বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কনসেপ্ট যেভাবে ঘোষনা করলেন শহীদ জিয়া

আপডেট: জানুয়ারি ১৮, ২০২৩
0

ডা জাকারিয়া চৌধুরী :

চন্দ্রের প্রস্থান হয় সূর্যের আগমনে। জিয়া হচ্ছেন ইতিহাসের হাতেগোনা জেনারেলদের একজন- যিনি অফিসার হিসেবে মাতৃভূমির জন্য দুটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ করেছেন এবং জেনারেল পদে উন্নীত হয়েছেন। দুটি যুদ্ধই জিয়ার জীবনকে দিয়েছে গৌরবের মর্যাদা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলে জিয়ার মনোজগতে এসেছিল ব্যাপক পরিবর্তন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে, তাদের নিয়ে আসতে হবে আলোর জগতে। এজন্যই তিনি চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক জনপদে পৌঁছাতে, প্রত্যেক মানুষের মনোজগতে তার চিন্তার প্রভাব ফেলতে। এ কারণেই তিনি চেয়েছেন রাজনীতিকে মানুষের কাছে নিয়ে যেতে, যাতে তাদের আর রাজনৈতিক নেতা বা প্রভুদের ড্রয়িংরুমে আসতে না হয়। এ চিন্তা রাজনীতিবিদদের অসন্তুষ্ট করেছিল, যে কারণে আজও তারা জিয়ার এ উদ্যোগের সমালোচনায় মুখর।

বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার পথচলায় যেসব নিয়মনীতি, প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তার শুরুটা জিয়ার হাত ধরেই। জাতীয় জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তার উপস্থিতি নেই। সেই উপস্থিতির স্থাপনাফলক হয়তো অনেক ক্ষেত্রেই লুকিয়ে ফেলা হয়েছে; কিন্তু ইতিহাস কি এত সহজে মুছে ফেলা যায়?

একজন সচেতন,স্বাধীন,ন্যুনতম আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষের পক্ষে বছরের পর বছর অরাজকতা মেনে নেয়া কখনো-ই সম্ভব ছিল না। আমরা জানি, আল্লাহ যখন তাঁর কোন বান্দার উপর সর্বচ্চো রুষ্ট হন তখন-ই তাঁর হাঁতে তুলে দেন ভিক্ষার ঝুলি। তাকে ঋনগ্রস্থ করতে করতে এক সময় অতলে হারিয়ে যেতে দেন। দেশের সব কিছু খুইয়ে, দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে যে রাষ্ট্র নেতার এমন লাঞ্চনাকর বিদেয় হল, তারপরেই যেন বর্ষণ ক্লান্ত কাক ডাকা বিকেলের এক লাজুক রোদ্দুরের বেশে হাজির হলেন স্বল্পভাষী জিয়া। দেশের মানুষের কাছে তখনো তিনি মেজর জিয়া। স্বাধীনতার আগে বীরত্বের খেতাব হিসেবে যিনি অর্জন করেছেন হিলাল-ই-জুরাত নামের মহামুল্যবাদ পদক আবার স্বাধীনতা যুদ্ধে অসীম বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে সে স্থানের শোভা বাড়িয়েছেন বীর উত্তম খেতাবের মেডেলে।

ততদিনে অবশ্য ইতিহাসের পদ্মা আর প্রমত্তা পদ্মার মর্যাদায় নেই, মানুষও আর আগের মত উদ্যমী যোদ্ধা মেজাজে নেই। আছে শুধু হাহাকার আর হতাশার নিরব বিলাপ। দেশজুড়ে। জীর্ণ বস্ত্র আর শীর্ণ গাত্রে লাশ হয়ে মরে পচে গলে যাওয়া মানুষের কংকালগুলো তখনো এখানে সেখানে পড়ে ছিল। সে সময় দেশের বেওয়ারিশ কুকুর গুলোই কেবল নাদুস নুদুস স্বাস্থ্যে ঘুরে বেড়িয়েছিল। যারা কোনও মতে বেঁচে ছিল তাড়া তাঁদের সন্তানদের বিক্রি করে দিত মাত্র পাঁচ টাকায়, সোমন্ত কচি মেয়েরা বিক্রি হয়ে যেত এক মালসা ফেনের আশায়। অসমর্থ একদল মা তাঁদের দুধের শিশুকে কাপড়ে মুড়ে রাস্তার কিনারে ফেলে চলে যেত। কারো দয়া হলে সে শিশু হয়ত বেঁচে যেত আর না হলে সেসব অবুঝেরা জীবন্ত ফিস্ট হয়ে যেত শিয়াল, কুকুর আর শকুনের। এমন অসম্ভব সময় যারা তৈরি করেছিল, তাঁর মুল্যও তারাই শোধ করেছে একেবারে কড়ায় গন্ডায়।

এমন তমসাচ্ছন্ন রাতের আঁধার থেকে জাতিকে মুক্ত করতেই সিপাহি জনতার অভূতপূর্ব এক মিলনে সৃষ্টি হয় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের যা জিয়াকে পরিনত করে দেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তয়ন দূরীকরণ, অনিয়ম, উশৃঙ্খলা, সাম্য, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকল্পে তিনি তাঁর হাত প্রসারিত করলেন। দুর্বৃত্ত লোকেরা যেন রাতারাতি পুনর্বাসিত হতে না পারে, তাঁদের বিরুদ্ধে উচ্চারন করলেন ঐতিহাসিক হুশিয়ারি বানি-আই শ্যাল মেইক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফোর দ্যা পলিটিশিয়ানস। অন্যদিকে তলাবিহীন ঝুড়ির কলংক মুছতে তিনি দেশে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের বিপ্লব শুরু করে দিলেন সরবস্তরে। যেখানে এক বছর আগেও ক্ষুধার্ত মানুষ খাবার জুগিয়েছে কুকুর আর শিয়ালের সেখানেই একের পর এক কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করল। তিনি ঘোষণা করলেন-কারখানায় কাজ প্রয়োজনে তিন শিফটে চলবে। দেশ স্বনির্ভর হয়ে উঠতে শুরু করল যখন তখনই জিয়ার কানে বাজল ষড়যন্ত্রের বাঁশি কিন্তু তিনি সেসবের তোয়াক্কা করলেন না। বিপুল বিক্রমে এগিয়ে যেতে থাকলেন দেশের এ মাথা থেকে ও মাথা।

২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর নিজেরও নিজ পরিবারের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন নিজেকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে। যে দ্বি-জাতি তত্তের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম সেই জাত পাত ভুলে মানুষের অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর ছিলেন বলেই তিনি এতবড় ঝুঁকি নিয়ে দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। অবশ্য যারা বহুকাল ধরে এসব নিয়ে নানাভাবে জল ঘোলা করে এসেছেন তাঁদের মুখে চুন মাখা হয়েছে জনাব তারেক রহমানের তত্ত, তথ্য আর প্রমান সহ বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে। স্বাধীনতার পর বহু জাতির মিলনের মাধ্যমে যে সেক্যুলার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন এদেশের আপামর মানুষ, সে স্বপ্ন ভেঙ্গে খানখান হয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ফারাক্কা বাধ, সীমান্ত সমস্যা, বাংলাদেশকে চারিদিক দিয়ে ঘিরে ফেলার যে প্রচেষ্টা ভারত শুরু করে তাতে জিয়া বুঝেছিলেন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ আর বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ কখনোই এক নয়, হতে পারেনা।

ফলে তিনি ঘোষণা করলেন’বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কনসেপ্ট। দেশের সব শ্রেণী পেশার মানুষ যেন জিয়ার মুখে এমন কিছু শোনার অপেক্ষাতেই ছিল। মানুষের মনে জিয়া হয়ে উঠলেন মধ্যমনি, আরাধ্য আর পরম শ্রদ্ধার পাত্র। আজ আমরা যে বাংলাদেশ দেখি এবং যে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের তত্তে দৃঢ় আস্থা রাখি তা এসেছে একজন জিয়ার হাত ধরেই।

শহীদ জিয়া সমুদ্রের তলদেশের সম্পদ সম্পর্কে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী, কবি, সাহিত্যিক ও ব্যবসায়ীকদের অবগত করার জন্য এক সমুদ্র বিহারের আয়োজন করেন। সমুদ্রে ভ্রমণ করে সমুদ্র সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন তিনি। এরকম রাষ্ট্রনায়ক পৃথিবীতেই বিরল। বক্তব্যের বিষয়কে বাস্তবানুগ ও হৃদয়েপ্রোথিত করানোর জন্য দরিয়া ভ্রমণের আয়োজন করেন। আনন্দ ভ্রমণের মধ্যদিয়ে মেধাবী ও মননশীল আগামীর ভবিষ্যতকে দিকনির্দেশনা দিলেন তিনি।

একজন রাষ্ট্রনায়কের কয়েকটি গুণাবলির কথা প্রত্যেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উল্লেখ করেন। তাদের কথা অনুযায়ী একজন রাষ্ট্রনায়কের যেসব অবশ্য গুণাবলি থাকা প্রয়োজন তার মধ্যে রয়েছে : আদর্শ, নৈতিকতার একটি কম্পাস, একটি ভিশন এবং এ ভিশন অর্জনে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা। এ ছাড়া একজন রাষ্ট্রনায়ক হবেন একটি স্বাধীন জাতির স্বাধীন নেতা। জিয়া ছিলেন এসব গুণের অধিকারী। দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে হবে এবং মানুষ কী করতে পারে সে ব্যাপারে তার ধারণা ছিল স্পষ্ট। এ কারণেই জিয়া বহন করছেন রাজনৈতিক অমরত্বের উত্তরাধিকার।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক , দেশ জনতা ডটকম