শুধু মুখেই শিশুর স্বার্থরক্ষাকারী অভিভাবক রাষ্ট্র!

আপডেট: অক্টোবর ১২, ২০২০
0

সোহেল সানি

শিশু হলো রাষ্ট্রীয় পোষ্য এবং রাষ্ট্র তার সর্বোত্তম স্বার্থরক্ষাকারী অভিভাবক। রাষ্ট্রের পিতৃসম অভিভাবকত্বকে ‘প্যারেনস পেট্রি’ বলা হয়। শিশু- বয়স্কের মধ্যে পৃথক বিচার ব্যবস্থাও এ কারণে।
যে শিশুটি গৃহে যথাযথ যত্ন ও তত্ত্বাবধান এবং পরিবেশ পায়নি, সে শিশুটি অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে জড়িত হয়ে পড়লে অভিভাবক হিসেবে তাকে শাস্তি দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করতে পারে না রাষ্ট্র। আধুনিক রাষ্ট্র শিশু-কিশোরদের অভিভাবকের দায়িত্বপালন করে থাকে।
বাংলাদেশে কোন পরিসংখ্যান না থাকায় শিশু যৌন উৎপীড়নের চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। তবে দেশে যৌন উৎপীড়ন বা শিশু ধর্ষণও সাম্প্রতিক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
পরিবারের নিকট আত্মীয়রাই সাধারণত শিশুদের অসঙ্গত যৌনপীড়ন করে থাকে। এর ফলে শিশুর মানসিক বিকাশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং শিশুটি যৌন বিকৃত এক অস্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে।
শিশু-কিশোর অপরাধের সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন অপরাধ বিজ্ঞানীরা। যেমনঃ শহর জীবনের নিঃসঙ্গতা, পিতামাতার উভয়ের কর্মজগতে তৎপরতায় পিতা-মাতার অপর্যাপ্ত তদারকি, পরকীয়া, মানসিক অসুস্থতা, অসঙ্গত মূল্যবোধ ও লক্ষ্য, অবৈধ উপায়ে অভিভাবকের উপার্জন, স্যাটেলাইট সংস্কৃতি, কুরুচিপূর্ণ সিনেমা, টিভিসহ সামাজিক গণমাধ্যমে অশ্লীল নীল ছবি, অসামাজিক সঙ্গ, ইত্যাদির কারণে শিশু-কিশোর অপরাধ বাড়ছে।
বরিশালে চার শিশুর বিরুদ্ধে রুজুকৃত ধর্ষণ মামলা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। আসল ঘটনা উন্মোচনে মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ ও নির্দেশনা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ঘটনা। শিশু-কিশোর যে রাষ্ট্রের পোষ্য এবং রাষ্ট্রই যে অভিভাবক তা হাইকোর্টের আদেশ প্রমাণ করেছে। উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতি যে ভর্ৎসনামূলক আদেশ দিয়েছেন, নিম্ম আদালতের বিচারকদের জন্য শিক্ষনীয়।
জনমনে সৃষ্ট বিস্ময়ের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ফেইসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক গণমাধ্যমেও লক্ষ্য করা গেছে। এ ধরণের ঘটনা সংঘটিত হলে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া সামাজিক গণমাধ্যমে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা ভুলে যাই ক্ষোভ-বিক্ষোভের ভাষাও যে সৃজনশীল হওয়া দরকার সেটা। রাষ্ট্রের যে সংবিধান নাগরিকত্বের মর্যাদা দিয়েছে তা আইন দ্বারাই আরোপিত। অতএব সংক্ষুব্ধ সুনাগরিক হিসাবে আইনের কাছেই প্রতীকার প্রত্যাশা করতে হবে, যা মনগড়া কথাবার্তা না লিখে। একজন নাগরিক হিসাবে প্রতীকারের সুযোগ নেই। প্রতীকারের জন্য রাষ্ট্রের ওপর ভরসা রাখতে হবে। বরং সামাজিক গণমাধ্যমে আইন যাতে নিজস্ব গতিতে চলে সে বিষয়ে জনমত সংঘটনে ভুমিকা রাখাই সুনাগরিকের পরিচয়। দেশকে ভালোবাসলে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, আদালত বা বিচারালয়ই হচ্ছে শেষ আশ্রয়স্থল এবং আস্থার পবিত্রতম ঠিকানা।
যাহোক ফিরে আসছি শিশু-কিশোর অপরাধ প্রসঙ্গে।
আইনে শিশুদের ক্ষেত্রে অপরাধী মনের অনুপস্থিতিতে কোন কর্মকাণ্ড ঘটলে তা অনিচ্ছাকৃত বলে ধরে নেয়া হয়। ইংল্যান্ডের আইনও মনে করে অনিচ্ছাকৃত কর্মের জন্য কোন ব্যক্তিকে দন্ডিত করা প্রাকৃতিক ন্যায় বিচার পরিপন্থী।
ইংল্যান্ডের আইনে সাত বছরের নিম্ন বয়স্ক কোন শিশুর কোন কার্যই অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হয়না। সাত থেকে চৌদ্দ বছরের শিশুদের আচরণ মানসিক পরিপক্বতার বিবেচনার ওপর নির্ভর করে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
পৃথক বিচার পদ্ধতিরও অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শিশু কিশোররা যেন ভবিষ্যতে সমাজ অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না হয়। ‘অভিযুক্ত’, ‘দোষী’, ও ‘দন্ডিত’ ইত্যাদি শব্দাবলী নিকৃষ্ট প্রকৃতির অপরাধীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধায় শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে এ সব শব্দ আইনে নিষিদ্ধ রয়েছে। যে কারণে শিশু-কিশোরদের বিচার পদ্ধতি ফৌজদারি আদালত হতে ভিন্ন। একই অপরাধে জড়িত থাকলেও বয়স্ক অপরাধীর সঙ্গে শিশুকিশোরদের বিচার করা হয় না। এদের বিচার প্রকাশ্যে করা হয় না, তাদের নাম ঠিকানা, অপরাধ ও বিচারের রায় জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না।
বাংলাদেশে কার্যকর দণ্ডবিধির ধারা ৮২ ও ৮৩ তে ইংল্যান্ডের ন্যায় বিধান রয়েছে- শিশুকে কোন অবস্থাতেই মৃত্যুদন্ড দেয়া যাবে না।
শিশু স্বেচ্ছায় চৌর্য কর্মে জড়িত হতে পারে, এমনকি চুরি যে বেআইনি কার্য তার পক্ষে জানা অসম্ভব না- ও হতে পারে। কিন্তু চৌর্য কর্মের ফলে পরিণতি কি দাঁড়াবে এবং সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা তার নিজের কি পরিমাণ ক্ষতি হবে তা বোঝার মতো মানসিক পরিপক্বতা শিশুর না থাকাই স্বাভাবিক। এ কারণেই একই আচরণের জন্য পৃথক বিচার পদ্ধতি।
আধুনিক যুগে শিশুদের যৌন হয়রানি প্রত্যেক দেশেই জাতীয় উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার সৃষ্টি করেছে।
এ যান্ত্রিক যুগে শিশু-কিশোরদের নিয়ে পরিবারের অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন।
গতিশীল ও কর্মমুখর জীবনযাত্রার কারণে পিতামাতা উভয় কর্মজগতে তৎপর। শিশুকে নির্জন বাড়িতে একাকী বাস করতে হয় অথবা তার সঙ্গী হয় কাজের মেয়ে বা অনাত্মীয় কেউ। ফলে আচার-আচরণ, শিক্ষা, শৃঙ্খলাবোধ মূল্যবোধ সৃষ্টিতে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে।
অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রিত হয় সর্বপ্রথম পরিবার হতে। পুরুষ অন্ন যোগাবে আর নারী ঘরনী হিসেবে ঘর সামলাবে, এমনটি আর নেই। তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক মতে এটাই স্বাভাবিক, যে শিশু পিতা-মাতার অনাদুরে, তাদের এবং নানারকম পারিবারিক উদ্বেগের ভিতর দিন কাটায় সে শিশু পরবর্তীতে অপরাধপ্রবণ হবে। অপরাধপ্রবণ এলাকায় বসবাস করেও যে শিশু পিতামাতার স্নেহ-মমতা ও শৃঙ্খলার ভিতর বেড়ে ওঠে, ভবিষ্যতে সে শিশু অপরাধী হয়ে ওঠে না। শিশুকিশোরদের ভবিষ্যত জীবনধারা কি প্রকৃতির হবে তা অনেকাংশে নির্ধারণ করে তার পরিবার। মানসিক হীনমন্যতা, মনবৈকল্য, স্কুল পালনো ও জৈবিক ত্রুটির যে কোন একটি অবস্থা শিশুকিশোরকে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। পিতা-মাতার দ্বন্দ্ব কলহ শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। ভীতসন্ত্রস্ত জীবনযাপন শিশুর মনে নিরাপত্তাবোধের অভাব তীব্র হয়ে ওঠে। পিতা-মাতার নিষ্ঠুর আচরণ ও অবহেলা সহজেই শিশুকে বিপথগামী পথে ঠেলে দেয়। শিশুর বয়স অনুপাতে অনুচিত যৌন আচরণ প্রদর্শন করার জন্য তাকে পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে প্ররোচিত করে। অসঙ্গত স্পর্শ, শৃঙ্গার ও বলপূর্বক যৌন অঙ্গ প্রবেশ করানো ইত্যাদি

অনৈতিক আচরণের মাধ্যমে শিশুকে যৌন উৎপীড়ন করা হয়ে থাকে। দারিদ্র্যতা কিংবা অতি প্রাচুর্য, কুসঙ্গ, অপসংস্কৃতি, স্যাটেলাইট সংস্কৃতির কু-প্রভাব, ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব, কর্মমুখী পিতার মাতার অনাদর ইত্যাদির কারণে শিশুরা অপরাধী হয়ে উঠছে।
শিশু-কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভুমিকা শিশু আইন ১৯৭৪ কিশোর অপরাধীদের প্রতি পুলিশের ভুমিকা নির্ধারণ করা হলেও তা যে যথাযথভাবে পালন করা হয় না, তার প্রমাণ হাইকোর্টের আদেশ। এ সম্পর্কিত
আইনের ৭২ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, আটককৃত শিশুর প্রতি প্রহরারত পুলিশ পিতৃসুলভ ব্যবহার করবেন এবং তার প্রতি যত্নশীল হবেন। ৫০ ধারা অনুযায়ী শিশু বা কিশোর অপরাধীকে আটকের পর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অবশ্যই জেলা প্রবেশন কর্মকর্তাকে তা অবহিত করবেন। ৪৮ ও ৪৯ ধারা অনুযায়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিশোর অপরাধীকে মুক্তি দিতে পারবেন। তবে যে ক্ষেত্রে তা সম্ভব না হবে সেক্ষেত্রে শিশুকে নিরাপদ স্থানে হেফাজতে রাখবেন।
৪৬ ধারা অনুযায়ী শিশু আইনের ধর্তব্য অপরাধগুলোর সংবাদ থানায় পৌঁছলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামলা রুজু করবেন এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের ব্যবস্থা নেবেন। ১৩ ধারা অনুযায়ী কোন শিশুকে আদালতে সোপর্দ করা হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্বে শিশুর অভিভাবককে লিখিতভাবে তা অবহিত করা এবং নির্ধারিত তারিখে অভিভাবক যাতে আদালতে উপস্থিত থাকতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। ৩ ও ৪ ধারা অনুযায়ী শিশু অপরাধীদের সর্বদা কিশোর আদালতে সোপর্দ করতে হবে। ২ ধারা অনুযায়ী অনুর্ধ্ব ১৬ বছরের শিশুকিশোরকে আইন মোতাবেক শিশু বলা হয়েছে।
এ ছাড়াও পি আর বি রোল ৫২১ এর নির্দেশ মোতাবেক কিশোর অপরাধীর মুক্তির পর পুলিশ কর্মকর্তা তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেবেন দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে শিশুটিকে তার অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করবেন।
শিশু অপরাধীদের জন্য টঙ্গী ও যশোরে সংশোধনাগার রয়েছে। পরিকল্পিত কর্মসূচির অধীনে তাদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ও হাতে কলমে কাজের মাধ্যমে সংশোধন করার ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে।
কিন্তু পুলিশ বয়স্ক অপরাধীদের সঙ্গে যে আচরণ করেন, সেই একই আচরণ শিশু অপরাধীদের সঙ্গেও করেন। ফলে উদ্রেক করে নানা প্রশ্নের। বরিশালে চার শিশুর ক্ষেত্রে যে আচরণ লক্ষ্য করা গেছে।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

LEAVE A REPLY