিক সাম্য-মৈত্রী-শান্তির একটি সমাজ গড়তে পারলেই কেবল মওলানা ভাসানীর প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হবে। কিন্তু মাওলানা ভাসানী এতবড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও তাকে তরুন প্রজন্মের কাছে খুব কমই উপস্থাপন করা হয়, তার বৃটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ শীর্ষক তার ভুমিকা নিয়ে আরো বেশী করে তরুণ প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করা বাঞ্ছনীয় বলে আমি মনে করি। পরিশেষে আমি দোয়া করি আল্লাহ মহান নেতা মাওলানা ভাসানীকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করুক আমিন।

তথ্য সুত্র: মারুফ কামাল খান এবং উইকিপিডিয়া

লেখক:
লায়ন আনোয়ার হোসাইন উজ্জ্বল
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি।
ইমেইল : lionuzzal2019@gmail.com