বাংলাদেশের ব্রান্ডিং ক্রিকেট বনাম অব্যবস্থাপনা

আপডেট: ডিসেম্বর ৯, ২০২১
0

লায়ন আনোয়ার হোসাইন উজ্জ্বল :

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর বাংলাদেশের নির্দিষ্ট সীমারেখা গড়ে উঠে যা পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিতি পায়। ভারতের প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিমাংশে পাকিস্তানের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র রচিত হয়। প্রধান ধর্ম ইসলাম হওয়া স্বত্ত্বেও জাতিগত ও ভাষার পার্থক্যের ফলে সংগঠিত মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ২৬ মার্চ, ১৯৭১ তারিখে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে ও ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে রেসকোর্স ময়দানে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নতুন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে।

(ক) পূর্ব বাংলায় ক্রিকেট…..

অষ্টাদশ শতকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় প্রথম ক্রিকেট খেলার প্রচলন করে। ১৭৯২ সালে প্রথমবারের মতো ক্রিকেট খেলা আয়োজনের কথা জানা যায়। সম্ভবতঃ আরও একদশক পূর্বে খেলাটি অনুষ্ঠিত হতে পারে। ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ ভারতে অবস্থান করে ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড রঞ্জি ট্রফি প্রতিযোগিতার প্রচলন ঘটায়। ১৯৩৮-৩৯ মৌসুমে বাংলা শিরোপা লাভ করে। ভারত বিভাজনের ফলে বাংলাও বিভক্ত হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত পূর্ব বাংলা আনুষ্ঠানিকভাবে কোন খেলায় অংশ নেয়নি।

(খ) পূর্ব পাকিস্তানে ক্রিকেট……

১৯৫৪-৫৫ মৌসুম থেকে ১৯৭০-৭১ মৌসুম পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের ১০টি প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট দল পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে কায়েদ-ই-আজম ট্রফি ও আইয়ুব ট্রফিতে অংশগ্রহণ করেছিল। ১৯৫৪-৫৫ মৌসুমে সফরকারী ভারতীয় একাদশ ও ১৯৫৫-৫৬ মৌসুমে এমসিসি দল পূর্ব পাকিস্তান দলের বিপক্ষে অংশগ্রহণ করে। ভারতীয় একাদশ খেলায় জয় পেয়েছিল। পাকিস্তানের অংশ হিসেবে থাকায় বাংলাদেশে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট ও টেস্ট ক্রিকেট খেলা আয়োজনের দায়িত্ব পায়। জানুয়ারি, ১৯৫৫ সালে ভারতের বিপক্ষে খেলার জন্য পাকিস্তান দল ঢাকায় অবস্থিত বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম প্রথমবারের মতো ব্যবহার করে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত টেস্টসহ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ খেলায় এ স্টেডিয়ামকে ব্যবহার করা হয়েছিল। চট্টগ্রামের এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে ১৯৫৪ সালে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট খেলা আয়োজন করা হলেও স্বাধীন বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির পর ২০০১ সালে টেস্ট খেলা আয়োজনের সুযোগ পায়।

(গ) বাংলাদেশে ক্রিকেট…

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে নিজস্ব ক্রিকেট খেলা আয়োজনের ব্যবস্থা গড়ে উঠে। এ সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৪-৭৫ মৌসুমে জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেট প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

৩১ মার্চ, ১৯৮৬ তারিখে পূর্ণাঙ্গ শক্তিধর ও টেস্টখেলুড়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো একদিনের আন্তর্জাতিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। দলের অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু’র নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল মাত্র ৯৪ রানে গুটিয়ে যায়। সাত উইকেট হাতে রেখেই পাকিস্তান কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে।

২৬ জুন, ২০০০ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ সদস্যের মর্যাদা লাভ করে। বোর্ডের নাম পরিবর্তিত হয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নামকরণ হয়। ১০-১৩ নভেম্বর, ২০০০ সালে বাংলাদেশ দল বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী টেস্টে ভারতের মুখোমুখি হয়। খেলায় ভারত দল নয় উইকেটে জয় পায়

বাংলাদেশে ক্রিকেট একটি খেলা না, তার থেকেও অনেক অনেক বেশি কিছু। বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রিকেট দেশের ১৬ কোটি মানুষের রক্তে মিশে যাওয়া নেশা। তাইতো প্রেস কনফারেন্সে সাকিব আল হাসান একদিন বলেছিলেন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের থেকেও আমাদের দেশে ক্রিকেট বেশি জনপ্রিয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট খেললে মাঠে খেলে ১১ জন, কিন্তু তাদের পেছনে তাদের সাহস দেওয়ার জন্য ১৭ কোটি মানুষ থাকে। সবার চাওয়া একটাই, জিতবে আমাদের বাংলাদেশ। এই দেশে এই ক্রিকেট খেলাটা যখন এতই জনপ্রিয়, তখন এই খেলার ইতিহাস না জানলে তো হবে না।

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেঙ্গল টাইগার নামেই অধিক পরিচিত এবং প্রশংসিত। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-বিসিবি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলসহ দেশের সকল ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা।

বাংলাদেশ সর্বপ্রথম ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফি দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আত্মপ্রকাশ করে। ওই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দু’টি ম্যাচ জয়লাভ করে এবং দু’টি ম্যাচ হেরে যায়।

বাংলাদেশ সর্বপ্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ এশিয়া কাপে।
বাংলাদেশ ওয়ানডে স্ট্যাটাস পায় ১৯৯৭ সালে। বাংলাদেশের এখন অব্দি অন্যতম অর্জন হলো ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ, এই জয়ের মাধ্যমেই বাংলাদেশ পেয়েছিল প্রথমবারের মতো ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসর বিশ্বকাপ (১৯৯৯ সালে) খেলার সুযোগ। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেই চমক দেখিয়েছিল বাংলাদেশ, জানান দিয়েছিল চোখে চোখ রেখে হুংকার দেওয়ার মতো একটি দল বিশ্ব শাসন করতে প্রস্তুত হচ্ছে। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলে বাংলাদেশ হারিয়েছিল স্কটল্যান্ড এবং তখনকার হট ফেবারিট পাকিস্তানকে।

একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলাদেশ তাদের প্রথম জয়টা পায় ২২ ম্যাচ হারের পর। ১৯৯৮ সালে মোহাম্মদ রফিকের অসাধারণ নৈপুণ্যে (৭৭ রান ও ৩ উইকেট) কেনিয়ার বিরুদ্ধে ভারতের মাটিতে জয় পায় বাংলাদেশ। সেদিন আতহার আলী খান ও মোহাম্মদ রফিক মিলে জুটি বেঁধেছিলেন ১৩৭ রানের। আতহার আলী করেছিলেন ৪৭ রান।

২০০০ সালের ১০ নভেম্বর বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল টেস্ট খেলার মর্যাদা অর্জন করে। তাও আবার শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে খেলেছিল বাংলাদেশ নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের অধিনায়কত্বে। নাঈমুর রহমান দুর্জয় বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট ম্যাচে ১৪৫ রান করে ইতিহাসে নাম লিখান আমিনুল ইসলাম বুলবুল। অধিনায়ক নাইমুর রহমানের ১৩২ রানে ৬ উইকেট অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসে কোনো বোলারের সেরা বোলিং। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং ব্যর্থতার কারণে ৯ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ। সেই থেকে শুরু হয় দেশে টেস্ট ক্রিকেটের পথচলা।

বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট জয় পায় ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রামে। ম্যাচ সেরা হন এনামুল হক জুনিয়র।

(ঘ) বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট…….

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ায় জন্য সবচেয়ে বেশী যার অবদান তৎকালীন ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান সাবের হোসেন চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ঢেলে সাজিয়ে ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ২০০৮-০৯ সাল পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক ছিল তার মূল কারণ ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভালো একটি ব্যালেন্সড দল ছিল। মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ বলতে গেলে পঞ্চ-পান্ডব। দলে কাকে রেখে কাকে খেলাবেন একটা রহস্যময় ছিল। গোলকধাঁধা তখনই বাঁধে ২০১৯ সাল থেকে আজ অবধি। সিনিয়র খেলোয়াড় যখন বিশ্রামে যায় তখন বাংলাদেশের ক্রিকেট যেন সবকিছু ভুলে যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটটা কোনমতে চালিয়ে যাচ্ছে, নেই কোনো দীর্ঘ মিয়াদি পরিকল্পনা, নেই স্কুল ক্রিকেটের ভালো ব্যবস্থাপনা, নেই জেলা ও বিভাগীয় ক্রিকেটের ভালো পরিকল্পনা, নেই তৃতীয় বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ এবং প্রথম বিভাগের ভালো পরিকল্পনা। প্রথম শ্রেনী এবং লীগের ক্রিকেটে চলছে কোন্দল এবং বিশেষ দলকে জিতিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা যা বিভিন্ন সময়ে সিনিয়র ক্রিকেটারদের অসন্তোষ। আম্পায়ারদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে ঘরোয়া ক্রিকেটে। সিনিয়র খেলোয়াড়রা বিভিন্ন সময়ে সরাসরি বা ইঙ্গিতে এইসব অভিযোগ করে থাকে। দলের মধ্যে একধরনের অসন্তোষ বিরাজমান। দেশের ক্রিকেটকে যদি ব্রান্ডিং করতে হয় তাহলে দীর্ঘ মিয়াদি পরিকল্পনা করে এগুতে হবে একেবারে স্কুল ক্রিকেট থেকে যা পার্শ্বাবর্তী দেশ ভারত এবং পাকিস্তানে দেখা যায়। শুধু স্পিন নির্ভর পিচ তৈরি করলে হবে না পেস বান্ধব ও পিচ তৈরি করতে হবে তাহলে ভালো মানের পেসার তৈরি হবে অন্যতায় ক্রিকেটটা বুমেরাং হবে। যার ফলাফল দেখা যায় এবারের টি২০ বিশ্বকাপে। যারা সাবেক ভালো ব্যাটসম্যান, বোলার ছিলেন তাদেরকে সারাদেশে দায়িত্ব দিতে হবে তৃনমুল পর্যায়ের ক্রিকেটার তুলে আনার জন্য।

কারন যারা ক্রিকেট বুঝে না তারা কখনো ভালো ক্রিকেটারের থিম বুঝতে পারবে না। ভারত এবং পাকিস্তানে লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন ক্রিকেট বোর্ড থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত সাবেক ক্রিকেটার দিয়ে সাজিয়েছেন। আমাদের বাংলাদেশে ও সময়ের দাবি সাবেক ক্রিকেটারকে দিয়ে বোর্ড থেকে স্কুল ক্রিকেট সাজানো হোক তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে ক্রিকেট ব্রান্ডিং হবে যেমন ধরুন শ্রীলংকায় তাদের সিনিয়র অবসর নেওয়ার পর তারা দ্রুত আবার কামব্যাক করেছে তাদের সুদুপ্রসারী পরিকল্পনার কারনে।

(ঙ) বাংলাদেশের সফল কোচ কে?

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ দলের কোচের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান গর্ডন গ্রিনিজ। আর তার অধীনেই ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জিতে ১৯৯৯ বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। সেই বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ম্যাচে পাকিস্তানকে হারানোর দিনটিই বাংলাদেশের কোচ হিসেবে গ্রিনিজের শেষ দিন।

এ পর্যন্ত রাসেল ডমিঙ্গোকে নিয়ে বাংলাদেশ বিদেশি কোচের সংখ্যাটা দাঁড়ালো ১২জনে। এখন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক বাংলাদেশের বিদেশি কোচদের সাফল্য-ব্যর্থতা। তবে অন্তর্বর্তীকালীন কোচদের হিসাব এখানে নেই।

সংখ্যার দিক থেকে এ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি কোচ এনেছে বাংলাদেশ। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দুজন করে আনা হয়েছে ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তান থেকে।

নভেম্বর ১৯৯৬- মে ১৯৯৯ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোচ ছিলেন গর্ডন গ্রিনিজ। তার সময়ে বাংলাদেশ ২৩টি ওয়ানড’র মধ্যে জয় পায় ৩টি, হার ২০টি। তার সময়ে আইসিসি ট্রফি জিতে ১৯৯৯ বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় লাল-সবুজের জার্সিধারীরা।

আগস্ট ১৯৯৯-জানুয়ারি ২০০১ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোচ ছিলেন প্রোটিয়া ক্রিকেটার এডি বারলো। তার সময়ে বাংলাদেশ ১টি টেস্ট খেলে হেরেছিল। এছাড় ৬টি ওয়ানডেই হেরেছিল বাংলাদেশ।

এপ্রিল ২০০১-মার্চ ২০০২ পর্যন্ত কোচ ছিলেন অজি ক্রেকেটার ট্রেভর চ্যাপেল। তার সময়ে বাংলাদেশ ১০টি টেস্ট খেলে ১টি ড্র করেছে আর হেরেছে ৯টি। এছাড়া, ৯টি ওয়ানডের সবগুলোতেই হেরেছে বাংলাদেশ।

এপ্রিল ২০০২-মার্চ ২০০৩ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোচ ছিলেন পাকিস্তানের মহসিন কামাল ও আলী জিয়া। তাদের সময়ে ৬ টেস্টের সবগুলোতে হেরেছে বাংলাদেশ। আর ১৭টি ওয়ানডে’র মধ্যে ১৫টিতে হার, ২টিতে কোনও ফল হয়নি।

জুন ২০০৩-মে ২০০৭ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোচ ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ডেভ হোয়াটমোর। তার সময়ে ২৭ টেস্টে ১টিতে জয়, হার ২২টি, ড্র ১টিতে। আর ৮৯ ওয়ানডে’র মধ্যে ৩৩টিতে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ আর হার ৫৬টিতে। এছাড়া, ১টি টি-টোয়েন্টি খেলে সেটি জিতেছিল টাইগাররা।

অক্টোবর ২০০৭-এপ্রিল ২০১১ বাংলাদেশের কোচ ছিলেন অজি ক্রিকেটার জেমি সিডন্স। ওই সময়ে বাংলাদেশ ১৯টি টেস্ট খেলে ২টিতে জয় পেয়েছিল। আর ১৬টি হেরেছিল এবং ড্র করেছিল ১টি। এছাড়া, ৮৪ ওয়ানডে’র মধ্যে ৩১ টিতে জয় এবং হার ৫৩টিতে। আর ৮টি টি-টোয়েন্টির মধ্যে সবগুলোতেই হেরেছিল বাংলাদেশ।

জুলাই ২০১১-মে ২০১২ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোচ ছিলেন অজি ক্রিকেটার স্টুয়ার্ট ল। তার সময়ে ৫টি টেস্ট খেলে ১টি ড্র আর বাকিগুলো হেরেছিল বাংলাদেশ। আর ১৫টি ওয়ানডে’র মধ্যে ৫টিতে জয় পেলেও হেরেছে ১০টিতে। ২টি টি-টোয়েন্টি খেলে ১টিতে জয় আর হার ১টিতে।

মে ২০১২-অক্টোবর ২০১২ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোচ ছিলেন ইংলিশ ক্রিকেটার রিচার্ড পাইবাস। তার সময়ে বাংলাদেশ ৮টি টি-টোয়েন্টি খেলে ৪টিতে জয় আর ৪টিতে হরেছে।

ফেব্রয়ারি ২০১৩-মে ২০১৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোচ ছিলেন অজি ক্রিকেটার শেন জার্গেনসেন। তার সময়ে ৮ টেস্টে ১টি জয়, হার ৩টি আর ড্র ৪টি। এছাড়া ১৬টি ওয়ানডে’র মধ্যে ৫টিতে জয়, ১০টিতে হার আর ফল হয়নি ১টিতে। আর ১৩টি টি-টোয়েন্টির মধ্যে ৩টিতে জয় পেলেও হেরেছে ১০টিতে।

মে ২০১৪-নভেম্বর ২০১২ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোচ ছিলেন শ্রীলংকার চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। তার সময়ে বাংলাদেশ ২১টি টেস্ট খেলে জয় পেয়েছিল ৬টিতে। আর ১১টিতে হার ও ড্র ৪টিতে। এছাড়া, ৫২টি ওয়ানডের মধ্যে ২৫টিতে জয়, হার ২৩ এবং ফল হয়নি ৪টিতে। অন্যদিকে, ২৯টি টি-টোয়েন্টির মধ্যে ১০টিতে জয় পেয়েছে আর হেরেছে ১৭টিতে।

জুন ২০১৮-জুলাই ২০১৯ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোচ ছিলেন ইংলিশ ক্রিকেটার স্টিভ রোডস। তার সময়ে ৮টি টেস্টের মধ্যে ৩টিতে জয় পেয়েছে আর ৫টিতে হেরেছে। এছাড়া ৩০টি ওয়ানডে’র মধ্যে ১৭টিতে জিতেছে আর হেরেছে ১৩টিতে। আর ৭টি টি-টোয়েন্টির মধ্যে ৩টিতে জয় আর হার ৪টিতে।

(চ) তাহলে ক্রিকেট কি ধ্বংসের দারপ্রান্তে?

আমার মনে হয় না যে, বাংলাদেশের ক্রিকেট অচিরেই ”ধ্বংস” হয়ে যাবে। “ধ্বংস” বলতে আমি বোঝাচ্ছি যে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবস্থা হবে এখনকার ফুটবলের মতো। মানে বাংলাদেশের খেলা যে কোথা দিয়ে হবে, আর কোথা দিয়ে যাবে- তা আমরাই জানবো না! এমনটা হবে যদি আরো পনেরো বছর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) উল্টাপাল্টা সিদ্ধান্ত নেওয়া জারি রাখে।

বাংলাদেশের প্রিয় “পঞ্চপাণ্ডব” ইতোমধ্যেই ভেঙে গিয়েছে। ২০১৯ বিশ্ব-কাপের পর মাশরাফির অলিখিত অবসরের পর বাকি আছেন চারজন। এঁদের মধ্যে তামিম ইকবালের চোটাঘাত এখন নিয়মিতভাবে ঘটনা। তাঁকে আর বেশিদিন দেখা নিয়ে আমি সন্দিহান। মাহমুদউল্লাহ তিন দিন আগেই টেস্ট থেকে অবসর ঘোষণা করলেন।

মুশফিকুর রহিমকে হয়তো টি-টোয়েন্টি দলেই আর দেখা যাবে না কখনো। তাকে শেষটা দেখিয়ে দিলেন নতুন কোচ ডমিঙ্গো, সাকিব আল হাসান অবশ্য এখনও তাঁর সব্যসাচী রূপ ধরে রেখেছেন। তবে তাঁর লম্বা ফরম্যাট খেলতে অনীহা আর বারবার চোট পাওয়া একটা চিন্তার বিষয়।

তামিম ইকবাল নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সেরা ওপেনার। বাংলাদেশের ইতিহাসে ওপেনার হিসেবে তামিম ইকবালের ধারেকাছেও নেই কেউ। অথচ বাংলাদেশের থার্ড ক্লাস কোচ ডমিঙ্গো তাকে টি২০ থেকে বাদ দিতে চেয়েছিল তা আন্দাজ করতে পেরে ফেইসবুক লাইভে এসে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। এতে বুঝা যায় দেশের ক্রিকেট নিয়ে একটি মহল সুদুরপ্রসারি চক্রান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বলতে গেলে তার হাত ধরে অনেক জয় এসেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। তাকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন কারন সে নাকি টেস্ট খেলতে পারে না জিম্বাবুয়েতে সর্বশেষ টেস্টে সেঞ্চুরি করে দলকে জিতালেন এবং অভিমানে অবসরের সিদ্ধান্ত নিলেন।

মাশরাফি বিন মুর্তজা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সেরা অধিনায়ক এবং সেরা পেসার, শেষ সময়ের এসে অপমানিত হয়ে ক্রিকেট বোর্ড কর্তাদের গ্রুপিং এর শিকার হয়ে ক্রিকেটকে বিদায় জানাতে হলো।

এঁরা যতো যা-ই করুন, ২০২৩ বিশ্ব-কাপের পর আর জাতীয় দলে হয়তো আর খেলবেন না। ক্যারিবিয়ান আর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্ব-কাপেই হয়তো এঁদের শেষ দেখা যাবে লাল-সবুজ জার্সিতে। কিন্তু তারপর কী হবে? বাংলাদেশের ক্রিকেট-ইতিহাসেরই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে সফল এই কয়েকজনের অবসরের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটের কী অবস্থা হবে? নতুন প্রজন্ম কতোটা তৈরি? আমাদের পাইপলাইনের কী অবস্থা?

পাইপলাইনের দোষ অনেকেই দিয়ে থাকেন। বলেন যে, “বাংলাদেশের ক্রিকেটের পাইপলাইনে আর কোনো ভালো খেলোয়াড় নেই। নতুন প্রতিভা আর নেই।” কথাটাকে আমি একদম ঠিকও ভাবি না; আবার পুরোপুরি ভুলও ভাবি না।

কেনো ঠিক ভাবি না তার কারণ হলো, প্রায় প্রত্যেক সিরিজেই কিন্তু বাংলাদেশ দলে কারোর না কারোর অভিষেক হচ্ছে (চলমান পাকিস্তান টেস্ট সিরিজে ইয়াসির আলি রাব্বির)। স্কোয়াড ঘোষণা করার সময় নতুন মুখ থাকছেই। যদি পাইপলাইনে খেলোয়াড়ই না থাকে, তাহলে এইসব নতুন খেলোয়াড়রা আসছে কোথা থেকে? ফুটবলে যেমন যতো যা-ই হয়ে যাক, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-জার্মানি-ফ্রান্স-স্পেন-ইতালির মতো দেশগুলোতে নতুন-নতুন ফুটবল-প্রতিভার কোনো কমতি হবে না, তেমনি ক্রিকেটেও ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা-অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডেও নতুন-নতুন প্রতিভার কমতি হবে না। তাই পাইপলাইনে খেলোয়াড় নেই, কথাটা ভুল।

তবে ”ভালো খেলোয়াড়” নেই, এই কথাটা একেবারে ভুল না। ভালো কেউ জন্মের থেকে হয়ে আসে না; তাঁকে ভালো বানাতে হয়। ব্রাজিলের সৈকতে অনেক ফ্রিস্টাইলার বলের কসরত দেখিয়ে বেড়ান। প্রতিভাবানদের জন্মগতভাবেই এই গুণগুলো থাকে; ফুটবলের পরিভাষায় যাকে বলে “Flair”। কিন্তু এই ফ্লেয়ার দিয়েই কেউ জাতীয় দলে জায়গা করতে পারে না। তার জন্য সেই প্রতিভাবানদের প্রয়োজন হয় একটা স্ট্রাকচারের মধ্যে আসা। ফুটবলে যেটাকে বলে ”ট্যাকটিকাল শৃঙ্খলা” বা “ট্যাকটিকাল ডিসিপ্লিন”। একক নৈপুণ্যে নয়; একটা দল হয়ে জেতা। একটা দলের জন্য যে ভূমিকায় যাকে দরকার, তাকে খেলানো, এবং সেই খেলোয়াড়দের নিজের-নিজের ভূমিকাটা ঠিকমতো পালন করা। সেই কারণে আপনি সাধারণত ফুটবল বিশ্ব-কাপজয়ী কোনো দলকেই কোনো একজন খেলোয়াড়ের দল বলতে পারবেন না। ক্রিকেটেও ব্যাপারটা ঠিক এমনই। বিশ্ব-কাপের চ্যাম্পিয়নদের দিকে তাকান। তাদের কোনোটাকেই কি একজনের দল বলা চলে?

ক্রিকেটে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফরম্যাট। টেস্ট, ওয়ানডে, আর টি-টোয়েন্টি; তিন ফরম্যাটে খেলার ধরনটা হয় ভিন্নভিন্ন। এক ফরম্যাটের খেলোয়াড়; এমনকি কিংবদন্তিরাও অন্য ফরম্যাটে বিরাট ফ্লপ হতেই পারেন। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে সেই সংস্কৃতিটা নেই। কোনো একটা ফরম্যাটে ভালো করতে থাকা কাউকে এখানে জোর করে সব ফরম্যাটে নামিয়ে দেওয়া হয়। ওপেন করতে না পারা একটা ব্যাটারকে বারবার ওপেনে নামিয়ে তাঁর ক্যারিয়ারকেই হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়। আবার যাঁকে অনায়াসে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, তাঁকে স্কোয়াডেই ডাকা হয় না।

সর্বোপরি আমি একটাই কথা বলবো বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ব্রান্ডিং করতে হলে স্কুল ক্রিকেট থেকে বোর্ড পর্যন্ত সাবেক সফল ক্রিকেটারদের দায়িত্ব দিতে হবে তাদেরকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না সতন্তভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। সারাদেশে ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দিতে কাজ করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতে হবে। ক্রিকেট থেকে দূর্নীতি রোধ করতে হবে। বিশেষ দলের সুবিধা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। শুধু স্পিন নির্ভর থেকে বের হয়ে আসতে হবে সাথে সারাদেশে পেস বান্ধব পিচ ও তৈরি করতে হবে তাতেই দেশের ক্রিকেট ব্রান্ডিং হবে অন্যতায় ধ্বংসের দারপ্রান্তে উপনীত হবে বলে আমি মনে করি।

লায়ন আনোয়ার হোসাইন উজ্জ্বল
ইমেইল : [email protected]