লকডাউন শিথিল : ভয়াবহ বিপর্যয়ের পথে নারায়ণগঞ্জ

আপডেট: মে ১৪, ২০২০
0

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ : ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতির মধ্যে লকডাউন শিথিল করে দেয়া হয়েছে। দোকানপাট, গার্মেন্ট, গণপরিবহন সহ প্রায় সকল কিছু খুলে দেয়া হয়েছে। এই অবস্থায় জনগণ শহরমুখি ও মার্কেটমুখি হচ্ছে। জনসমাগম শূন্যতা ধীরে ধীরে জনসমুদ্রে পরিণত হচ্ছে। মার্কেটগুলোতে ক্রেতাদের ভিড়ের কারণে জটলা দেখা যাচ্ছে। এদিকে লকডাউন শিথিল হতেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। তবুও কারো টনক নড়ছেনা। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র এ নিয়ে বেশ শঙ্কা বোধ করেছেন। অন্যদিকে জেলা প্রশাসক কঠোর অবস্থানে থাকবে বললেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এতে করে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলাকে।
করোনা ভাইরাসের হটস্পট নারায়ণগঞ্জ জেলায় এখন পর্যন্ত হাজার ছাড়িয়ে গেছে আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যুবরণ করেছে অর্ধশতাধিক। দফায় দফায় লাফিয়ে লাফিয়ে এ মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এমনকি এ জেলা এতোটাই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে যে কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে পরিবার স্বজনরা পর্যন্ত এগিয়ে আসছেনা। এরূপ পরিস্থিতিতে ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে পুরো জেলা লকডাউন করে দেয়া হয়। কিন্তু আসন্ন ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে লকডাউনি শিথিল করে দেয়া হয়। এর ফলে সকল প্রকার গার্মেন্ট, কারখানা, মার্কেট সহ দোকানপাট খুলে দেয়া হয়। এছাড়া গণপরিবহনও চলাচল করছে। এতে করে লাখ লাখ মানুষের জনরােত শহরমুখি হচ্ছে। আর মার্কেটগুলোতেও সেই রােতের ঢেউ বেশ জোরে আঘাত হানছে যা করোনা পরিস্থিতিতে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জানা গেছে, ১০ মে নগর ভবনে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে লকডাউন শিথিল প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী বলেছেন, ইতোমধ্যে অল্প পরিসরে দোকানপাট খুলে দেওয়া হলেও নারায়ণগঞ্জে কিভাবে মানুষকে রক্ষা করবো, সামাজিক দূরত্ব কিভাবে মানা হবে সেটা আমার বোধগম্য না। একমাত্র উপরওয়ালা ছাড়া আমাদের কিছু করার আছে কি না জানি না। স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। নতুবা আমাদের বিপর্যয় হবে। ফুটপাত হকারমুক্ত রাখা প্রয়োজন। কারণ সেখানে ১০/২০ জন লোক একসাথে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ যেহেতু সব দোকানপাট খুলে দেওয়া হয়েছে সেহেতু সংক্রামনের হারও দ্রুত বাড়ার আশংকা রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ২৬ মার্চ আমরা সরকারের কাছে লকডাউন চেয়েছিলাম। ৬ এপ্রিল আমরা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ল্যাব চেয়েছিলাম। পরে আমি সহ আমাদের জনপ্রতিনিধিরা ল্যাব চেয়েছিলাম সবাই চেষ্টা করেছিলাম। সকলের প্রচেষ্টায় নারায়ণগঞ্জে ল্যাব হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালকে করোনা হাসপাতাল ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে যাতে সঠিক চিকিৎসা হয় সেটাই আমি চাই। কিন্তু এখানে আইসিও নাই, অক্সিজেনের অভাব, ডাক্তার নার্স নাই এগুলো যেন দ্রুত দেওয়া হয় সেজন্য সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। শুধু নামে করোনা হাসপাতাল যেন না হয়। খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতাল যেন পরিপূর্ণ একটি হাসপাতালে পরিণত হয়। কারণ যেহেতু সব দোকানপাট খুলে দেওয়া হয়েছে সেহেতু সংক্রামনের হারও দ্রুত বাড়তে পারে।

৬ মে নারায়ণগঞ্জের করোনা হাসপাতালে (৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল) পিসিআর ল্যাব উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, আগামী ১০ তারিখ থেকে বাজার খোলা। সেখানেও আমরা কঠোর অবস্থানে থাকবো। এই জায়গায় আপনাদের সহযোগীতা চাই। ব্যবসা তাঁরা করবে কিন্তু আমরা যেন নারায়ণগঞ্জকে আর দুর্যোগের মধ্যে ফেলে না দেই। কোন মানুষ ঈদের সময় একজনের বাড়ি আরেকজন যাবেন না। কোন বাচ্চা যেন বাজারে না যায়। অতিউৎসাহে বাচ্চাকে নিয়ে বাজারে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। সব দোকান মালিকদের অনুরোধ থাকবে আপনাদের দোকানের সামনে জীবানুনাশক টানেল তৈরী করে দেন। হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করে দেন। নয়তো কিন্তু আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে।

তিনি আরো বলেন, অবস্থানগত কারণে আমরা বাংলাদেশের সেরা জেলা। কিন্তু করোনার জন্য আমাদের অনেকে কথা শুনতে হচ্ছে। বরিশালের লোক কিন্তু বলে নারায়ণগঞ্জের লোক। এই দুর্নাম আমরা নিতে চাই না। বরং সে নারায়ণগঞ্জে এসে খেয়ে গেছে। এখন বলে যে সে নারায়ণগঞ্জের লোক। সে কুমিল্লার লোক সে গেছে তাঁর বাড়িতে কিন্তু আমাদের শুনতে হয় সে নারায়ণগঞ্জের লোক। এটা যেন না হয়।

এখানে উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জে লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। ১০ মে সকাল থেকে গণপরিবহন ব্যতিত সকল প্রকার যানবাহন চলছে, বেশীরভাগ মার্কেটগুলো খোলা, খাবারের দোকানগুলোও খোলা রয়েছে। এ ছাড়া শহরের চাষাঢ়া, ২ নং রেলগেট, বন্দর খেয়াঘাট, নিতাইগঞ্জ, পঞ্চবটিসহ বিভিন্ন এলাকায় মাঝে মাঝে মাঝারি যানজটেরও দেখা মিলছে।

জানা গেছে, মার্কেট ও গার্মেন্ট খোলার পর এবং লকডাউন শিথিল করার পর থেকে শহরমুখি জনসমাগম দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে মার্কেটগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউ সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করছেনা। তার উপরে পরিবারের বাচ্চাদের নিয়ে অধিকাংশ ক্রেতারা বিপণিবিতানগুলোতে ভিড় করছেন। অন্যদিকে সকল মার্কেটের সামনে টালেন স্থাপনের নির্দেশনা দিলেও গুটি কয়েক মার্কেট ছাড়া এই নির্দেশনা কেউ মানছেনা। এতে করে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি ভয়াবহ বিপর্যয়ের পথে হাঁটছে।
নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন মুহাম্মদ ইমতিয়াজ বলেন, যেভাবে জনগণ অসচেতন হয়ে ঘুরাফেরা করছে তাতে করোনা ভাইরাসের সংক্রামণ বাড়বে। বর্তমানের চেয়ে কয়েকগুণ বাড়বে।

সংক্রামণ বৃদ্ধির বিষয়ে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকায় মানুষের সমাগম সব থেকে বেশি। বিশেষ করে শহরের অন্যতম পাইকারী ও খুচরা বিক্রির দিগুবাবুর বাজারে ক্রেতাদের ভীড় সব থেকে বেশি। তাছাড়া ব্যবসা বাণিজ্য, অফিস আদালত, দোকান, শপিং মল ইত্যাদি সব কিছুই শহর কেন্দ্রীক বেশি। তাছাড়া শহরের লাগোয়া বেশ কিছু পোশাক কারখানা, শিল্প কারখানা, খাদ্য সামগ্রীর মিল, ডায়িং কারখানা ইত্যাদিও রয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ অভ্যন্তরে সব থেকে জনবহুল হলো হোসিয়ারী শিল্প। এসব ক্ষেত্রে প্রতিদিনই মানুষের জনসমাগম বাড়ছে। ফলে এসব থেকে সংক্রামণের ঝুঁকি বাড়ছে। এর থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ গাদাগাদি করে শীতলক্ষ্যা নদী পারাপার হচ্ছেন।

এসব ক্ষেত্রে কোন ভাবেই মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্ব।
এছাড়াও নারায়গঞ্জের মানুষের মধ্যে হোম কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন এমনকি লকডাউন মানার প্রবণতা অনেক কম। প্রশাসন একের পর এক অনুরোধ, মাইকিং সহ বিভিন্ন কার্যক্রম করলেও মানুষ প্রতিনিয়ত ঘর থেকে বের হচ্ছেন। তথ্য গোপন করে হাসপাতালে গিয়ে স্বাস্থ্য কর্মীদের সংক্রামনিত করছেন। এমনকি হোম কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন না মেনে ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে এসে আড্ডা দিচ্ছেন। যততত্র হাচি কাঁশি দিচ্ছে আর সংক্রামণ ফেলছেন।

এগুলো বাদেও মানুষের মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্য বিধি মানার প্রবণতা কম। জরুরী প্রয়োজন ছাড়াও মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন। অযথা রাস্তার পাশে আড্ডা দেয়া, চা পান করা, ধূমপান করা, স্বাস্থ্য কর খাবার না খাওয়া সহ বিভিন্ন কার্যকারী পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করছে না। ফলে দ্রুত সুস্থ হয়ে পরছেন সাধারণ মানুষ।

এর বাইরে এখনও রাতের আঁধারে নারায়ণগঞ্জের বাইরে ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, নোয়াখালি, বরিশাল ইত্যাদি অঞ্চলে যাওয়া আসা থেমে নেই। পুলিশ বাধাদেয় সেজন্য ট্রাক, অ্যাম্বুলেন্স, কাভার্ড ভ্যান ইত্যাদি ভাবে যাতায়াত করছেন।

LEAVE A REPLY