শুভ জন্মদিনঃ আওয়ামী লীগের ৭১ বছর

আপডেট: জুন ২২, ২০২০
0
শুভ জন্মদিন আওয়ামী লীগ

সোহেল সানি:
ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ কেবল মুসলমানের নয়, জাতি,ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র মানবের।…. মানবতার চূড়ান্ত মুক্তিসংগ্রাম যাতে বিলম্বিত না হয়, সেজন্য জনতাকে তাহাদের সমস্ত ব্যক্তিগত এব্ং দলগত বিভেদ বিসর্জন দিয়া এক কাতারে সমবেত হইতেই মুসলিম লীগ কর্মীসম্মেলন আবেদন জানাইতেছে।
১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুনের ঢাকার স্বামী বাগস্থ বিখ্যাত রোজগার্ডেনে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে একটি দল গঠনের ঘোষণা দেয়া হলে তার প্রতি উপস্থিত প্রায় সবাই সমর্থন ব্যক্ত করেন।
এর আগে টাঙ্গাইল দক্ষিণ আসনের উপনির্বাচনে বিজয়ী আইন পরিষদ সদস্য শামসুল হক “মূল দাবি” নামে একটি প্রস্তাবে উপরোক্ত কথা বলেন।
অবিভক্ত বাংলার সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী ও নিখিল বঙ্গ মুসলিম লীগের পদচ্যুত সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দিকনির্দেশিত পথে ভারত বিভাগপূর্ব আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি (পদচ্যুত) মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে এ কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কর্মী সম্মেলনটি শুরু হয় মওলানা রাগীব আহসানের কন্ঠে পবিত্র কোরআনের বানী তেলওয়াতের মধ্য দিয়ে। দল গঠনের অন্যতম কান্ডারী শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে থেকেই এর প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
প্রসঙ্গত:
১৯৪৯ সালের ৯ জুন পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অস্থায়ী আহবায়ক দবিরুল ইসলাম (১৯৫৩ তে সভাপতি) হেবিয়াস কপার্স মামলা পরিচালনার জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় আসেন। একান্ত অনুগামী শওকত আলীর পরামর্শে ক্যাপ্টেন শাহজাহানের “নূরজাহান বিল্ডিং” এ ওঠেন। এ সময় পুরান ঢাকার ১৫০ মোগলটুলীর মুসলিম লীগের নবীন কর্মীরা ক্ষমতাসীন দলের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলেনন। মওলানা ভাসানীর সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেন সোহরাওয়ার্দী। মওলানা ভাসানী আসামের ধুবড়ী জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আগেই ঢাকা এসে আলী আমজাদ খানের বাসায় উঠেছিলেন।
কর্মী সম্মেলন করার জন্য একটি বৈঠকে বসেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাখাওয়াত হোসেন, কুষ্টিয়ার শামসুদ্দীন আহমেদ, ঢাকার শওকত আলী, আলী আমজাদ খান, খন্দকার আব্দুল হামিদ ও ইয়ার মোহাম্মদ খান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রস্তুতি কমিটি গঠন নিয়ে শুরুতেই বিরোধ দেখা দেয়। আলী আমজাদ খান আহবায়ক ও ইয়ার মোহাম্মদ খান সম্পাদক করা হলে শওকত আলী ও খন্দকার আব্দুল হামিদ কমিটির বিরোধিতা করেন। পরে মওলানা ভাসানীকে আহবায়ক ও ইয়ার মোহাম্মদ খানকে সম্পাদক করে প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়।
নারায়ণগঞ্জের রহমতগঞ্জ ইনস্টিটিউট ও পাইকপাড়ায় দু’দফা মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন উদ্যোক্তারা। এসব খবর শুনে ঢাকা মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান কাজী বশীর হুমায়ুন তাঁর বিখ্যাত রোজগার্ডেনে সম্মেলন অনুষ্ঠানের স্থান নির্ধারণ করে দেন। সরকারি বাধা নিষেধের আড়ালে সম্মেলনের দু’দিন আগেই গায়ে কোম্বল জড়িয়ে ঘোড়ার গাড়িতে করে মওলানা ভাসানীকে রোজগার্ডেনে পৌঁছে দেন শওকত আলী। ২৩ জুন বিকাল তিনটায় একেক করে লোকজন আসতে শুরু করে। তিন শত কর্মীর ওই সম্মেলন চলে গভীর রাত পর্যন্ত। অবিভক্ত বাংলার এককালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে নতুন দল গঠনকে স্বাগত জানিয়ে কয়েক মিনিট বক্তৃতা করে চলে যান। পেইজ:১
আওয়ামী লীগ একটি ইতিহাস। একটি নিশ্চয়ই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে যে দলটি একটি বিরাট প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে আওয়ামী লীগের কর্মপরিকল্পনার প্রথম রূপকার শওকত আলী এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছেন শামসুল হক। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন শামসুল হক, শওকত আলী ও ইয়ার মোহাম্মদ খান প্রমুখের উদ্যোগে এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে এ দলটি জন্মলাভ করে। ঢাকার ১৫০ নম্বর মোগলটুলিস্থ পূর্ববঙ্গ কর্মশিবির অফিসে, যেখানে ছিল শওকত আলীর বাসা, সেই বাসায়ই দলটি গঠনের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি হয়।
আওয়ামী লীগের জন্মলগ্নে শেখ মুজিবুর রহমান জেলখানায় থাকলেও সকল পরিকল্পনার সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্তথাকায় নিজ যোগ্যতাবলে দলটির যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। সহ যুম্ম সম্পাদক হন খন্দকার মোশতাক আহমদ ও একেএম রফিকুল হোসেন। পাঁচজন সহসভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হোসেন, আলী আহমদ খান, আলী আমজাদ খান ও আব্দুস সালাম খান হলেন দলটির সহসভাপতি। প্রথম কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন ইয়ার মোহাম্মদ খান। তিনি অর্থ দিয়ে, অফিসের জন্য স্থান দিয়ে এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিজের বাড়িতে জায়গা দিয়ে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে দাঁড় করিয়েছেন। তরুণ নেতা শামসুল হক দলের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীকার আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন তথা মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় আওয়ামী লীগ। এ জন্য আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে মূলধারার রাজনৈতিক দল হিসাবে পরিচিত। পাকিস্তানের তৎকালীন শোষণ ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে ( বর্তমান বাংলাদেশ) সকল মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতীকে পরিণত হন। যার নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে এদেশের আপামর জনতা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, প্রবাসী সরকার গঠন এবং বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই ঘটেছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশ- বিদেশি ষড়যন্ত্রে আওয়ামী লীগের প্রধান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিজনসহ জীবন দিতে হয়েছে। বিদেশে থাকায় বেঁচে যান তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যদিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা কার্যত আওয়ামী লীগকে হত্যা করতে চেয়েছিল। ধ্বংস করতে চেয়েছিল দেশের স্বাধীনতাকেকে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে।
কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘ ছয় বছর বিদেশে ( ভারতে) অবস্থান করছিলেন। ১৯৭৫- ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগ টিকে থাকার সংগ্রাম করছিল। দলের নেতৃবৃন্দ আওয়াস লীগে পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখেন। এক পর্যায়ে ১৯৮১ সালে দলের কাউন্সিলের করে শেখ হাসিনাকে সভাপতি নির্বাচন করা হয় এবং দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনার কাজে দলের নেতারা উদ্যোগী হন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দলের সভাপতি হিসাবে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবির্ভূত হন। পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার লাভ করেন তিনি।
শেখ হাসিনার জন্ম হয়েছিল একটি পরিবারে -যে পরিবারের কর্তাব্যক্তি ছিলেন ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠাতা সয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই বঙ্গবন্ধুর স্নেহাবেশে লালিতপালিত শেখ হাসিনা সমকালীন রাজনৈতিক ধারা, আওয়ামী লীগের গৌরবোজ্জ্বল যৌবনের সব ধরণের কার্যক্রম এবং স্বাধীনতার পূর্বাপর জাতীয় নেতাদের রণনীতি ও রণকৌশল স্বচক্ষে দেখেছেন, হাতেকলমে শিখেছেন এবং গড়ে ওঠেছেন সেভাবেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ হাসিনা ছিলেন তাঁর বড় মেয়ে। জাতির জনকের সর্বাধিক কাছে থাকার সুযোগে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য হয়ে আরেক ধরনের ‘প্রচ্ছন্ন বড়ত্ব’ অর্জন করেন। পরবর্তীকালে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর শেখ হাসিনার মধ্যে থাকা সেই ‘প্রচ্ছন্ন বড়ত্ব’ তাঁকে একদিন আওয়ামী লীগের বড় পদটিতে সমাসীন করেছে। শুধু তাই নয়, যে পর্দার আড়ালে ঢেকে দেয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগের সুনাম ও ঐতিহ্যের একেকটি ধারা, সেই পর্দার একেকটি স্তর নিজের তীক্ষ্ণবুদ্ধির ছুরি দিয়ে একটা একটা করে কেটে ফেলে আওয়ামী লীগকে আবার ‘জনগণের দল’ হিসাবে পুনঃ প্রীতি পুরো কৃতিত্ব শেখ হাসিনার। পিতার মতই শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগে গতিশীল নেতৃত্ব দিয়ে দেশ পরিচালনায় যে যোগ্যতার পরিচয় দেন, তা দেশের পরিমন্ডল পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে মর্যাদা ও গৌরবের আসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠত করছে।
শেখ হাসিনার আগমন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করে। এরশাদের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক ধারার পুনরাবৃত্তির আন্দোলনে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার মাধ্যমে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে তাঁর অবদান তরঙ্গশীর্ষে।
একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ইউনোস্কোর স্বীকৃতি আদায়ে শেখ হাসিনার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন, স্বাধীনতার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং মূলধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তিনি ইতিহাস রচনা করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটিয়ে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সাথে শান্তিচুক্তি করে তিনি বিশ্বের একজন শান্তিদূতের মতোই কাজ করেছেন। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকরকরণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি সর্বশেষ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন বাংলাদেশের মানুষকে এবং সেজন্য দিনবদলের অঙ্গীকার করে তা একেক করে পূরণ করে চলছেন। শেখ হাসিনা নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বহুবার গৃহবন্দী হন। ‘০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনা দুই বছর কারাবন্দী ছিলেন। ০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট ,সম্পাদক দেশ জনতা ডটকম।

LEAVE A REPLY