বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি

আপডেট: জুলাই ২৮, ২০২০
0

এমরানা আহমেদ:

বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি । শুষ্ক হৃদয় লয়ে আছে দাঁড়াইয়ে ঊর্ধমুখে নরনারী ।। না থাকে অন্ধকার, না থাকে মোহপাপ, না থাকে শোকপরিতাপ । হৃদয় বিমল হোক, প্রাণ সবল হোক, বিঘ্ন দাও অপসারি ।। কেন এ হিংসাদ্বেষ, কেন এ ছদ্মবেশ, কেন এ মান-অভিমান । বিতর’ বিতর’ প্রেম পাষাণহৃদয়ে, জয় জয় হোক তোমারি -উইকিসংকলন
রুদ্র গ্রীষ্মের দাবদাহন শেষে প্রকৃতির রাণী চিরসুন্দর শ্যামলী বর্ষার আগমনে ঘটে। গ্রীষ্ম ঋতুতেই অর্থাৎ চৈত্রে বৈশাখে কালবোশেখীর সাথেই শুর হয়ে যায় বৃষ্টির আনাগোনা। জ্যৈষ্ঠে কখনো কখনো অঝোরে বর্ষার মতো ঝরতে থাকে বৃষ্টি যা বর্ষার আগমনী বার্তা জানিয়ে দেয়। ডাহুক আপন মনে ডাকতে ডাকতে বর্ষার আগমনবার্তা জানিয়ে দেয়। আষাঢ় শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল অর্থাৎ বর্ষা ঋতু। এ ঋতুর প্রধান বৈশিষ্ট বৃষ্টি ঝড়া আকাশ, কর্দমাক্ত মাঠ, নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা পানিতে পরিপূর্ণ হওয়া, গাছপালার সতেজ রূপ,গরম আবহাওয়া ইত্যাদি ইতাদি। বাংলাদেশে বর্ষায় ফোটে কদম, কামিনী, কেয়া, কৃষ্ণচূড়া, ক্যাজুপুট, গগনশিরীষ, নাগেশ্বর, মিনজিরি, সেগুন, সুলতান চাঁপা, স্বর্নচাঁপা ইত্যাদি ফুল।

বর্ষা বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ঋতু, প্রকৃতির অসামান্য এক দান । এ সময় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। আষাঢ় ও শ্রাবণ এই দুই মাস জুড়ে বর্ষাকালের ব্যপ্তি। এই অপরূপ ঋতুতেই বাঙালির হৃদয় প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে প্রবল আনন্দে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। এ সময় বিশেষ ধরনের উৎসবের আয়োজনে মেতে ওঠে বাংলাদেশের অধিবাসীরা। আর যেখানে উৎসব সেখানেই অবধারিতভাবে হরেক রকম ঐতিহ্যবাহী জিনিস-পত্রের সমাহার এবং রীতিমতো রসনাবিলাসী রকমারী খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেন অঞ্চলবাসী। সমাজের সব ধরনের মানুষের আনন্দময় এবং সরব উপস্থিতিতে বর্ষার উৎসব সার্বজনীন এক রূপ পরিগ্রহণ করে।

বর্ষায় আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা কলো মেঘ। কখনো বৃষ্টি, কখনো রোদ্র। কখনো সারাদিন অঝোরে বর্ষণ ঝড়ছে তো ঝড়ছেই। বর্ষার আকাশ ফর্সা হয় না। এই মেঘ, এই বৃষ্টি। মাঝে মাঝে সাদা কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে সুর্য্যি মামা উকি মারে। রাতে মাঝে মাঝে চাঁদ মামার স্নিগ্ধ আলো এসে পড়ে গাছের চূড়ায়। এ অবস্থাকে বলা হয় প্রাকৃতিক বৈচিত্র। ষড়ঋতুর অন্যতম বর্ষা ঋতু যা বাংলাদেশের আবহাওয়া, পরিবেশ আর মনোজগতকে একেবারে বদলে দেয়। অধোর ধারায় বৃষ্টিস্নাত হয়ে ধরিত্রী, রোদে ঝলসে যাওয়া গাছপালা সবুজ হয়ে ওঠে।
বর্ষা ঋতুতে কদম ও কেয়া ফোটার সময়। কদম বর্ষার প্রতীক। বর্ষার সাথে কদমের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবির। কদম ছাড়া বর্ষার রূপ বর্ণনা করা যায় না। বাতাসে ভেসে আসে কদমের গন্ধ। কদম ফুটলেই মানুষ বোঝে যে বর্ষা এসেছে। হঅলুদ সাদা মিশ্রিত কদম ফুলের হাসি ছোট ছোট ছেলেময়েদেরকে আকৃষ্ট করে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কদম ফুল নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।

বর্ষার প্রকৃতি আর পাচঁটি ঋতুর মত নয়। বৃষ্টির মর মর ধ্বনি তীব্রভাবে আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়কে আভিভূত করে। এ কারণে এ দেশের কবি-সাহিত্যিকগণ বর্ষাকে নিয়েই সর্বাধিক সাহিত্য রচনা করেছেন। আষাঢ় নিয়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা শিশু কবিতা উচ্চারিত হয় শিশুদের মুখে মুখে-‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে,তিল ঠাঁই আর নাহিরে,ওগো আজ তোরা যাসনে গো, যাসনে ঘরের বাহিরে। কবি ফররুখ আহমদের শিশু কবিতায় রচনা করেছেন-‘‘বৃষ্টি নামে রিমঝিমিয়ে,রিমঝিমিয়ে গাছের ডালে টিনের চালে,বৃষ্টি নামে হাওয়ার তালে, বাদলা দিনের একটানা সুর,বৃষ্টি নামে ঝুমুর ঝুমুর।’’
বর্ষা ঋতুতে ছোট-বড় সরোবরে, ডোবা নালায় অজস্র শাপলা ফুল ফুটে। কদম কেয়া শাপলা স্নিগ্ধ হাসি কবিমনকে বিচিত্রতা ভাবনায় ভরে তোলে। বাস্তবে রূপ পায় কবিতা, গান ও বিভিন্ন ছন্দে ছন্দে। কতই না কবিতা-ছড়া কবির লেখনীতে প্রকাশ পায়। তাইত কবি গুনগুন করে বলছেন-রিম ঝিম বিষ্টিটা, কোথায় মিষ্টিটা, দিন রাত ঝরছে,নদী নালা ভরছে।

বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত প্রাকৃতিক নিয়মেই হয়। বাতাসে মৌসুমী বায়ুর উপস্থিতি বেশি থাকার কারণে বৃষ্টিপাত বেশি হয়ে থাকে। সমুদ্র এলাকায় মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকে। বর্ষাকালে এই মৌসুম বায়ু আস্তে আস্তে সারা দেশে প্রভাব বিস্তার করে। মৌসুমী বায়ুর আগমনে জ্যৈষ্ঠের গুমোট গরমের ভাবটা কেটে গিয়ে প্রশাস্তির একটা হাওয়া বয়ে যায়। আষাঢ়ে-শ্রাবণে অঝোর বর্ষণ গোটা পরিবেশটাকেই আরো প্রাণবন্ত করে তোলে।
বর্ষার সুশীতল বর্ষণ প্রকৃতির সকল চাওয়া- পাওয়াকে তৃপ্ত করে। বর্ষার আগমনে শুকনো ফাটা ফাটা ফসলের খেত পরিপূর্ণ হয় পানিতে। খাল বিল সব তলিয়ে কানায কনায় পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীগুলোর দুই পাড় পানিতে ভসে যায়। অনেক সময় উপচে পড়ে বন্যাও দেখা দেয়। বন্যা হয় আমাদের ক্ষতির কারণ। শ্রাবণ মাস যখন আসে তখন আমাদের দেশের অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। গ্রামীণ জনপদ বর্ষার পানিতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে, বাড়িগুলো সব বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়।

যেহেতু বর্ষার উৎসব, আষাঢ়- শ্রাবণ মাস জুড়েই নৌকা বাইচের আয়োজন উৎসবের একটা বড় জায়গা জুড়ে থাকে। তাই অবধারিতভাবে নৌকা বাইচকে বাংলাদেশের বর্ষাকালে আয়োজিত অন্যতম জাতীয় উৎসব হিসেবে বলাটা বাহুল্য হবেনা বোধ করি। এই উৎসব বাংলাদেশের প্রায় সব ভাটি অঞ্চলেই আয়োজন করা হয়। এ সব আয়োজনে বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নৌকার দেখা মেলে । নৌকাবাইচ উপলক্ষে নৌকাগুলোকে লোকশিল্পের মোটিফ দিয়ে চিত্রিত করা হয় এবং রঙিন কাগজের সাহয্যে চমৎকার করে সাজানো হয়। বাইচের সওয়ারীদের সাজ-সজ্জাও দেখার মতো। নৌকার মাঝখানে দাঁড়ানো মূল গায়েন হাতে রঙিন রুমাল,পায়ে ঘুঙ্ঘুর. কাঁধে থাকে গেরুয়া রঙের উত্তরীয় বেঁধে উৎসাহমূলক লোকগীতি গাইতে থাকেন। নৌকার গতির সাথে তাল মিলিয়ে নদীর পাড় ধরে ছুটতে থাকে শিশু-কিশোরের দল।

এ ছাড়া, ভাটি অঞ্চলে মনসার ভাসান নিয়ে গীত পরিবেশনের আসর বসে রাতের বেলা কোন কৃষকের বাড়ির উঠোনে। বর্ষার উৎসবের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বিষয় হিসেবে মধ্যযুগের মনসা- মঙ্গল কাব্যের ধারাবাহিকতার রেশ এখনো বাংলাদেশের কোথাও কোথাও দেখতে পাওয়া যায়। অবিরল বৃষ্টিপাতের মধ্যে প্রস্ফুটিত বর্ষার অন্যতম ফুল কদম, ছাতিম আর গাবফুলের মদির সুগন্ধ বাংলার মানুষকে সৃষ্টিশীল এবং মানবিক করে তোলে। গ্রামের নারীদের সৃজনশীলতার একটা অন্যতম সময় এই বর্ষাকাল। ঘনঘোর বরিষায় সহজে ঘর থেকে বাইরে গিয়ে দৈনন্দিন কাজগুলো করা যায়না বলে ঘরের মা – মেয়েরা মিলে বর্ষায় সেলই করবেন বলে সিঁকেয় তুলে রাখা গত বর্ষায় শুরু করা নকশি-কাঁথা সেলাই করতে বসেন। এটিও সারা বাংলার ঘরে ঘরে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ রচনা করে। সেলাইয়ের ফোঁড়ে, ফোঁড়ে পুরনো কাপড়ের পরতে পরতে উঠে আসতে জীবনের কথকতা। এটিও হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের বর্ষার উৎসবের একটা অত্যন্ত প্রাণময় এবং বর্ণিল অংশ।

ক্রমাগত বৃষ্টি আর নদীর পানির স্রোতধারা আমাদেরকে ভিন্ন একটি আমেজ এনে দেয়। বৃষ্টিতে ভিজতে শিশু কিশোরদের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। বৃষ্টি আমাদের প্রকৃতিকে যেমন ফলে ফসলে ভরিয়ে দেয় তেমনি আমাদের মন-মানসকেও স্পর্শ করে। গুর গুর মেঘের ডাকে ধান ক্ষেতে বিচরণ করতে শুরু করে কই, শিঙ অরো কতো ছোট আকৃতি ও প্রকৃতির মাছ। গৃহস্থরা ছুটাছুটি করে মাছ ধরার উপকরণ নিয়ে, কেউই জাল, কেউবা খুচন, কেউবা কোচ, কেউবা বড়শী নিয়ে। এ যেন বর্ষা ঋতুর এক অফুরন্তলীলা বৈচিত্র। ব্যাঙেরা দলবেঁধে ডাকতে থাকে মেঘ হ মেঘ হ, শুরু হয় নবজীবনের আনন্দমেলা ।
আষাঢ়-শ্রাবণ দু’মাস বর্ষাকাল হলেও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এর পরেও বর্ষার প্রভাব থাকে। থাকে বৃষ্টিপাত। ফলে বর্ষা আর শরত্ যেন একাকার হয়ে যায়। হেমন্তেকার্তিক মাসে পানি সরে যাওয়ার পর ক্ষেত পাথার যখন আবার জেগে ওঠে তখনই আসলে বর্ষার প্রভাব শেষ হয় প্রকৃতি থেকে।
বর্ষা প্রকৃতিকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দিয়ে যায়। হরাস পায় ফসলী জমিতে পোকা মাকরের আক্রমণ, জমিতে জমে থাকা কীটনাশক ওষুধ। ফসলের খেতে রেখে স্তরে স্তরে পলি জমে যা কৃষকের জন্য হয়ে উঠে আগামী দিনের স্বপ্ন। বর্ষায় জমিতে পলি পড়ার ফলে জমি উর্বরা শক্তি ফিরে পায়। ###

LEAVE A REPLY