বিশাল পরাজয়ের পরেও পুরস্কারপ্রাপ্ত হন টিক্কা খান!

আপডেট: ডিসেম্বর ১৪, ২০২০
0

সোহেল সানিঃ

দেশের পরাজয় তরান্বিত করেও রাষ্ট্র কর্তৃক পুরস্কার পান জেনারেল টিক্কা খান। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন পূর্বপাকিস্তানের কসাই খ্যাত গভর্নর।

টিক্কা খান “স্বাধীন বাংলাদেশ” অভ্যুদয়ের কিছুূদিন আগে পাকিস্তানে ফিরে গেলেও পুরস্কারের জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টোর ক্ষমতাগ্রহণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ পূর্বপাকিস্তানের গভর্নর হয়ে এসেছিলেন জেনারেল টিক্কা খান। ১৯৭২ সালের ৩ মার্চ ভুট্টো কর্তৃক সেই টিক্কাই নিযুক্ত হন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান। জনরোষে সামরিকজান্তা প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বসানো হয়েছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোকে। ভুট্টো টিক্কা খানকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান করে নিজেও এক বিস্ময়ে পরিণত হয়েছিলেন।

পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর লজ্জাস্কর আত্মসমর্পণমূলক পরাজয় পাকিস্তানের মানচিত্রকে বদলে দেয়।
যার নেপথ্যে রাজনৈতিকভাবে জুলফিকার আলী ভুট্টোরই অবদানই ছিল মুখ্য।

‘বাংলাদেশের কসাই’ খ্যাত জেনারেল টিক্কা খান সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর ভুট্টোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হন।
এমনকি পিপলস পার্টির নেতাও। সামরিক বাহিনী হাতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সেই ভুট্টোকেই ফাঁসিতে ঝুলে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

পরবর্তীতে পিতার যোগ্য সন্তান হিসাবে বেনজীর ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। লাইমলাইটে চলে আসেন ভুট্টো ভক্ত জেনারেল টিক্কা খান। প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টো ‘৮৮ সালে টিক্কা খানকে পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর করেন।
ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর আর তা যদি হয় পাকিস্তানের বেলায়, তবে সে নিষ্ঠুতার আরও তীব্রতর।

ভুট্টোর উত্তরসুরী কন্যা বেনজীর ভুট্টোও হত্যার শিকার হন। প্রকাশ্য নির্বাচনী জনসভায় গুলিবিদ্ধ হয়ে।

১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ডমার্শাল আইয়ুুব খানের বিরুদ্ধে যখন পূর্বপাকিস্তানে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয় তখন লে. জেনারেল পদে উন্নীত হন টিক্কা খান। ১৯৭১সালের ৬ মার্চ টিক্কা খান পূর্বপাকিস্তানের গভর্নর পদে নিয়োগ পান। তবে ঢাকায় আসেন ৭ মার্চ। যেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দিকনির্দেশনামূলক ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবাবের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধু এও বলেন বলেন,”আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমাদের যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা কর।

কিন্তু নতুন গভর্নর জেনারেল ইয়াকুব খানও পূর্বপাকিস্তানের সংকটকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার জন্য ইয়াহিয়া খানকে তাগিদ দেন। তিনিও পূর্ববর্তী গভর্নর আহসানের মতো পদত্যাগ করার কথা বলেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তখন টিক্কা খানকে গভর্নর করে ঢাকায় পাঠান। গভর্নর পদে আসীন হবার আগে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক ছিলেন টিক্কা খান। ‘৭১- এ ঢাকায় সামরিক অভিযান ও নৃশংস হত্যাকান্ড পরিচালনার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তাকে মূলত পূর্বপাকিস্তানের গভর্নর করেন।

পূর্বপাকিস্তান হাইকোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী (বদিউদ্দিন আহমেদ সিদ্দিকী) টিক্কা খানকে শপথ করাতে অস্বীকার করেছিলেন। বেসামরিক প্রশাসন কার্যত তখন পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কব্জায়। পাকিস্তানের সম্ভাব্য বিরোধী দলের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় সাংবাদিকদের কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আখ্যায়িত করে গিয়েছিলেন।

কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার অধ্যায় সূচিত হলে সেই প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিকীই জেনারেল টিক্কা খানকে ৯ এপ্রিল গভর্নর পদে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছিলেন। টিক্কা খানের সঙ্গে একই দিন পূর্বপাকিস্তান বাহিনীর কমান্ডার পদে লে. জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ নিয়াজী আসীন হন।

এর পরদিন ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার আত্মপ্রকাশ করে। ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী সরকার শপথ নেয়।

টিক্কা খান স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গভর্নর হাউজে (আজ যা বঙ্গভবন) থাকতেন। গুরুগম্ভীর ওই লোকটার দিকে তাকালে নাকি আঁচ করা যেত না লোকটা এতটা নৃশংস হতে পারেন। গভর্নর হাউজের তার চুল কাটা নাপিত ছিলেন ধীরেন রায়। একদিন চুল কাটাতে বসে টিক্কা খান নাপিতের নাম জানতে চান। ভীরুকণ্ঠে ধীরেন রায় শুনে টিক্কা খান বলেন, ‘তোম হিন্দু হ্যায়?’
ধীরেনের হাঁটু কাঁপুনি দেখে গভর্নর টিক্কা খান পুত্র খালিদকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, “ধীরেনের যেন কোন অসুবিধা না হয়, তুমি খেয়াল রেখো।

টিক্কা খানের সামরিক সচিব মেজর জিলানীর ভাষায় টিক্কা খান নাকি ব্যতিক্রমী জুতা পায়ে চলতেন গভর্নর হবার পরও। শক্ত হিলযুক্ত বুট পায়ে পথ চলতেন অন্তর কাঁপানো আওয়াজ করে। জনগণের কাছে কসাই বলে পরিচিত টিক্কা খানকে ‘খোদাভীরু’ হিসাবে চিত্রিত করে তার সামরিক সচিব দাবী করেন যে, “টিক্কা খান নামাজ আদায় করতেন এবং ধুমপান, মদপান থেকে মুক্ত দূরে থাকতেন।

অথচ, বাস্তবতা হচ্ছে টিক্কা খানের ২৫ মার্চ গণহত্যার পর এক কোটি লোক উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট তারই পরামর্শে আওয়ামী লীগের ৭৯ জন এমএনএ এবং ১৯৪ জন এমপিএ -কে অযোগ্য ঘোষণা করে উপনির্বাচন দেয়া হয়। স্বাধীনতা বিরোধীদের উপনির্বাচনে জয়ীও করা হয় ওই প্রহসনের নির্বাচন করে। যদিও এতকিছু করেও ইয়াহিয়ার সন্তুষ্টি আদায় করতে ব্যর্থ হন টিক্কা খান। ১২ আগস্ট লোক দেখানো রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরুর নামে টিক্কা খানকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

কুষ্টিয়ার ডা. এ এম মালিককে গভর্নর নিয়োগ করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্বপাকিস্তানে একটি সরকার গঠন করেন। মালিক মন্ত্রীসভায় আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত অধ্যাপক শামসুল হক ও নোয়াখালীর ওবায়দুল্লাহ মজুমদার যোগ দিলে আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কৃত হন। অন্যান্য মন্ত্রী ছিলেন, এএসএম সোলায়মান, মওলানা ইসহাক,একে মোশাররফ হোসেন, আবুল কাশেম, নওয়াজেশ আহমেদ, আখতার উদ্দীন আহমেদ, মওলানা একেএম ইউসুফ, মওলানা আব্বাস আলী খান, জসিম উদ্দীন আহমদ ও মুজিবুর রহমান প্রমুখ।

“মালিক নামা”
১৯০৩ সালে জন্ম নেয়া ডাঃ এ এম মালিক যখন যেমন তখন তেমন ধরণের সুবিধাবাদী চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। সেই সূত্রেই তিনি টিক্কা খানের স্থলে পূর্বপাকিস্তানের গভর্নর হন।

তিনি ১৯৪০ সালে শেরেবাংলার ও ১৯৪৬ সালে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দলে ভিড়ে বেঙ্গল আইন পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হবার পর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাকে চীফ হুইপ করেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হলে পূর্বপাকিস্তানে মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের লোক হয়ে যান মালিক। ফলে প্রাদেশিক সরকারেরর কৃষি ও মৎস মন্ত্রী হন।

১৯৪৯ সালে নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্য, শ্রম ও পূর্তমন্ত্রী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন ডাঃ আব্দুল মোত্তালিব মালিক। ১৯৫৮ সালে ৭ অক্টোবর সামরিক আইন জারি করেন ইস্কান্দার মীর্জা প্রেসিডেন্টের গদিতে বসলে রাষ্ট্রদূত হয়ে চলে যান সুইজারল্যান্ডে। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে অস্ট্রিয়া ও যুগোশ্লাভিয়ার তিনি রাষ্ট্রদূত হন। ইস্কান্দার মীর্জাকে হটিয়ে জেনারেল আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট হলেও মালিকের সামনে কোন সংকট দেখা দেয়নি। ১৯৬৭ সালে ডাঃ মালিক হলেন চীন, ফিলিপাইনে রাষ্ট্রদূত।

১৯৭১ সালে ১২ আগস্ট পূর্বপাকিস্তানের গভর্নর হন। আর এর মধ্য দিয়ে গণধিকৃত রাজাকারে পরিণত হন ডাঃ মালিক। জীবন বাঁচাতে পারলেও বিচারের সম্মুখীন হতে হয় তাকে। দালাল আইনে বিচারিক আদালত কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন ইয়াহিয়া খানের এ দোসরকে। বঙ্গবন্ধু হত্যারত্তোর রাজৈতিক পটপরিবর্তনের মুখে জেনারেল জিয়াউর রহমানের বদৌলতে ডাঃ এ এম মালিক কারামুক্ত হন এবং ১৯৭৭ সালে মারা যান।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান হতাশ হয়ে পড়েন। ২৩ নভেম্বর শেষ রক্ষার জন্য পাকিস্তানে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। ৩ ডিসেম্বর ভারতের ওপর বিমান হামলা চালান। হীতে বিপরীত হয়। পাল্টা ভারতও বিমান হামলা চালায়। ১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় গভর্নর হাউজে (বঙ্গভবন) বিমান হামলা চালানো হয়। দরবার হলে পার্শিয়ান কার্পেট থেকে আগুন ধরে যায় গভর্নর হাউজে। ওই মুহূর্তে গভর্নর মালিক বিদেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপরত ছিলেন। গভর্নর হাউজের পূর্ব উত্তর কোণায় নিরাপদ ব্যাংকার তৈরি করা হয়েছিল।

সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে অবস্থা বেগতিক দেখে দুপুর বারোটার দিকে গভর্নর মালিক ও তার মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আশ্রয় নেন। আন্তর্জাতিক রেডক্রস ঘোষিত ‘নো ওয়ার’ এলাকা ছিল ওই হোটেলটি। ১৬ ডিসেম্বর পরিসমাপ্তি ঘটে পূর্বপাকিস্তানের। বিকেল পাঁচটায় রেসকোর্স ময়দানে ভারত ও বাংলাদেশ বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় জেনারেল কমান্ডিং ইন চীফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিংহ অরোরার কাছে পাকিস্তান বাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটা যৌথ কমান্ড বাহিনী গঠনের অনুরোধ করলে ভারত তাতে সায় দেয়। পূর্বপাকিস্তানে স্থলপথে প্রবেশ করে ভারতীয় বাহিনী।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।