মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানমের স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত

আপডেট: জানুয়ারি ১০, ২০২১
0

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে নারী আন্দোলন ও মানবাধিকার আন্দোলনের অগ্রণী নেত্রী এবং সংগঠনের সভাপতি আয়শা খানমের প্রয়াণে অনলাইনে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত।

নারী আন্দোলন ও মানবাধিকার আন্দোলনের অগ্রণী নেত্রী এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানমের প্রয়াণে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ ০৯ জানুয়ারি ২০২১ (শনিবার) বিকাল ৩:০০ টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে অনলাইনে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।

সভায় স্মৃতিচারণ করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবীর, সাবেক ছাত্রনেতা ও রাজনীতিবিদ শামসুদ্দোহা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহসভাপতি, ডা. মাখদুমা নার্গিস রত্না , বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জাতীয় পরিষদ সদস্য রাশেদা খানম রীনা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি এবং লেখক ও প্রাবন্ধিক মফিদুল হক, ডাকসুর প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক এবং ডাটাসফটের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাহাবুব জামান, গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, দীপ্ত ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জাকিয়া কে হাসান, সিপিডি বোর্ড অফ ট্রাস্টির সদস্য এবং ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. সালমা আলী, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, মাননীয় সংসদ সদস্য ও প্রিপ ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক অ্যারোমা দত্ত প্রমুখ।
স্মরণ সভায় আইনবিদ, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, লেখক এবং ছাত্রজীবনের সাথী ও সহযোদ্ধাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আয়শা খানমের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

সভায় বক্তারা বলেন একজন আলোকিত মানুষ বলতে যা বোঝায় আয়শা খানম ছিলেন তাই। তার ব্যক্তিগত জীবনে নিয়মতান্ত্রিক চলাফেরা করতেন এবং চিন্তাভাবনা করতেন । রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা থাকলেও তিনি নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন। তিনি আইন সংস্কার আন্দোলন এবং পারিবারিক আইনের খসড়া প্রণয়নে বড় ভূমিকা রাখেন। সিডও সনদ বাস্তবায়নে তিনি দেশে ও দেশের বাইরে অত্যন্ত পরিচিত মুখ ছিলেন। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য সরাসরি নির্বাচনের জোর তাগিদ দেন। ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন, নারী নীতি বাস্তবায়ন এবং শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে মহিলা পরিষদ ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি একসাথে কাজ করেছে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিতে আয়শা খানম কেবল যোদ্ধা নন অভিভাবক ছিলেন।

১৯৭৫ এর পর রাজনীতিতে যে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার সূচনা হয় তা প্রতিহত করতে ও প্রতিবাদ করতে আয়শা খানম অত্যন্ত দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন। নারী আন্দোলন রাজনীতির বাইরে নয়, তিনি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারী আন্দোলন পরিচালনা করতেন,নারী অধিকারের দরকারি বিষয়গুলো সরকারের কাছে তুলে ধরতে নিরলস পরিশ্রম করেছেন। নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা এবং কাজ চালিয়ে যাওয়ার নিয়ে দিকটিতে আয়শা খানমের নেতৃত্ব ছিলো অত্যন্ত দূরদর্শিতাসম্পন্ন। যখন ৫ম বার্ষিকী পরিকল্পনা নেয়া হয় এতে নারীর অধিকার বিষয়টি যুক্ত হয় আয়শা খানমের দৃঢ় প্রচেষ্টার কারণে। ২০০৮ সালে নারীনীতি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছেন। ২০১৬ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন প্রণয়নে ও তার ভূমিকা ছিলো নারী মুক্তির আন্দোলনের নানা কাজে তিনি একটা বড় প্রেরণা হয়ে থাকবেন। আয়শা খানমের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশে তাঁর বইগুলো সংগ্রহ রেখে একটা রিসার্চ সেন্টার বা জ্ঞানগৃহ গড়ে তোলার, তিনি যে কাজগুলো নিয়ে ছিলেন তাকে অগ্রসর করে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তারাা।

তাঁরা বেগম রোকেয়া, কবি সুফিয়া কামাল এবং আয়শা খানম কেবল নারী আন্দোলনই নয় যেকোনো আন্দোলনের আইকন হিসেবে উল্লেখ করেন। আদর্শগতভাবে ও নীতিগতভাবে তিনি নিজ অবস্থানে অনড় থেকে সর্বদা কাজ করেছেন যা আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
আয়শা খানমের পরিবারের সদস্য ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা লুৎফার রহমান এ স্মরণসভা আয়োজনের জন্য বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতি ধন্যবাদ জানান।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহসভাপতি ডা. মাখদুমা নার্গিস বলেন নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সে ছিলো নিবেদিত যোদ্ধা। ইতিবাচক এবং নেতৃত্বসুলভ কাজের মধ্য দিয়ে তিনি নারী আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং সকল সামাজিক আন্দোলন কে বেগবান করতে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন। বৈশি^ক নারী আন্দোলনের সাথে মহিলা পরিষদকে যুক্ত করতে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, আয়শা তাঁর জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেছে কীভাবে গুছিয়ে কাজ করতে হয়। সে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে মহিলা পরিষদে কাজ করে গেছে। ১৯৭২ সালে তিনি মহিলা পরিষদেন সাথে যুক্ত হন।

তৃণমূলপর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালীভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে রাখী দাশ পুরকায়স্থ এবং আয়শার খানমের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। মহিলা পরিষদের ঐতিহ্যের ধারাকে বহন করে সমতাপূর্ণ, মানবিক, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তোলার কাজ করেছেন আয়শা খানম। তাঁর কাজকে এগিয়ে নিতে এবং তার কৌশলকে অনুসরণ করতে তিনি সকলেন প্রতি আহ্বান জানান।

সভার শুরুতে প্রয়াত নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী অদিতি মহসিন। আয়শা খানমের জীবন ও কর্মের উপর সচিত্র উপস্থাপন করা হয়।
স্মরণসভাটি পরিচলানা ও আয়শা খানমের পূর্ণ জীবন-বৃত্তান্ত উপস্থাপন করেন সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ স¤পাদক সীমা মোসলেম। তিনি বলেন, বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, মানবাধিকার ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় সংগঠক ছিলেন আয়শা খানম। ১৯৭০ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি মহিলা পরিষদের সাথে যুক্ত হন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০৮ সাল থেকে তিনি সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, আইন সংস্কার আন্দোলন, সিডও বাস্তবায়নসহ নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রাখেন তিনি। ২০০২ সাল থেকে ৬৮টি সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সেক্রেটারিয়েট-এর নেতৃত্ব প্রদান করে আসছিলেন। বৈশ্বিক নারী আন্দোলনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

সভায় আলোচনা শেষে শোকবার্তা জ্ঞাপনকারী বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের প্রতি ও গণমাধ্যমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সংগঠন সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম।
সভা সঞ্চালনা করেন সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম ।