প্রধানমন্ত্রীত্ব নিয়ে সৃষ্ট কলহ স্বাধীনতার জন্য ভুলে যান চার নেতা!

আপডেট: নভেম্বর ৩, ২০২০
0

সোহেল সানি :

দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য যখন ভিনদেশে বসে সরকার গঠনের প্রশ্ন এলো, তখনও বিবাদ-বিগ্রহ, দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদের উর্ধ্বে উঠতে পারছিলেন না নেতারা।

বরং জড়িয়ে পড়েছিলেন পুরোদমে। কেউ কেউ দ্বন্দ্ব-কলহের অবতারণা করে ব্যক্তি বিদ্বেষ চরিতার্থ করতেও উদ্যত ছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলামের ও
ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর উদারনৈতিক মানসিকতায় সেই কলহের অবসান হলেও বাকবিতন্ডায় পার হয়ে যায় বেশ কয়েকটি দিবারাত্রি। দ্বন্দ্ব কলহ সৃষ্টি করে জাতীয় ও গণপরিষদের সদস্যদের মধ্যে বিভক্তি এনেছিলেন যে ব্যক্তিটি তিনি খন্দকার মোশতাক। তিনি যুব-ছাত্র নেতাদের মাঝেও ইন্ধন যুগিয়ে ছিলেন।
শেখ মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদের অধিনায়কত্বে যে মুজিব বাহিনী আত্মপ্রকাশ করে, তার সঙ্গেও তাজউদ্দীন আহমেদের একটা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান ছিল।

এসব কারণে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের গঠনপ্রকৃতি প্রকাশ হলেও শপথ নিতে হয়েছে ১৭ এপ্রিল। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে সৃষ্ট বিশ্বাস-অবিশ্বাসের এ দ্বন্দ্ব সুদূরপ্রসারী প্রভাব লক্ষ্য করা যায় বিভিন্ন সময়ে, বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের পুরোটা সময়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু ও ৩ নভেম্বরের জাতীয় চার নেতা হত্যার ঘটনা ছিল সেই দ্বন্দ্ব-কলহের পরিণতিস্বরূপ এক ভয়াবহ জিঘাংসা।
মুজিবনগরে সরকার প্রতিষ্ঠার সেই মাহেন্দ্রক্ষণের নেপথ্যে যা ঘটেছিল, তার দিকে চোখ রাখা যাক। বঙ্গবন্ধু পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং গ্রেফতারের আশঙ্কা করেই ৬ সদস্যের একটি হাইকমান্ড গঠন করেন। ইতিমধ্যে রমনার রেসকোর্স ময়দানে শপথগ্রহণ করেন জাতীয় পরিষদের (৭টি সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ) ১৬৯ জন সদস্য এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের (৬টি সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ) ২৯৪ জন সদস্য।

আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা হিসাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় সাংবাদিকের কাছে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের ভাবি প্রধানমন্ত্রী বলে আখ্যায়িত করেন।
যাহোক পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের উপনেতা নির্বাচিত হন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। অপরদিকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নেতা নির্বাচিত হন এম মনসুর আলী। এই দুই নেতার পাশাপাশি হাইকমান্ডের সদস্য ছিলেন
নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এএইচএম কামরুজ্জামান, পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ, সহসভাপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও ডঃ কামাল হোসেন। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার পরই
ডঃ কামালকেও গ্রেফতার হয়ে যান।

ফলে হাইকমান্ডের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচ-এ।
বাংলাদেশ সরকার আত্মপ্রকাশ করার আগেই ৮ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমেদ দিল্লিতে যান। তিনি ভারত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে নিজেকে যুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। এ খবর প্রচারিত হলে হাইকমান্ডসহ নেতাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর নীতিনৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। খন্দকার মোশতাকসহ অধিকাংশ নেতাই বলছিলেন পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নেতা হিসাবে প্রধানমন্ত্রী হবেন মনসুর আলী। তিনি অসম্মত হলে এ পদের দাবিদার কামরুজ্জামান, কেননা তিনি অল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। যুব-ছাত্র নেতাদের একই মত।

এমন এক সংকটকালে আবেগঘন এক বক্তৃতা করেন মনসুর আলী। তিনি বলেন, আমরা পরস্পর ঝগড়াঝাটি ভুলে নিজ মাতৃভূমির স্বাধীনতার কথা কেনো ভাবছিনা!
মনসুর আলী অস্থিরতাহীন সঠিক সিদ্ধান্তগ্রহণে ধীশক্তি প্রয়োগ করে এক নৈব্যত্তিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে বলেন, তাজউদ্দীন সাহেব আপনি এটা নীতিবহির্ভূত কাজ করেছেন, একদম ঠিক করেননি। তবুও বিরাজমান পরিস্থিতিতে উদার মানসিকতা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। আর এটা সম্ভব হবে এখন আমরা প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীনকে মেনে নিলে। এ ব্যতীত গত্যন্তরও নেই।
কামরুজ্জামানও বক্তব্য সমর্থন করে বলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আমাদের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন হতে হবে। খন্দকার মোশতাক তখন শর্তারোপ করে বলেন, আমি তাজউদ্দীনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মানবো, যদি আমাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ দেয়া হয় এবং প্রধান নির্বাহীর ক্ষমতা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যাস্ত করা হলে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম এরকম দাবি থেকে সরে যেতে বলেন মোশতাককে। তবে তাজউদ্দীনকে বলেন আইন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোশতাকের হাতে দিয়ে দিন। এরপর ১৭ এপ্রিল গঠিত হয় কারাবন্দী বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে প্রবাসী সরকার। অর্থমন্ত্রী হন মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হন কামরুজ্জামান। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন মন্ত্রীর মর্যাদায় মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করেন এম এ জি ওসমানীকে।
বিজয় যখন দ্বারপ্রান্তে তখন ফাঁস হয়ে যায় মোশতাকের ষড়যন্ত্র। তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠনের চেষ্টা করছিলেন। ফলে মন্ত্রীত্ব হারান। ২২ ডিসেম্বরে তাজউদ্দীনের প্রধানমন্ত্রীত্বে নতুন মন্ত্রিসভা হয়। খন্দকার মোশতাকের স্থলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন আব্দুস সামাদ আজাদ। বিক্ষুব্ধ হন মোশতাক। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কানভারী করেন যে, তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চায়না। তাজউদ্দীন সাক্ষাৎ করে বেগম মুজিবকে আশ্বস্ত করেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী হন। মোশতাক সাড়ে তিন বছর মন্ত্রীত্ব করলেও তাজউদ্দীন অর্থমন্ত্রীর পদ হারান।
মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যার পর হন রাষ্ট্রপতি! শুধু সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নন তার জিঘাংসার শিকার হলেন চার নেতাও। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হয়ে রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দিয়ে তাতে আসীন করেছিলেন বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরীকে। তিনি মোশতাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হন!
মনসুর আলী মোশতাকের প্রধানমন্ত্রীর পদগ্রহণের প্রস্তাবও নাকচ করে দেন। চার নেতাকে মোশতাক বঙ্গভবনে হাজির করেও পক্ষে নিতে পারেননি। যেমনটি পেরেছেন বঙ্গবন্ধুর অপর ২১ সহচরকে তারা মোশতাকের মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করে।
সত্যিই চার নেতা যেন প্রাণ দিয়ে প্রমাণ রেখে গেলেন – হে, বঙ্গবন্ধু তুমি বিহীন সবই অর্থহীন, সবই অন্ধকার!

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

LEAVE A REPLY