রবিবার সৈয়দপুর পৌরসভার ভোট ,মেয়র পদে ত্রিমুখী লড়াই :ফ্যাক্ট উর্দুভাষী ভোটার

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২১
0

শাহজাহান আলী মনন, সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধিঃ ২৮ ফেব্রুয়ারি রবিবার পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে নীলফামারীর প্রথম শ্রেণীর সৈয়দপুর পৌরসভার ভোট গ্রহন অনুষ্ঠিত হবে। এবার মেয়র পদে ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এদের মধ্যে প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের কেন্দ্র করে ত্রিমুখী লড়াই হবে। ইতোমধ্যে এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে প্রচার প্রচারনা ও জনমত জরিপে। তবে জয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মূল ভুমিকা রাখবে সিংহভাগ উর্দুভাষী ভোটারের সমর্থন। যে প্রার্থী তাদেরকে কাছে টানতে পারবে সেই বিজয়ী হবে।

এই তিন প্রার্থী হলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাফিকা জাহান আখতার বেবী, জাতীয়বাদী দলের আলহাজ্ব রশিদুল হক সরকার, জাতীয় পার্টির আলহাজ্ব সিদ্দিকুল আলম। এর মধ্যে বিএনপি ও জাপা’র প্রার্থীরা ইতোপূর্বেও পৌর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। আ’লীগের প্রার্থী রাজনীতিতেই নতুন। তাঁর স্বামী সৈয়দপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা আ’লীগ সভাপতি আখতার হোসেন বাদল তফশিল ঘোষনার পরই করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রী নিজে বিশেষ বিবেচনায় রাফিকা জাহান আকতার বেবীকে মনোনয়ন দেন। নতুন মুখ হওয়ার পরও শুধুমাত্র শেখ হাসিনার প্রার্থী হওয়ায় ত্রিধা বিভক্ত আ’লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নেমেছে। সেক্ষেত্রে দলীয় নেতা-কর্মীদের ভোট শতভাগ পাবেন বলে আশাবাদী দলের নেতৃবৃন্দ। সেইসাথে নবীন ভোটার ও উর্দুভাষীদের ভোট টানতে পারবে। এক্ষেত্রে তারা এবারই প্রথম ভোট দিবেন বা তরুন ও যুবকদের বর্তমান সরকারের নানামুখী উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরার মাধ্যমে এবং সদ্য স্বামী হারা নারী হিসেবে প্রার্থীর প্রতি সহানুভূতির আবেগকে কাজে লাগিয়ে মহিলাদের সমর্থন পেতে কাজ করেছেন।

এব্যাপারে তারা অনেকটা সফল হয়েছেন বলে দাবী করে নৌকার বিজয় নিশ্চিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করছেন সভা সমাবেশে। সৈয়দপুরের প্রকৃত উন্নয়নে নৌকার বিকল্প নাই এটা সৈয়দপুরবাসী বুঝতে পেরেছে এবং সেজন্য তারা বিপুলভাবে নৌকায় ভোট দিবেন বলেও মত প্রকাশ করেছেন।

এদিকে উর্দুভাষী অধ্যুষিত ব্যতিক্রমী শহর সৈয়দপুরের সব নির্বাচনেই জয় পরাজয়ের মূল ফ্যাক্ট এই ভোটাররা। কারণ মোট ভোটারের প্রায় ৭০ ভাগই তারা। এদের সমর্থন নিয়েই দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর পৌরসভার মেয়র পদটি ধরে রেখেছে বিএনপি। দলটির কেন্দ্রীয় গ্রাম সরকার বিষয়ক সহ সম্পাদক ও সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা শাখার সাধারন সম্পাদক অধ্যক্ষ আমজাদ হোসেন সরকার ভজে একবার সংসদ সদস্য, একবার উপজেলা চেয়ারম্যান ও চার বার পৌর মেয়র হয়েছেন।

কিন্তু তিনি এবার প্রথম তফশিলে বিএনপি’র মনোনয়ন না পেয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নারিকেল গাছ প্রতিক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিএনপি’র মনোনয়নপ্রাপ্ত জেলা বিএনপি’র যুগ্ম আহবায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এ্যাড. এস এম ওবায়দুর রহমান প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন। এতে তার বিজয় প্রায় সুনিশ্চিত হয়ে যায়। ভোট গ্রহনের ২ দিন আগে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যাওয়ায় নির্বাচন স্থগিত হয়। দ্বিতীয়বার তফশিল ঘোষনা হলে নৌকার প্রার্থীর মত বিশেষ বিবেচনায় মনোনয়ন পায় আমজাদ হোসেন সরকারের ভাই জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব রশিদুল হক সরকার।

ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষেও বিভক্ত বিএনপি একাট্টা হয়ে আগে থেকে তৈরী মাঠে সম্মিলিতভাবে নেমে পড়েছে। তাদের ভরসা হলো উর্দুভাষীসহ বিএনপি জামায়াতের ভোট। এক্ষেত্রে তারা আশাবাদী যে, ভজেভক্তদের সহানুভূতির ভোট শতভাগ না পেলেও তিন চতুর্থাংশ তারা পাবেই। সেই সাথে জামায়াতের সিংহভাগও পাবে। তাছাড়া ভোটের আগেই জাপা-আ’লীগের সংঘর্ষের ঘটনায় করা মামলায় বিএনপি নেতাকর্মী জড়ানো ও গ্রেফতার, বাড়িত গভীর রাতে পুলিশ ও দূর্বৃত্তদের হামলা ভাঙ্চুর করা সৈয়দপুরের শান্তিপ্রিয় সাধারন মানুষের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

নির্বাচনী কাজে আ’লীগ ও প্রশাসনের বাধা এবং নৌকার সমর্থনে প্রচারনায় কেন্দ্রীয় নেতাদের উস্কানিমূলক বক্তব্য ও স্থানীয় কর্মীসমর্থকের পায়ে পা দিয়ে ঝগরা বাধিয়ে পরিবেশ অস্থিতিশীল করার পায়তারা নিয়েও জনমনে ভীতির সঞ্চার করেছে। ভোটাররা তাদের এহেন উচ্ছৃঙ্খল আচরণকে ক্ষমতার অবৈধ দাপট হিসেবে দেখছে। তারা ভাবছে মেয়র না হতেই আ’লীগ যেভাবে ক্ষমতা দেখাতে মত্ত নির্বাচিত হলে এটা বহুগুণে বেড়ে গিয়ে অন্যরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এই ঘটনাগুলো নেতিবাচক প্রভাব সাধারন ভোটারদের চিন্তায় রেখাপথ করেছে। তাই তারা আমজাদ হোসেন সরকারের মতই তার ভাইকে ভোট দিয়ে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করবে। সৈয়দপুরে দীর্ঘদিনের সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশকে ধরে রাখার স্বার্থে ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশাজীবী নেতৃবৃন্দও এমনটা ভাবছে বলে মনে করছে বিএনপি।

একইরকম ধারনা পোষন করছেন লাঙলের প্রার্থী আলহাজ্ব সিদ্দিকুল আলম তথা জাতীয় পার্টি। তাদের ধারনা সংখ্যাগরিষ্ঠ উর্দুভাষীদের ভোট এবার জাতীয় পার্টির পক্ষেই আসবে। কারণ বিগত ৩০ বছর ধরে বিএনপি’র মেয়র থাকার পরও সৈয়দপুর কাঙ্খিত কোন উন্নয়ন হয়নি। এরশাদের আমলে পৌর চেয়ারম্যান ছিলেন জাপা নেতা এজাহার আহমেদ। তিনি যে উন্নয়ন করে গেছেন তাই এখনও দৃশ্যমান। একারনে একমাত্র লাঙ্গল বিজয়ী হলেই প্রকৃত উন্নয়ন হবে। এখানকার সংসদ সদস্যও জাপার হওয়ায় মেয়রের সাথে সমন্বয়ে সরকারী সকল সুযোগ সুবিধা নিয়ে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন সম্ভব হবে।

যা আওয়ামীলীগের প্রার্থীর দ্বারা সম্ভব নয়। একে তিনি নারী এবং নতুন। তার উপর নির্বাচিত না হতেই তার চারপাশে থাকা নেতাকর্মীরা যেভাবে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে তা মেয়র হলে ধরাকে সরাজ্ঞান অবস্থায় দাড়াবে। যা শান্তিপ্রিয় সৈয়দপুরবাসী কখনই চাইবে না। তাছাড়া সিদ্দিকুল আলম একজন শিল্পপতি হয়ে নিজ অর্থায়নে একাধিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। তিনি একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ। তিনি মেয়র হলে পৌর পরিষদের সকল দূর্নীতি রোধ করে সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারবেন।

এ বিষয়ে সচেতন নাগরিকসহ সর্বস্তরের ভোটাররা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তাই বিভিন্ন পেশাজীবী, ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং তৃনমূল জনগন নিজ উদ্যোগে লাঙ্গলের প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করাসহ ভোটের কাজে সহযোগী হয়েছেন। তাই তারা আশা করছেন এমপির মত মেয়র পদেও লাঙল মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে পৌরবাসী দেখিয়ে দিবে সৈয়দপুরের মাটি জাতীয় পার্টির ঘাটি।
এভাবে তিন প্রার্থীই উর্দুভাষী ভোটার, দলীয় ভোটার এবং পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের আলোকে সাধারন ভোটারদের ভোট নিজেদের পক্ষে দাবী করেছেন। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষনে মনে হচ্ছে ত্রিমুখী লড়াই হবে এখানে।

অপরদিকে আরও দুইজন প্রার্থী ইসলামী আন্দোলনের হাফেজ নুরুল হুদা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী রবিউল আউয়াল রবি নিজ দলীয় ও ব্যক্তিগত পরিবার পরিজন ও পরিচিতদের ভোট পাবেন। যার মধ্যে উর্দুভাষী ভোটারদেরও অংশগ্রহণ থাকবে।