সরকারের একটি সিদ্ধান্ত লক্ষ লক্ষ মানুষকে পথে বসাতে পারে

আপডেট: জুন ২৯, ২০২০
0

মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা
সারা পৃথিবীতে করোনায় লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন,এক কোটির উপরে মানুষ করোনায় আক্রান্ত। আক্রান্তের সংখ্যা বাংলাদেশেও দেড় লাখের কাছাকাছি চলে এসেছে।বেকারত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের সোনালী আঁশ পাট, এই পাটকে ঘিরে বাংলাদেশের অনেক স্বপ্ন ছিল।পরিবেশবান্ধব পাটকে নিয়ে অনেক সম্ভাবনা ও ছিল।স্বাধীনতার আগে থেকেই বাংলাদেশের প্রধান শিল্প ছিল পাটশিল্প।এই শিল্পকে ঘিরে ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলায় গড়ে উঠেছিল শিল্পনগরী।মহান মুক্তিযুদ্ধেও পাটশ্রমিক রা অংশগ্রহণ করেছিল।এখন সব ইতিহাস, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী জুট মিল বহু আগেই বন্ধ হয়েছে।সেখানে গড়ে উঠেছে ইপিজেড।বর্তমান পাটমন্ত্রী আলহাজ্ব গোলাম দস্তগীর (এমপি) যিনি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেই বীরপ্রতীক খেতাব অর্জন করেছেন।বর্তমান শ্রম প্রতিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা আবু সুফিয়ানের সুযোগ্য স্ত্রী বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান(এমপি) তিনি ও শিল্পনগরী খুলনা-৩ আসন থেকে বার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি হিসেবেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁকে শ্রম প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করেছেন।সাধারণ শ্রমিকদের আশা প্রত্যশা তাদের দুজনের কাছে অনেক বেশি ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশায় সাধারণ শ্রমিকদের মুখে হাসি না ফুটিয়ে তাদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসার এক দুঃসংবাদ শুনতে হল করোনাকালীন এই মহাদূর্যোগে।পাটমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন,বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে,২৫ হাজার শ্রমিকদের অবসরে পাঠিয়ে দেবেন।বিগত দিনেও পাটকলের শ্রমিকেরা নানা রকম হয়রানি ও হামলা মামলার শিকার হয়েছেন।ইতিমধ্যেই সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পাটকল শ্রমিকদের সংগঠন (সিবিএ এবং নন সিবিএ) এর উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন করেছে।এবং প্রতিটি পাটকলের সামনে শ্রমিকদের সন্তান সহ এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে।এবং ১ জুলাই থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন।সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সাথে সাথে ২৫ হাজার শ্রমিকদের পাওনাদি বুঝিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন,এছাড়াও এ শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ও তাদের পরিবার।সরকার যদি এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে,এতে শুধু শ্রমিকেরাই বেকার হবে না সাথে সাথে অকালে ঝরে যাবে শ্রমিকদের সন্তানদের সম্ভাবনা ও লেখাপড়া। অধিকাংশ মিলের সাথেরই নিজস্ব বিদ্যালয় রয়েছে,যেখানে তাদের সন্তানরা পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে থাকে।পাটকল বন্ধ হলে স্কুলসহ এর আত্ততাধীন সম্পত্তি মসজিদ, মন্দির,মাদ্রাসা ও চারপাশের এলাকার অর্থনৈতিক দীর্ঘকালীন ক্ষতির আশংকা রয়েছে।ইতিপূর্বে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে,এর আগে ও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের ও বেসরকারিকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।সেইসময় অনেক পাটকল সাময়িক বন্ধ ও ছিল।বন্ধকালীন সময়ে অধিকাংশ শ্রমিক ও তার পরিবারদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে।কেউ কেউ অনৈতিক পথ ও বেছে নিয়েছিল।সরকার যদি নতুন করে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে তবে ২৫ হাজারের বাইরে যে সমস্ত লক্ষ লক্ষ শ্রমিক প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সাথে জড়িত ছিল তারা অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে এবং তাদের অবস্থা হবে আরো ভয়াবহ।পাশাপাশি পাটচাষীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পাটচাষে ও আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।ইতপূর্বে পাটশিল্পকে ঘিরে বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ ও পরিবেশ রক্ষা সারাবিশ্বেই একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।তাই সমগ্র বিশ্বেই নবায়ন যোগ্য শক্তি এবং পরিবেশ বান্ধব দ্রব্যাদির চাহিদা ও ব্যবহার বেড়েছে।এক্ষেত্রে পাট (পরিবেশ নষ্টকারী পলিথিনের যথাযথ বিকল্প)
একটি গুরুত্বপূর্ণ পন্য হিসেবে কাজ করতে পারে।এখন সরকার যথাযথ পরিকল্পনা ও পাটের বহুমুখী ব্যবহার এবং ব্র‍্যান্ডিং করতে পারলেই পোশাক শিল্পের পাশাপাশি সারাবিশ্বেই বাংলাদেশের জন্য নতুন শিল্পসম্ভাবনা উন্মোচনের সুযোগ রয়েছে।তবে পাটকল বন্ধ ও বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্তে সহজেই এই সুযোগটি হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে।তাছাড়া ও বেসরকারিকরণে এই শিল্পের উন্নতির বদলে অবনতি হতে পারে,যা বেকারত্ব ও সামাজিক সমস্যায় পরিনত হতে পারে।
পাটকলের ইতিহাস দেখলে,স্বাধীনতার পর দেশে মোট ৭৭ টি পাটকল ছিল।গত ৪৯ বছরে শাসকশ্রেণির দুর্নীতি ও বিশ্বব্যাংক- আইএমএফ এর পরামর্শে ভুল নীতির ফলে এশিয়ার বৃহত্তর পাটকল আদমজী সহ ৫০ টির বেশি পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে।
বর্তমানে প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের ৩ লক্ষ সদস্য এবং পাটচাষি পরিবারের ৩ কোটি সদস্য যারা পাট ও পাটশিল্পের সাথে যুক্ত, তাদের জীবন ও জীবিকা ধংসের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত সংবিধান পরিপন্থী। এই সিদ্ধান্ত শুধু রাষ্ট্রকেই বেকায়দায় ফেলবে না বরং এদেশের অতীত ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে নষ্ট করে ফেলবে।
পাটকলগুলো ক্রমাগত লোকসানের কারণ অদক্ষ পরিকল্পনা এবং দুর্নীতি।তাই,যথাযথ উৎপাদন ও বহুমুখী পরিকল্পনা এবং দুর্নীতি দূর করা গেলে,পাটকল গুলো সরকারের জন্য লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে পারে।এবং তা এই শিল্পকে রক্ষার পাশাপাশি,রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ও বাড়তে পারে।
বন্ধনীতি বন্ধ করে,শ্রমিকদের পাশে দাড়ানোই হোক স্বদেশ ভূমির অঙিকার।
লেখক- মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি
যুগ্ম আহ্বায়ক, কৃষক শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন

(এই মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়)

LEAVE A REPLY