পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস; নানা কর্মসুচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১
0

নিজস্ব প্রতিবেদক:
আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি। ইতিহাসের এক জঘন্যতম দিন। ২০০৯ সালের এই দিনে পিলখানায় সাবেক বিডিআর ও বর্তমান বিজিবি সদর দফতরে ঘটে গেছে এক নৃশংস ঘটনা। উচ্ছৃংখল জওয়ানরা বিদ্রোহের নামে হত্যা করেছে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন মানুষ।

সূত্র: বিজিবি

তখন সকাল ৯ টা ২৭ মিনিট। দরবার হলে চলমান বার্ষিক দরবারে একদল বিদ্রোহি বিডিআর সৈনিক ঢুকে পড়ে। সিপাহী মঈন নামে একজন বিডিআর সদস্য মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে। তাকে বাধা দেয়ার পরপরই বিডিআরের বিদ্রোহী সৈনিকরা সেনা কর্মকর্তাদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে তাদের পরিবারকে জিম্মি করে ফেলে। পুরো পিলখানায় এক ভীতিকর বীভৎস ঘটনার সৃষ্টি করে। হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ এমন কোন জঘন্য অপরাধ নেই যা তারা সেদিন করেনি।
পিলখানায় নারকীয় হত্যার ঘটনায় দায়ের করা হয় দুটি মামলা। এর মধ্যে সেনা কর্মকর্তাদের নিহতের ঘটনায় দন্ডবিধি আইনে করা হয় হত্যা মামলা। অপরটি হয় বিস্ফোরক আইনে। দুটি মামলার মধ্যে হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত ১৫২ জনের মৃত্যুদন্ড দেয়। পরে ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে আপিলের রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল রাখা হয়। ৮ জনের মৃত্যুদন্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও ৪ জনকে খালাস দেয়া হয়। নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে আদেশ পাওয়া ১৬০ জনের মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রাখা হয়। হাইকোর্টে আপিল চলার সময়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় দুজনের মৃত্যু হয়। খালাস পান ১২ জন আসামি। অপর মামলাটি হয় বিস্ফোরক মামলা। ওই মামলার বিচার ১২ বছরও শেষ হয়নি। এ ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলার মধ্যে হত্যা মামলার বিচার হয়েছে দ্রুত গতিতেই। বিচারিক আদালত ও হাই কোর্ট শেষে আসামি ও মৃত্যুদন্ডের দিক দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ মামলা এখন চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। তবে বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলার বিচার চলছে ঢিমেতালে। ঘটনার ১২ বছরেও নিম্ন আদালতই পেরোতে পারেনি মামলাটি। ১৩৪৫ সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত শেষে হয়েছে মাত্র ১২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ।
এদিকে পিলখানা হত্যা মামলায় উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ৯ আসামির একটি আপিলেই ১৫ লাখ টাকা খরচের হিসাব দিয়েছেন তাদের আইনজীবী। এই ব্যয় কমাতে পেপারবুক মওকুফ চেয়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের কাছে আবেদন করেছেন সংশ্লিষ্ট ‘অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড’ মো. তৌফিক হুসাইন। সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্ট বিধি অনুযায়ী আদালতে কোনো পক্ষের আবেদন করার জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত আইনজীবীকে ‘অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড’ বলা হয়।
পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রুব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা করেন তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক নবজ্যোতি খিসা। পরে মামলা দুটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তর করা হয়। এরপর ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর পুরান ঢাকার বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালত রায়ে বিডিআরের সাবেক ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনকে মৃত্যুদন্ড এবং বিএনপির সাবেক এমপি নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। রায়ে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ২৭৭ জনকে খালাস দেন বিচারিক আদালত। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ১৫২ আসামির মধ্যে ১৪ জন পলাতক। এছাড়া বন্দি অবস্থায় পিন্টু ও তোরাব আলী মারা গেছেন।

এদিকে হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় দুটি ধাপ শেষ হলেও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলাটি এখনো বিচারিক আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলায় ১ হাজার ৩৪৫ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ২৩ ও ২৪ মার্চ মামলাটিতে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, মাসে দুদিন করে সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয় মামলাটিতে। পুরান ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী এজলাসে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে এ মামলার বিচার চলছে।
বিস্ফোরক মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ঘটনাস্থল, সাক্ষী ও আসামি একই হওয়ায় দুটি মামলায় একসঙ্গে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। তবে আসামিপক্ষের আবেদনে মামলা দুটির বিচারকাজ পৃথকভাবে চলে। তিনি বলেন, মামলাটিতে এ পর্যন্ত ১৮৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। করোনা ভাইরাসের কারণেই মামলাটিতে বিলম্ব হচ্ছে। নয়তো চলতি বছরই এই মামলা শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বছর খানেকের মধ্যেই মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন এই আইনজীবী।
হত্যা মামলার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে আসামি পক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন, হাই কোর্ট এ মামলায় প্রায় ৩০ হাজার পৃষ্ঠার রায় দিয়েছেন। আমরা রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি তুলে প্রথমে ৯ জনের পক্ষে একটি আপিল আবেদন দাখিল করেছি। এই আপিলটি ৬৬ হাজার পৃষ্ঠা। পরে আপিল করতে ব্যায়ের বিষয়টি তুলে ধরে অন্য আসামিদের ক্ষেত্রে পেপারবুক দাখিলের বিষয়টি সিথিল করতে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেছিলাম। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির অনুমতি পাওয়ার পর আরও ৪৭টি আপিল আবেদন দাখিল করেছি। সব মিলিয়ে ২০৩ জনের পক্ষে ৪৮টি আপিল আবেদন দাখিল করেছি আমরা। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এ মামলাটি এখন সর্বোচ্চ আদালতে আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
শোকাবহ দিবসের কর্মসূচি : পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকান্ডে শহীদ ব্যক্তিদের স্মরণে আজ বৃহস্পতিবার শাহাদাতবার্ষিকী পালন করবে বিজিবি। দিনের কর্মসূচিতে রয়েছে, পিলখানাসহ বিজিবি’র সব রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় বাদ ফজর খতমে কোরআন, বিজিবির সব মসজিদে এবং বিওপি পর্যায়ে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় সকাল ৯টায় বনানীর সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ৩ বাহিনীর প্রধান (সম্মিলিতভাবে), স্বরাষ্ট্র সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক (একসঙ্গে) শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এছাড়া আগামীকাল শুক্রবার বাদ আসর পিলখানার বীর উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে শহীদ ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এছাড়া, স্বরাষ্ট্র সচিব, বিজিবি মহাপরিচালক, শহীদ ব্যক্তিদের নিকটাত্মীয়রা, পিলখানায় কর্মরত সব কর্মকর্তা, জুনিয়র কর্মকর্তা, অন্যান্য পদবির সৈনিক ও বেসামরিক কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করবেন।