মৌমাছির গ্রাম এখন কুড়িগ্রামের চৌদ্দঘুরি

আপডেট: জানুয়ারি ৫, ২০২৩
0

কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি:
“মৌমাছি মৌমাছি কোথা যাও নাচি নাচি
দাড়াবার সময়তো নাই। ওই ফুল ফুটে বনে
যাই মধু আহরনে দাড়াবার সময়তো নাই”।

কবি নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের “কাজের আনন্দ” কবিতায় মৌমাছিরা ছুটে চলে মধুর সন্ধানে। মৌমাছিদের কারো কথা শোনার সময় নেই। তাই মৌমাছিদের মধ‍ু সংগ্রহের জন‍্য ছুটে যাওয়ায় মধ‍্য দিয়ে কবির কল্পনায় মৌমাছিরা ব‍্যাস্ত সময় পার করছে মৌমাছির গ্রাম নাগেশ্বরীর চৌদ্দঘুরিতে। সেখানে সারি সারি মৌচাক। নেচে নেচে গেঁয়ে গেঁয়ে উড়ে চলে মৌমাছি। মৌমাছিদের নাচ গানে পুরো গ্রাম মুখরিত। ওই গ্রামে অসংখ‍্য মৌচাকের কারনে এখন মৌমাছির গ্রাম বলে পরিচিতি পেয়েছে চৌদ্দঘুরি।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর ব্রহ্মপুত্র বেষ্ঠিত চরাঞ্চলীয় ইউনিয়ন নারায়ণপুরের ওই গ্রামে অসংখ্য চাক তৈরি করে বাসা বেধেছে অজস্র মৌমাছি। এমনকি ওই এলাকার চৌদ্দঘুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ‍্যালয় নামের একটি বিদ্যালয় ভবনেই রয়েছে একাধিক মৌচাক। মৌমাছিরা নেচে গেয়ে মধু সংগ্রহের কাজে ব‍্যাস্ত থাকলেও মৌমাছির হুল ফোটানোর আশংকায় সবসময় আতঙ্কিত থাকছেন গ্রামবাসী ও কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
দ্বীপ ইউনিয়ন বলে পরিচিত নারায়ণপুর। সেই ইউনিয়নের একটি দ্বীপ গ্রাম চৌদ্দঘুরি। এই অঞ্চলের লোকজন বালুকাময় জমিতে প্রতিবছর ব‍্যাপক হারে সরিষার চাষ করে থাকে। ক্ষেতে সরিষার ফুল ফোটার সাথে সাথেই মধু সংগ্রহের জন‍্য দুর দুরান্ত থেকে অজস্র মৌমাছি আসে এই গ্রামে। মৌচাক তৈরি করে বাসা বাঁধে গাছ-পালা ও বিভিন্ন স্থায়ী স্থাপনায়। এই গ্রামের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চৌদ্দঘুরি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবণের চারদিকের কার্ণিশ, জানালার সানসেট, বারান্দার বাড়তি অংশ ও আশে পাশের গাছ পালায় ঝুলছে শতাধিক মৌচাক।
বিদ্যালয়টির দ্বিতল ভবনের বিভিন্ন অংশে বসেছে ছোটবড় ৬০টি মৌ-চাক। ভবনের সামনে বেশ কয়েকটি শিমুল,কাঠাল, আমগাছসহ একটি নারিকেল গাছে বসেছে শতাধিক মৌচাক। এসব গাছের কোনটা রয়েছে ভবন ঘেষে। এছাড়া ভবনের পিছন ও পশ্চিম পাশের গাছগুলোতেও রয়েছে একাধিক মৌ-চাক। এসব মৌ-চাকের কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সংখ‍্যা কমে গেছে। মৌমাছির ভয়ে বিদ্যালয়টির সামনের পথ দিয়ে চলাচল বন্ধ করেছে স্থানীয়রা। স্থানীয়রা এবং বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ঠরা জানান, প্রতিদিনই মৌমাছি কোন কোন মানুষকে তাড়া করে এবং হুল ফোটায় । এই কারণে গ্রামের মানুষজন আতংকে থাকেন। শুধু বিদ্যালয়টিতেই নয় গ্রামের বেশ কয়েকটি বাড়িতেও বসেছে একাধিক মৌচাক। সব মিলিয়ে ৬ শতাধিক মৌচাক বসেছে ওই চৌদ্দঘুরি গ্রামে।

বিদ‍্যালয়টির পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান, সোহেল রানা, নাঈম, সাগর, চতুর্থ শ্রেনির সুমাইয়া, খাদিজা খাতুন ও সোনামনিসহ অনেকই জানায়, অসংখ্য মৌমাছি সবসময় উড়াউড়ি করে। এজন‍্য ভয়ে আমরা প্রায়ই স্কুলে আসিনা।

চতুর্থ শ্রেনির কর্মচারী সোহেল রানা জানায়, প্রতিদিন ভয়ে ভয়ে স্কুলের ক্লাসরুম খুলে দিয়ে অফিসের জানালা দরজা বন্ধ করে ভিতরে থাকি। স্কুলের বারান্দা এবং অফিসের সাথেও মৌমাছি চাক দিয়েছে। মাঝে মধ্যে ধোঁয়া দিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও কোন কাজ হয়না।
চৌদ্দঘুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ‍্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিন্টু চন্দ্র সেন বলেন, প্রতিবছর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত মৌমাছির উপদ্রপ সহ্য করতে হয়। এবার মৌচাকের সংখ্যা অনেক বেশী। বিদ্যালয় ভবন এবং আশপাশের গাছ মিলে তিন থেকে সাড়ে তিনশ মৌচাক বসেছে।
স্থানীয় মকবুল ও সদরুল জানায়, চরাঞ্চলের ওই এলাকাটিতে এইসময় ব্যাপক সরিষার চাষ হয়। এই সরিষার মধু সংগ্রহ করতেই প্রতিবছর নভেম্বর মাসে এখানে মৌমাছির আগমন ঘটে। আশেপাশে বন জঙ্গল ও গাছপালা না থাকায় এই বিদ্যালয় এবং পাশের গাছগুলিতে মৌচাক দেয় মৌমাছিরা। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার মৌচাকের সংখ্যা অনেক বেশী বলে মনে হচ্ছে।

ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান বলেন, এবার সরিষার চাষ বেশী হওয়ায় মৌমাছির চাকের সংখ্যাও বেড়েছে। শুধু স্কুলেই নয় আশেপাশের অনেক বাড়িতেও মৌমাছি চাক দিয়েছে। আমার বাড়িতেও রয়েছে ৬টি মৌচাক। সব মিলে এলাকাটিতে ৫ থেকে ৬শ মৌচাক রয়েছে। স্থানীয়রা এগুলো থেকে মধু সংগ্রহ করলেও শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিপ্লব কুমার মোহন্ত বলেন,ওই অঞ্চলে সরিষার চাষ বেড়ে যাওয়ায় মৌমাছিরা দল বেধে আসছে এবং চাক দিচ্ছে। সেসব চাক থেকে মধু সংগ্রহ করে বিক্রি করে অনেকেই লাভবান হচ্ছেন। এটা স্হানীয় অর্থনীতির জন‍্য একটা ভালো দিক।
###
০৫-০১-২৩